অসুখ মানুষের হয় বটে, কিন্তু আবার সেরেও ওঠে একদিন। সেই মানুষ গৃহিণীর কাতরতা দেখে অভয় দিতেন। বলতেন–তোমার ভাবনা কী বৌ, আমি না-ই বা থাকলুম, তোমার দুই ছেলে তো রইল, ওরাই তোমাকে দেখবে–
গৃহিনী বলতেন–ওরা আর কত বড়, ওরা কী-ই বা বোঝে–
চক্রবর্তী মশাই বলতেন–যতদিন ওরা বড় না হয় ততদিন নারায়ণ আছে, আমার নায়েবমশাই আছে–
চক্রবর্তী মশাই নরনারায়ণকে নারায়ণ বলে ডাকতেন।
কিন্তু আশ্চর্য মানুষের জীবন, আর আশ্চর্য মানুষের বিশ্বাস! মানুষের জীবনেরও যেমন স্থিরতা নেই, মানুষের বিশ্বাসেরও তেমনি কি কোনও স্থিরতা থাকতে নেই? সত্যিই কত না বিশ্বাস করতেন তিনি নায়েব মশাইকে! আর নিজের নায়েবকেই যদি বিশ্বাস না করতে পারবো তো কাজকর্মই বা চলবে কেমন করে!
আর নরনারায়ণও ছিলেন তেমনি বিশ্বস্ত নায়েব। হিসেবের একটা পয়সা যেন তার এদিক ওদিক হতে নেই। নিজের ছেলেকেও বোধ হয় অমন করে বিশ্বাস করা যায় না যতখানি বিশ্বাস করা যেত নরনারায়ণ চৌধুরীকে। সেই পনেরো টাকা মাইনের কর্মচারী সেদিন যে শুধু বিশ্বাসী ছিলেন তাই-ই নয়, পিতার মতন ভক্তিশ্রদ্ধাও করতেন চক্রবর্তী মশাইকে।
যখন সেই চক্রবর্তী মশাই একদিন হঠাৎ মারা গেলেন তখন তাঁর গৃহিণীর মাথায় আকাশ থেকে একেবারে বাজ ভেঙে পড়লো। দুইটি মাত্র নাবালক ছেলে তখন তাঁর। কিন্তু তারা জমি-জমার কাজকর্ম কিছুই বোঝে না। ওই নরনারায়ণই তখন একমাত্র ভরসা। ওই নরনারায়ণই তখন গৃহিণীর কাছে এসে সান্ত্বনা দিয়েছিল। বলেছিল–আপনি কাঁদবেন না মা, আমি তো আছি, আপনার ভাবনা কী! আমি আপনার ছেলের মতন
তাই সেদিন রাত্রে যখন সেই নায়েব-মশাইয়ের নাতিই তার কাছে এসে হাজির হলো তখন তার মনে পড়তে লাগলো সেইদিনকার কথাগুলো। সেই কথাগুলো যেন তখনও তাঁর কানে বাজছে–আপনি কাঁদবেন না মা, আমি তো আছি, আপনার ভাবনা কী, আমি আপনার ছেলের মতন–
তা সেদিনকার সেই নারায়ণ এখন নরনারায়ণ হয়ে নবাবগঞ্জের জমিদার হয়েছে। নারায়ণ তখন সকাল বেলা রোজ এসে চক্রবর্তী মশাই-এর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতো। আপত্তি করলে নারায়ণ বলতো–আপনি আমাকে পায়ে হাত দিতে আপত্তি করবেন না, আমার বাবা-মা নেই, আপনারাই আমার বাবা-মা, সব কিছু–
তখন কত বিনয়ী ছিল নারায়ণ। মাঝে মাঝে নানান কাজে বাড়ির মধ্যেও আসতো। এসে বাড়ির ছেলের মত ব্যবহার করতো। চক্রবর্তী মশাই-এর গৃহিণীর কাছে এসে ছেলেমানুষের মত খেতে চাইতো।
বলতো-মা-জননী, কিছু খেতে দিন আমাকে, আমার বড় ক্ষিদে পেয়েছে–
তখন অনেক সময় দিনের পর দিন কালীগঞ্জেই থেকেছে নারায়ণ, জমি-জমা-হিসেব পত্র কিংবা মামলা-মকর্দমার কাজে অনেক সময় আহার-নিদ্রা ত্যাগ করে বুক দিয়ে খেটেছে। কখনও মাইনে বাড়াতে পর্যন্ত বলেনি। চক্রবর্তী মশাই তার মাইনে বাড়ানও নি। তা মাইনের দরকারই বা তার কী ছিল? খাওয়া-দাওয়া-থাকা-শোওয়া থেকে শুরু করে জামা কাপড় সবই তো তিনি দিতেন। পাল-পার্বণে নারায়ণের কাপড়-জামা-গামছা ছিল বাঁধা।
কিন্তু সেই নারায়ণই আবার অন্য রকম হয়ে গেল চক্রবর্তীমশাই-এর মৃত্যুর পর। মাঝে মাঝে মা-জননীর মনে হতো অমন করে নায়েব মশাইকে বিশ্বাস না করলেই ভালো হতো হয়তো। কিন্তু তখন সেই বিপদের দিনে তিনি মেয়েমানুষ হয়ে বিশ্বাস না করেই বা কী করতেন!
