কিন্তু শেষকালের দিকে কালীগঞ্জের বউ-এর শরীর একেবারে ভেঙে পড়েছিল। তবু সেই ভাঙা শরীর নিয়ে নবাবগঞ্জে আসতো!
একবার বড় রাগ হয়ে গিয়েছিল কালীগঞ্জের বউ-এর। আর থাকতে পারে নি। বলে ফেলেছিল–তবে কি আমার টাকাটা তুমি ঠকিয়েই নিলে নায়েব মশাই? এই-ই ছিল তোমার মতলব? তাহলে আগে বললে না কেন?
নরনারায়ণ চৌধুরী বললেন–কেন, আগে বললে–কী করতে?
–আগে বললে–এই হয়রানিটা আর হতো না আমার। এই পনেরো-কুড়ি বছর ধরে আমায় ঘোরাচ্ছো, ভাবছো মাথার ওপর ভগবান নেই?
নরনারায়ণ তখন শয্যাশায়ী হয়ে থাকেন সব সময়ে। কথাটা শুনে তার ভালো লাগলো না।
বললেন–কেন, ভগবান থাকলে আমার কী করতো?
কালীগঞ্জের বউ বললে–ভগবান তুমি মানো আর না মানো, আমি মানি। আমি সেই ভগবানের নাম করে বলে যাচ্ছি বামুনের মেয়েকে তুমি ঠকিয়েছ, এতে তোমার ভালো হবে না নারাণ, তোমার সর্বনাশ হবে–
–তার মানে?
–তার মানে তুমি আমার যেমন সর্বনাশ করেছ তেমনি তোমারও সর্বনাশ হবে।
নরনারায়ণ চৌধুরীর চোখ দুটো রাঙা হয়ে উঠলো। বললেন–তুমি আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও, বেরিয়ে যাও বলছি–
তারপর ডাকতে লাগলেন–দীনু, ও দীনু–
কালীগঞ্জের বউ বসে ছিল। এবার উঠে দাঁড়ালো। বললে–দীনুকে ডাকছো কেন? আমাকে সে গলা ধাক্কা দিয়ে তাড়াবে বলে?
কী জন্যে ডাকছি তা দীনু এলেই দেখতে পাবে, আমাকে আর মুখে বলতে হবে না। ও দীনু দীনু–ও দীনু–
কালীগঞ্জের বউ বললে–তার আর দরকার হবে না। আমার দশ হাজার টাকার জন্যে তোমাকে আর মহাপাতক হতে হবে না। তার আগেই আমি চলে যাচ্ছি। কিন্তু…..
বলতে বলতে যেন একটু দম নিয়ে নিলে কালীগঞ্জের বউ। বললে–কিন্তু আমি যদি বামুনের বংশে জন্মে থাকি, আর আমি যদি এক বাপের মেয়ে হই তো আমি এই তোমাকে শাপ দিয়ে গেলুম যে তুমি নির্বংশ হবে নারাণ, তুমি নির্বংশ হবে। তুমি যাদের জন্যে টাকা জমিয়ে রাখছো এ কারো ভোগে লাগবে না, কারো ভোগে লাগবে না–
বলে কালীগঞ্জের বউ এক নিমেষে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল কিন্তু ঠিক সেই সময় দীনুর সঙ্গে সদানন্দ এসে ঢুকলো।
–কালীগঞ্জের বউ, ও কালীগঞ্জের বউ!
কর্তাবাবু দীনুকে দেখে ধমকে উঠলেন–এই দীনু, আমি তোকে ডাকলাম তা তুই আবার খোকাকে সঙ্গে করে নিয়ে এলি কেন এখেনে?
সদানন্দ বললে–বেশ করেছে আমাকে নিয়ে এসেছে, তুমি বলবার কে? আমি কালীগঞ্জের বউকে দেখতে এসেছি–
তারপর কালীগঞ্জের বউ-এর দিকে চেয়ে বললে–আমাকে পালকি চড়াবে না কালীগঞ্জের বউ? পালকি চড়াবে না আমাকে?
