কথাটা শুনে কালীগঞ্জের বউ-এর চোখে জল এসে গিয়েছিল।
বলেছিল–তুমি নিজে গিয়ে দিয়ে এলে তো খুবই ভালো হয় বাবা, আমার তাহলে আর এ হেনস্থা হয় না।
নরনারায়ণও ভেবেছিলেন বুড়ি আর কদিনই বা বাঁচবে! এই রকম স্তোক বাক্য দিয়ে দিয়ে যতদিন কাটানো যায়। তারপর একদিন বউ মারা যাবে। তখন আর কেউই তাগাদা করতে আসবে না। তখন একেবারে চিরকালের মত নিশ্চিন্ত।
কিন্তু কালীগঞ্জের বউ-এরও বোধ হয় অক্ষয় পরমায়ু। তারপর সেই নারায়ণের সন্তান হলো। সেই সন্তানের আবার বিয়েও হলো। তারও আবার ছেলে হলো। কিন্তু পাওনা টাকা কালীগঞ্জের বউ পেলে না। তখনও আসতো সেই কালীগঞ্জের বউ। তার আসার খবর পেয়েই নরনারায়ণ চৌধুরী রেগে যেতেন।
বলতেন–আবার এসেছে বুড়ি?
কৈলাস গোমস্তা বলতো–চলে যেতে বলবো?
কর্তাবাবু বলতেন–হ্যাঁ হ্যাঁ চলে যেতে বলো। বলো আমার শরীর খারাপ, এখন দেখা হবে না।
সেই সময়েই একদিন ছোট একটা ছেলে পালকির কাছে এসে দাঁড়িয়ে ছিল। বলেছিল– আমি পালকিতে চড়বো–
কালীগঞ্জের বউ বলেছিল–এ কে গো? কার ছেলে?
দীনু বলেছিল–এই তো কর্তাবাবুর নাতি–
কালীগঞ্জের বউ সদানন্দকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করে বলেছিল–তুমি পালকি চড়বে?
সদানন্দ বলেছিল—হ্যাঁ–
সেদিন সদানন্দকে পালকিতে চড়িয়েছিল কালীগঞ্জের বউ। পালকি চড়ে সদানন্দ খুব সুখী। বলেছিল–আমাকে আরো দূরে নিয়ে চলো একেবারে নদীর ঘাটের দিকে।
নদীর ধারে গেলে যদি তোমার দাদু বকে?
সদানন্দ বলেছিল–বকুক গে। আমি দাদুকে ভয় করি না–
সেইদিনই কালীগঞ্জের বউ ছোট ছেলেটার সাহস দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল। দীনু বলেছিল–খোকাবাবু কাউকে ভয় করে না, খুব দুষ্টু হয়েছে–
সেই-ই প্রথম পরিচয়। তারপর যতবার কালীগঞ্জের বউ নবাবগঞ্জে তাদের বাড়িতে এসেছে, ততবারই পালকি চড়বার বায়না ধরেছে। আর তাকে পালকিতে চড়িয়ে ঘুরিয়ে দিয়েছে কালীগঞ্জের বউ। পালকি চড়বার কেমন একটা নেশা হয়েছিল সদানন্দর। এলেই দৌড়ে যেত সদানন্দ। পালকিটা আসতে দেখলেই সদানন্দ চিনতে পারতো। ডাকত–ও কালীগঞ্জের বউ, কালীগঞ্জের বউ–
কালীগঞ্জের বউ পালকি থেকে নেমেই সদানন্দকে কোলে করতো।
বলতো–আমি যে কালীগঞ্জের বউ তা তোমাকে কে বললে–খোকাবাবু?
সদানন্দ বলতো–তোমার নাম তো কালীগঞ্জের বউ। আমাকে গৌরী পিসি সব বলেছে–তুমি কালীগঞ্জেই তো থাকো–
–তুমি কালীগঞ্জে যাবে? যাবে আমাদের কালীগঞ্জে?
–যাবো। তুমি আমাকে নিয়ে চলো।
–কিন্তু কালীগঞ্জে গেলে তোমার দাদু যে বকবে!
–দাদু বকুক! দাদু খুব দুষ্টু, দাদু তো আমাকে রোজ বকে! তবু আমি ভয় পাই না।
–তোমাকে কেন বকে দাদু?
সদানন্দ বলতো–আমি দুষ্টুমি করি বলে!