একদিন গিয়েছিলেন নবাবগঞ্জে। দেখে অবাক হয়ে গেলেন। এত বড় বাড়ি করেছে নারায়ণ! এত লোকজন! মনিবের বিধবা গৃহিণীকে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল নারায়ণ।
বললে–আপনি আবার এলেন কেন মা-জননী?
মা-জননী বললেন–না এসে কী করবো বাবা, কতবার তোমার কাছে লোক পাঠিয়েছি, তুমি একবার দেখাও করলে না। তাই নিজেই এলুম–আমার জমিজমার হিসেব-টিসেবগুলো একবার দেখতুম। আমার কী আছে না-আছে তাও বুঝতে পারছি না। আমার যদি টাকা কড়ি থাকতো ব্যাঙ্কে তাহলে তোমাকে আর এমন করে বিরক্ত করতাম না বাবা-নেহাত বিপাকে পড়ে তোমার কাছে এসেছি–
নারায়ণ বললে–আপনি আজকে যান, আমি আপনাকে যা বোঝাবার একদিন কালীগঞ্জে গিয়ে সব বুঝিয়ে দিয়ে আসবো। আপনাকে আর কষ্ট করে আসতে হবে না–
নায়েবমশাই-এর কথায় বিশ্বাস করে সেদিন চক্রবর্তী গৃহিণী ফিরে চলে গেলেন। কিন্তু নারায়ণ আর এলো না। তাঁর কথা রাখলো না। তার স্বামীর অত বড় সম্পত্তি যে কোথায় কর্পূরের মত উড়ে গেল কেমন করে সব অদৃশ্য হয়ে গেল তা তিনি জানতেও পারলেন না। লোকে বলতে লাগলো–কালীগঞ্জের নায়েব জমিদারকে ঠকিয়ে নবাবগঞ্জে নিজের জমিদারি করেছে।
যারা ভালোমানুষ লোক তারা জিজ্ঞেস করলে কালীগঞ্জের বৌকে নায়েব ঠকালে কী করে? বৌ জানতে পারলে না?
লোকে বললে–আরে, বউ তো ভালো মানুষ, তার ছেলে মেয়ে-জামাই কেউ নেই, কী করে জানতে পারবে?
তা সত্যি কথা। কালীগঞ্জের বউ কি কোর্ট-কাছারি করবে? নায়েবের নামে কাছারিতে নালিশ করবে?
কিন্তু নরনারায়ণ চৌধুরীকে যত খারাপ লোক ভাবা গিয়েছিল তত খারাপ সে নয়। কালীগঞ্জের বউ যখন টাকার তাগাদায় আসতো তখন তাকে নারায়ণ একেবারে খালি হাতে ফিরিয়ে দিত না। কখনও দশ টাকা, কখনও পাঁচ টাকা, আবার কখনও বা পঞ্চাশ টাকাও দিয়েছে। বলেছে–আর তোমার এখানে আসতে হবে না মা জননী, এবার আমি সব টাকাটা নিজে গিয়ে তোমাকে দিয়ে আসবো