কালীগঞ্জের বউ সদানন্দকে দেখে একটু থমকে দাঁড়ালো। কিন্তু তারপরই আবার যেমন সিঁড়ি দিয়ে নামতে যাচ্ছিল তেমনি সোজা সিঁড়ি দিয়ে নিচেয় নেমে গেল। সদানন্দও তার পেছন-পেছন ডাকতে ডাকতে চলতে লাগলো–ও কালীগঞ্জের বউ……
নরনারায়ণ চৌধুরী রেগে উঠলেন–হাঁ করে দাঁড়িয়ে কী দেখছিস দীনু? খোকাকে ধর, খোকা যে চলে গেল রে, খোকা যে চলে গেল কালীগঞ্জের বউ-এর সঙ্গে, ধর ওকে– হাঁ করে দাঁড়িয়ে দেখছিস কী? ওকে ধরে আন–কিন্তু ততক্ষণে কালীগঞ্জের বউ বারবাড়ির উঠোনে গিয়ে তার পালকিতে উঠে পড়েছিল। চারজন বেহারা পালকিটা কাঁধে তুলতে যাচ্ছে।
এমন সময় সদানন্দও পেছনে গিয়ে ডাকলো–আমাকে আজ পালকি চড়ালে না কালীগঞ্জের বউ?
বেহারা চারজন পালকিটা তুলতে গিয়ে একটু বুঝি থেমে গিয়েছিল। কিন্তু ভেতর থেকে কালীগঞ্জের বউ ধমক দিয়ে উঠলো–কইরে দুলাল, পালকি তোল–
–আজ্ঞে মা ঠাকরুণ, খোকাবাবু যে পালকিতে উঠতে চাইছে।
কালীগঞ্জের বউ ধমকে উঠলো–যে সে পালকিতে উঠতে চাইলেই অমনি ওঠাবি তোরা? না, ওঠাতে হবে না–আমি যা বলছি তাই কর–
দুলালরা আর দেরি করলে না। পালকি কাঁধে তুলে নিয়ে চলতে আরম্ভ করলে।
সদানন্দ কাঁদতে কাঁদতে পেছনে-পেছনে ছুটতে লাগলো–ও কালীগঞ্জের বউ, কালীগঞ্জের বউ–
ছুটতে ছুটতে বোধ হয় সদানন্দ পালকির সঙ্গে বার বাড়ির উঠোন পেরিয়ে বাইরে চলে যাচ্ছিল। চৌধুরী মশাই চণ্ডীমণ্ডপে বসে ব্যাপারটা দেখতে পেয়েছেন। চিৎকার করে বলে উঠলেন–ওরে, খোকা যে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে, কেউ ধর ওকে, ওরে কে আছিস, দীনু
গৌরী ভেতর বাড়ি থেকে দৌড়ে এল–ও খোকা, খোকা, কোথায় যাচ্ছো?
ওদিকে যেতে নেই, আমি তোমাকে পালকি চড়াবো, তুমি এসো আমার কাছে–
বলে খপ করে সদানন্দকে ধরে ফেলেছে। সদানন্দও কেঁদে উঠেছে–কালীগঞ্জের বউ চলে গেল, আমাকে পালকি চড়ালে না–
গৌরীর কোলে উঠেও সে কাঁদতে লাগলো। আর ততক্ষণে দীনুও কর্তাবাবুর ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বার বাড়ির উঠোনে এসে হাজির হয়েছে।
চৌধুরী মশাই চণ্ডীমণ্ডপ থেকে দীনুকে দেখে বলে উঠলেন–কোথায় থাকিস রে তুই দীনু, আর একটু হলেই খোকা এখখুনি রাস্তায় বেরিয়ে যাচ্ছিল—
কিন্তু তাঁর কথা শেষ হবার আগেই কৈলাস গোমস্তা চণ্ডীমণ্ডপে এল দৌড়তে দৌড়তে। বললে–ছোটবাবু, কর্তাবাবু কেমন করছেন, আপনি একবার আসুন–
–বাবা? বাবার কী হয়েছে?
কৈলাস গোমস্তা তখনও হাঁপাচ্ছিল। বললে–এই কালীগঞ্জের বউ-এর সঙ্গে রাগারাগি করে কথা বলতে গিয়েই কর্তাবাবু কেমন হাঁপিয়ে উঠেছেন, আমার সুবিধে মনে হচ্ছে না—
চৌধুরী মশাই আর দাঁড়ালেন না। সোজা ভেতর বাড়িতে ঢুকে একেবারে কর্তাবাবুর ঘরে চলে গেলেন। দেখলেন কর্তাবাবু চিৎপাত হয়ে শুয়ে আছেন, চোখ দুটো বোঁজা। বুকটা জোরে জোরে উঁচু-নিচু হচ্ছে। যেন নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তাঁর। কৈলাস গোমস্তাও পাশে এসে দাঁড়ালো। দীনু এল। গৌরী পিসি এল। বাড়িময় খবর রটে গেল কর্তাবাবুর অসুখ হয়েছে।
