সদানন্দর বেশী কথা বলতে সেদিন ভালো লাগেনি।
বললে–তুমি কি করতে আমার কাছে এসেছ তাই আগে বলো—
প্রকাশমামা হঠাৎ বলে উঠলো–তোর বাবা মারা গেছে–
খবরটা শুনে সদানন্দর চমকে যাওয়া উচিত ছিল। অন্তত কিছুটা হতবাক হওয়া। কিন্তু সেদিন কিছুই হয়নি তার। সে শুধু প্রকাশমামার মুখের দিকে খানিকক্ষণ হাঁ করে চেয়ে রইল। আর যেন কিছু করবার ছিল না তখন তার।
প্রকাশমামা বললে–আমি এখন নবাবগঞ্জ থেকে আসছি। সেখানেও তোকে খুঁজতে গিয়েছিলাম। শেষকালে এলুম কলকাতায়। ভাবলুম এখানে তোকে কোথাও পাবো। তা এখেনেও অনেক জায়গায় খুঁজেছি। শেষে ভাগ্যি ভালো তাই হঠাৎ বউবাজারের সেই পুলিসের বড়বাবুর বাড়িতে গিয়েছিলুম মানদা মাসির খোঁজে। সেখানে তাদের বাড়ির চাকর মহেশের কাছে এই ধর্মশালার খবর পেলুম। তা এখন চল্ আমার সঙ্গে–
–কোথায়?
–ভাগলপুরে। তোর মামার বাড়িতে।
–সেখানে গিয়ে কী হবে? আমার কেউ নেই, আমি কোথাও যাবো না।
প্রকাশমামা বললে–কেউ নাই বা থাকলো, কিন্তু তোর বাবার সম্পত্তি তো আছে। অত লাখ টাকার সম্পত্তি তুই ছেড়ে দিবি! সে-সম্পত্তি তো সবই তোর রে, তুই তো বাবার একমাত্র ছেলে, একমাত্র ওয়ারিশন
–কিন্তু টাকা নিয়ে কী করবো? আমার টাকার দরকার নেই—
কিন্তু সদানন্দ ছাড়তে চাইলেও প্রকাশমামা ছাড়বার লোক নয়। বললে–তুই টাকা না নিলে কে নেবে সে টাকা? এত টাকার সম্পত্তি ছেড়ে দিয়ে তুই ধর্মশালায় বসে বসে ভ্যারেণ্ডা ভাজবি? আর টাকা যদি তুই না নিস তো আর কাউকে দানপত্র করে দে! আমি গরীব লোক, তোর টাকার দরকার না থাকতে পারে, কিন্তু আমার তো টাকার দরকার আছে রে, আমি তো আর তোর মত সন্নিসী হয়ে যাইনি! তোর না হয় মাগ ছেলে কেউ নেই, কিন্তু আমার তো আছে!
এতক্ষণে সদানন্দ বুঝলো কিসের তাগিদে প্রকাশমামা তার খোঁজে সেই ভাগলপুর থেকে বেরিয়ে সারা দেশ ঘুরে কলকাতায় এসেছে। আর কলকাতা কি ছোট জায়গা! কলকাতার মত জায়গায় কি কাউকে খুঁজে বার করা সহজ! যতদিন মা বেঁচে ছিল ততদিন প্রকাশমামার টাকার অভাব হয়নি। দিদির কাছে হাত পেতেছে আর টাকা নিয়ে পকেটে পুরেছে আর রাণাঘাটের বাড়িতে গিয়ে ফুর্তি করেছে। সারা জীবনটাই ফুর্তি করে বেড়িয়েছে প্রকাশমামা। এখন যখন তার জামাইবাবু মারা গেছে এখন এসেছে ভাগ্নের খোঁজে। এখন ভাগ্নের জন্যে দরদ উথলে উঠেছে তার।
সেই জন্যেই তো অনেকদিন ধরে সে ভেবেছিল যে সে তার জীবন কাহিনীটা লিখে যাবে। লিখে যাবে যে, সে পাগল নয়। পাগল তোমরা। যে পৃথিবীতে মানুষ মানুষকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করে, যে-মানুষ কেবল কপিল পায়রাপোড়াদের গলায় দড়ি দিতে সাহায্য করে, যে-মানুষ কেবল কালীগঞ্জের বউদের বঞ্চনা করে নিজের পুঁজিপাটা বাড়ায় সেই মানুষ পাগল না হয়ে পাগল হয় কিনা সদানন্দ!