–কেন তুমি দুষ্টুমি করো?
সদানন্দ বলতো–বেশ করবো দুষ্টুমি করবো! দাদু তোমাকে টাকা দেয় না কেন?
কালীগঞ্জের বউ অবাক হয়ে যেত সদানন্দর কথা শুনে।
সদানন্দ বলতো–জানো, দাদু কাউকে টাকা দেয় না। দাদুর অনেক টাকা, তবু দাদু টাকা দেয় না কাউকে।
কালীগঞ্জের বউ কেমন অবাক হয়ে যেত বাচ্চা ছেলের মুখের কথা শুনে। বলতো কী করে বুঝলে দাদু আমাকে টাকা দেয় না?
সদানন্দ বলতো–গৌরী পিসী বলেছে–
গৌরী পিসী! কালীগঞ্জের বউ এ বাড়ির মেয়েদের বিশেষ কাউকেই চিনতো না। অন্দর মহলেও কোনও দিন ঢোকবার সুযোগ হয়নি। এ বাড়ির সমস্ত লোকজন বরাবর তাকে দেখলেই যেন কেমন গম্ভীর হয়ে যেত। জিজ্ঞেস করতো–গৌরী পিসী কে?
সদানন্দ বলতো–এ মা, গৌরী পিসীকে তুমি চেনো না? সে তো আমাকে খাইয়ে দেয়! ভাত খাইয়ে দেয়, দুধ খাইয়ে দেয়, মাছ খাইয়ে দেয়। আমি যদি না খাই তাহলে গৌরী পিসী আমাকে ভয় দেখায়–
–কী ভয় দেখায়?
–বলে জুজুবুড়িকে ডেকে ধরিয়ে দেবে।
এত দুঃখের মধ্যেও কালীগঞ্জের বউ-এর মুখে হাসি আসতো ছোট ছেলের মুখে পাকা পাকা কথা শুনে।
কালীগঞ্জের বউ-এর পালকিতে বসে সদানন্দর মুখে যেন কথার খই ফুটতো। অনেক কথা বলে যেত গড়গড় করে। বলতো–জানো, আমি যখন বড় হব তখন তোমাকে টাকা দেব।
–আমাকে তুমি টাকা দেবে?
হ্যাঁ তোমাকে টাকা দেব, মানিক ঘোষকে টাকা দেব, দুলে ষাটকে, কপিল পায়রা পোড়াকে সবাইকে টাকা দেব। তোমাদের জমি আমি খাস করে নেব না। জমি দেব তোমাকে, ধান দেব, গুড় দেব, তোমাকে সব দেব!
আশ্চর্য ছোট বয়েসের মন আর ছোট বয়সের সঙ্কল্প। কালীগঞ্জের বউ-এর মনে হতো ছোট বয়েসে বোধ হয় সবাই এই রকমই থাকে। ছোট বয়েসে সবাই-ই উদার হতে পারে, দাতা হতে পারে। তারপর বয়েস বাড়বার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝি যত গোল বাধে আর যত স্বার্থচিন্তা আর জটিলতা এসে হাজির হয়। ছোট বয়েসে কালীগঞ্জের বউও তো সকলকে বিশ্বাস করতো। শুধু ছোট বয়েসে কেন, অনেক বেশি বয়েস পর্যন্ত যে-যা চেয়েছে সবাইকে সব কিছু দিয়েছে কালীগঞ্জের বউ। সকলকেই বিশ্বাস করেছে। নইলে এই নায়েব মশাই ই কি এমন করে তার সর্বস্ব কেড়ে নিতে পারতো! দশটা আমবাগান তিনটে বড় বড় বিল, আর জমি যে কত বিঘে তার কোনও হিসেবই রাখবার দরকার হতো না। আর তার হিসেব যে কোনও দিন রাখতে হবে তাও কখনও কালীগঞ্জের বউ স্বপ্নেও ভাবেনি। নায়েব মশাই ই সব দেখতো আর নায়ের মশাই-ই সব আদায় করতে। খাজনা যেমন আদায় করতো তেমনি খাজনা দিতও সরকারী কাছারিতে। জমিতে কত ধান হচ্ছে আর কত পাট, কত ছোলা, কত সরষে তার হিসেব নেবার দরকারও কখনও হয়নি কালীগঞ্জের বউয়ের।
