প্রকাশমামা বললে–তা হলে যাত্রার সময়টা কখন?
কালীকান্ত ভট্টাচার্য বললেন–পুরুতমশাই তো পাঁজি দেখে সময় ধার্য করে দিয়েছেন।
–দেখবেন যেন বেশী দেরি না হয়, ওদিকে আবার রাণাঘাট থেকে ট্রেন বদল করতে হবে। সে ট্রেন মিস্ করলেই মুশকিল–
কালীকান্ত ভট্টাচার্য বললেন–না, সেদিকে কোনও গোলযোগ হবে না। আমি আমার লোক দিয়ে ট্রেন ধরিয়ে দেব
তারপর হঠাৎ যেন কী মনে পড়ে গেল। বললেন–আপনি সিগারেট-টিগারেট ঠিক পাচ্ছেন তো?
–কোথায় আর পাচ্ছি! আপনি জামাই পেয়ে গেছেন, এখন আর আমাকে কে দেখবে, আমি তো এখন পর হয়ে গেছি
কালীকান্ত ভট্টাচার্য মশাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন।
–ওরে কে আছিস? ও নিতাই, ও কেষ্টধন, ও বিপিন, কে রে ওদিকে? বেয়াই মশাইকে সিগারেট দেয়নি কেউ? যেদিকে আমি দেখবো না সেই দিকেই গাফিলতি, ওরে কেষ্টধন………
বলতে বলতে ভেতর বাড়ির দিকে সিগারেটের সন্ধানে চলে গেলেন।
নিরঞ্জন এতক্ষণ পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে এতক্ষণে কাছে এল। বললে–শালাবাবু, এদিকে এক কাণ্ড হয়েছে–
–কাণ্ড? কীসের কী কাণ্ড?
নিরঞ্জন বললে–তেমন কিছু কাণ্ড নয়। ছোটবাবু এয়োদের সব বলে দিয়েছে–
–কী বলে দিয়েছে সদা?
–বলে দিয়েছে যে, পরশু ছোটবাবু কালীগঞ্জের বৌ-এর কাছে গিয়েছিল, সেইজন্যে গায়ে হলুদের সময় বাড়ি ছিল না।
প্রকাশমামা অবাক হয়ে গেল সদার বোকামি দেখে। বললে– সে কি রে? বলে দিয়েছে?
–হ্যাঁ।
–তুই জানলি কী করে?
–আমাকে ওদের নাপিত বিপিন জিজ্ঞেস করছিল। ছোটবাবুকে নাকি বাসরঘরে মেয়েরা জিজ্ঞেস করেছিল– গায়ে-হলুদের সময় তুমি কোথায় গিয়েছিলে? তা ছোটবাবু নাকি বলেছে–কালীগঞ্জের বৌ-এর কাছে। তাই মেয়ে-মহলে কানাঘুষো হয়েছে। তাই বিপিন জানতে চাইছিল আমার কাছে কালীগঞ্জের বউ কে? কালীগঞ্জের বৌ-এর বয়েস কত, এই সব…..
–তা তুই কী বললি?
নিরঞ্জন বললে–আমি আর কী বলবো। আমি শুধু বললুম সে এক বুড়ি থুত্থুড়ি মেয়েমানুষ।
তা জিজ্ঞেস করলে না বর কেন গিয়েছিল সেখানে?
–না, তা জিজ্ঞেস করেনি। আর জিজ্ঞেস করলেও তো আমি কিছু বলতে পারতুম না! আমি বলতুম বর কালীগঞ্জের বৌ-এর কাছে কেন গিয়েছিল তা আমি নাপিত মানুষ কী করে জানবো?
প্রকাশমামা কথাটা শুনে নিশ্চিন্ত হতে পারলো না। নিরঞ্জনকে সেখানে ছেড়ে ভেতর বাড়ির দিকে ছুটলো। ভেতরে তখন অনেক মেয়ে-পুরুষের ভিড়। প্রকাশমামা সেই দিকে যেতেই মেয়েরা মাথার ঘোমটা টেনে দিলে।
কে একজন দৌড়ে এসে প্রকাশমামার দিকে সিগারেট বাড়িয়ে দিলে। বললে–নিন সিগারেট নিন–
সিগারেট নিয়ে প্রকাশমামা বললে–সিগারেট নিচ্ছি, কিন্তু বর কোথায় গো তোমাদের? একবার ডেকে দাও তো আমার কাছে–কী করছে এখন বর?
সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ের মধ্যে রাস্তা হয়ে গেল বেয়াই মশাইয়ের জন্যে। বরকর্তা বরের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। একটু জায়গা ছাড়ো গো, রাস্তা দাও। ও রাঙাদিদি, একটু নড়ে বোস, একটু গতর ওঠাও। বরকর্তা বরের সঙ্গে কথা বলতে এসেছে–
চারিদিকে বাসি লুচি আর তরকারির গন্ধ। ছোট বাড়িতে লোক বেশি হলে যা হয় সেই অবস্থা। শেষকালে বরের ঘরে যেতেই দেখলে সদানন্দ একটা তাকিয়া হেলান দিয়ে গম্ভীর হয়ে বসে আছে। সারারাত ঘুম না হলে যেমন হয় সেই রকম চেহারা। উস্কোখুস্কো চুল। স্রিয়মাণ হয়ে বসে ছিল সে আর সামনে অনেকগুলো মহিলা।
–সদা!
প্রকাশমামার গলা শুনে যেন অকূলে কূল পেলে সদানন্দ। মুখ তুলে চাইলে। বললে–কী?
প্ৰকাশমামা বললে–একবার আমার সঙ্গে এদিকে আয় তো।
সদানন্দ সমস্ত রাত এতটুকুও ঘুমোয়নি। সমস্ত রাতই মেয়েরা বিরক্ত করেছে, কথা বলেছে। গান গাইবার জন্যে পীড়াপীড়ি করেছে। এক-একবার তার মনে হয়েছে এখান থেকে সে অন্য কোথাও চলে যায়। কিন্তু কেমন করে যাবে! এতগুলো অচেনা লোকের মধ্যে কাটিয়ে খুব আড়ষ্ট হয়ে ছিল। এবার প্রকাশমামাকে দেখে যেন একটু সহজ হলো।
প্রকাশমামা আগে আগে চলতে লাগলো। সদানন্দও তার পেছন-পেছন।
প্রকাশমামা চলতে চলতে পেছন না ফিরেই জিজ্ঞেস করলে–রাত্তিরে তোর ঘুম হয়েছিল রে?
সদানন্দ বললে–-না–
–ঘুম হয়নি ভালোই হয়েছে। আমার বিয়ের সময় আমারও বাসর-ঘরে ঘুম হয়নি। ওর জন্যে ভাবিসনি। কেমন বৌ দেখলি? পছন্দ হয়েছে তো?
বাসর-ঘরের মধ্যে একজন কে বলে উঠলো–ও লো, ও লোকটা বরের কে লো?
কনের এক মাসী বললে–ওই তো হলো আসল কর্তাগো, বরকর্তা, বরের মামা। ওই মামাই তো এই বিয়ের সম্বন্ধটা করেছে–
প্রকাশমামা সদানন্দকে নিয়ে তখন বার বাড়ির একটা ঘরের একান্তে এসে দাঁড়ালো। আশে-পাশে কেউ নেই দেখে প্রকাশমামা বললে–আয় বোস, এখানটা একটু নিরিবিলি মতন আছে—
.
কালীগঞ্জের জমিদার হর্ষনাথ চক্রবর্তী প্রায়ই গৃহিণীকে বলতেন–তোমার ভাবনা কী, দুই ছেলে রইলো, তারাই তোমাকে দেখবে–
চক্রবর্তী মশাই-এর একবার শরীর ভেঙে গিয়েছিল। প্রায় যায়-যায় অবস্থা। তখন গৃহিণী বড় মুষড়ে পড়েছিলেন। তখন থেকেই কেমন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন জমিদারিই থাক আর টাকাকড়ি থাক মানুষের জীবন এই আছে এই নেই। বুঝতে পেরেছিলেন এই এত শক্ত-সমর্থ মানুষটা এ ক-দিনের অসুখেই যদি এমন কাতর হয়ে পড়েন তা হলে আসল হচ্ছে স্বাস্থ্য, আসল হচ্ছে পরমায়ু। আর সব চেয়ে আসল সত্য হচ্ছে ভগবান। তাই তখন থেকেই চক্রবর্তী-গৃহিণী পূজো-পাঠ নিয়ে মেতে উঠলেন।