সদানন্দ বলেছিল–তা হলে চলো—
প্রকাশমামা সেদিন আদর করে সদানন্দকে ভাগলপুরে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তখন কি প্রকাশমামা জানতো যে তার জামাইবাবুর সমস্ত সম্পত্তি অন্য একজনের ভোগে লাগবে। জানলে বোধ হয় আর ভাগ্নের সন্ধানে আসতো না প্রকাশ রায়।
কিন্তু সে-সব কথা এখন যাক্। সে-সব অনেক পরের কথা। তখন নয়নতারারও অনেক বয়েস হয়েছে। তারও তখন নতুন করে সংসার হয়েছে। সে-সব কথা বলবার সময় পরে অনেক পাবো। এখন আজকের কথা বলি। এই নয়নতারার বিয়ের কথা।
এই নয়নতারার বিয়ের দিনে সে-সব বিপর্যয়ের কথা ভাবতে নেই। সে-সব অকল্যাণের কথা এই শুভদিনে বুঝি ভাবাও অন্যায়। আজ শুধু আনন্দ করো তোমরা সবাই। আজ শাঁখ বাজাও, আজ উলু দাও, আজ বলো–যদিদং হৃদয় তব তদিদং হৃদয় মম, যদিদং হৃদয়ং তব তদিদং হৃদয়ং মম—
আজ কালীকান্ত ভট্টাচার্যের একমাত্র সন্তানের বিয়ে। যে নয়নতারার রূপ দেখে সকলের চোখের পাতা পড়তে চাইতো না, যে-মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে পণ্ডিতমশাই আর তার গৃহিণীর রাত্রে ঘুম ছিল না, সেই নয়নতারারই আজ বিয়ে। সেই বিয়েতে তোমরা আজ এসো, এসে নয়নতারাকে আশীর্বাদ করো। বলো–তুমি জন্ম-জন্ম স্বামী-সোহাগিনী হয়ে শ্বশুর-শাশুড়ীর সেবা করে অক্ষয় পুণ্য অর্জন করো মা। আশীর্বাদ করো–আমার নয়নতারা যেন সুখী হয়, আমার নয়নতারা যেন স্বামী-সোহাগিনী হয়। আশীর্বাদ করো–আমার। নয়নতারা যেন সিঁথির সিঁদুর নিয়ে জন্ম-জন্ম এয়োস্ত্রী হয়ে কাটায়–
তখন বেলা বেড়েছে।
প্রকাশমামা বেয়াই-মশাইকে খুঁজে খুঁজে হয়রান। বললে–কোথায়, বেয়াই মশাই কোথায়?
কালীকান্ত ভট্টাচার্য কদিন থেকেই ব্যতিব্যস্ত। তাঁর বিশ্রাম নেই, তাঁর দুশ্চিন্তারও শেষ নেই। কোন্ দিক দেখবেন ঠিক করতে পারছেন না। প্রকাশমামার কাছে আসতেই প্রকাশমামা একেবারে ঠেস দিয়ে বলে উঠলেন কী বেয়াই মশাই, এখন জামাই পেয়ে যে আমাকে একেবারে চিনতেই পারছে না দেখছি–আমি খেলুম কি খেলুম না, কিছুই দেখছেন না আর–
–না না, সে কী কথা বেয়াই মশাই, আপনিই তো সব! আপনি না থাকলে কি এ বিয়ে হতো?
প্রকাশমামা বললে–তা কেমন জামাই হলো বলুন? পছন্দ হয়েছে তো?
–আপনিই বলুন আপনার বৌমা কেমন হলো?
–আপনিই বেয়াই মশাই কেবল আপনার নিজের মেয়ের গর্বেই গেলেন। কেন, আমাদের ছেলে কি ফ্যাল্না?
কালীকান্ত ভট্টাচার্য বললেন–না, তা কেন বলবো। আমার নয়নতারার অনেক পুণ্যফল ছিল তাই অমন স্বামী পেয়েছে। আমাদের কেষ্টনগরের সবাই একেবাক্যে বরের প্রশংসা করে গেছেন।
