ততক্ষণে ট্রেন ছাড়বার সময় হয়ে গিয়েছিল। চৌধুরী মশাই আর থাকতে পারলেন না। ট্রেনে ওঠবার আগে প্রকাশ চৌধুরী মশাই-এর গা ঘেঁষে দাঁড়ালো। বললে–একটা কথা ছিল জামাইবাবু–
–কী?
–কিছু টাকার দরকার ছিল। আজ তো আবার বর-কনেকে নিয়ে যেতে হবে। অনেক খরচ হবে। মেয়েদের শয্যা-তুলুনি আছে, ওদের পরামাণিককে কিছু টাকা দিতে হবে। তারপর…..
চৌধুরী মশাই বললেন–কিন্তু তোমার হাতে যে কাল তিনশো টাকা দিলুম–
–আজ্ঞে তিনশো টাকায় কী হবে? সে টাকা তো আছে। তবু হাতে একটু বেশি টাকা থাকলে বুকে বল-ভরসা হয়–
চৌধুরী মশাই জামার ভেতরের পকেট থেকে কয়েকখানা নোট বার করলেন। করে এক এক করে গুনতে লাগলেন। বার বার গুনে বললেন–এই নাও—
প্রকাশ টাকাটা নিয়ে বললে–কত?
–আরো একশো দিলাম—
–একশো মোটে? একশোতে কী হবে?
চৌধুরী মশাই বললেন–তা এত টাকা তোমার কীসে লাগবে শুনি? রজব আলী তো ইস্টিসানে এসে হাজির থাকবে, তারপর পালকি-ভাড়া বর-কনে বাড়ি পৌঁছুলে সব মিটিয়ে দেব–
তা তাই-ই সই। নোট ক’খানা গুনে প্রকাশ সেগুলো পকেটে পুরে ফেললে। টাকা নিয়ে বেশি ছেঁড়াছিঁড়ি করতে নেই তা প্রকাশ জানে। তাতে কাজ হাঁসিল হয় না।
তারপর ট্রেন ছেড়ে দিলে।
এসব কবেকার ঘটনা। আজ এতদিন পর অতীতের সমস্ত পথগুলো পরিক্রমা করতে গিয়ে সেদিনকার সব কিছু খুঁটিনাটি ঘটনাগুলো মনে পড়তে লাগলো সদানন্দ চৌধুরীর। সেদিনকার সেই ছেলেটাকে যেন চেষ্টা করলে এখনও চেনা যায়। চেনা যায় তার ছোটখাটো কথা আর মানুষের সঙ্গে ব্যবহারের ঘটনাগুলো। অথচ কেউই তাকে চিনতে পারেনি। তার দাদু, তার বাবা, মা, প্রকাশ মামা, সবাই তাকে তাদের প্রচলিত নিয়মের বেড়াজাল দিয়ে ঘেরা পৃথিবী থেকে নির্বাসন দিয়েছিল। নির্বাসন দিয়ে তার মাথার ওপর শাস্তির বোঝা চাপিয়ে দিয়ে সমস্ত দায় থেকে নিজেদের বিবেককে মুক্ত করতে চেষ্টা করেছিল। তারা ভেবেছিল তাদের ছাঁচে সদানন্দকে ঢালাই করে শুধু বংশবৃদ্ধির প্রয়োজনে তাকে বাঁচিয়ে রাখবে। সদানন্দ তাদের প্রতিনিধি হয়ে দিনের পর দিন সেই একই নিয়মের পুনরাবৃত্তি করে যাবে, যে-নিয়মের প্রবর্তন করে এসেছে সমস্ত মানুষ জাতের পূর্বপুরুষ। সদানন্দ সেই দিন থেকেই ভেবেছিল এতদিনকার সেই নিয়ম সে ভাঙবে। সে ভেবেছিল সে বলবে আমি তোমাদের কেউ নই! তোমাদের পাপের ভাগীদার যেমন আমি নই, তেমনি তোমাদের পুণ্যের ভাগীদারও নই আমি। তোমাদের সমস্ত পাপ-পুণ্যের দুষ্কৃতি-সুকৃতি নিয়ে তোমরা সুখে থাকো, শুধু আমাকে মুক্তি দাও তোমরা। আমি যেমন তোমাদের সাহায্য চাই না তেমনি চাই না তোমাদের উত্তরাধিকারের অধিকারও।
অথচ সমস্ত অপরাধ থেকে দায়মুক্ত হয়েও আজ সে একজন আসামী। ভাগ্যের বোধ হয় এও এক বিচিত্র পরিহাস।
.
ভদ্রলোক পাশে পাশে আসছিল। ভদ্রলোক সারাজীবন আসামী আর ফরিয়াদী নিয়ে জীবন কাটিয়েছে। অনেক আসামী দেখেছে আবার অনেক ফরিয়াদীও দেখেছে। কিন্তু এমন আসামী আর দেখেনি।
বললে–একটু পা চালিয়ে চলুন–পা চালিয়ে চলুন–
সদানন্দবাবু হাসলেন। যেন পা চালিয়ে চললেই বেশি এগিয়ে যাওয়া যায়। তার দাদু, তার বাবা, তার মা, তার প্রকাশ মামা, তার দাদামশাই, সবাই তো সংসারে একটু পা চালিয়েই চলতে চেয়েছিল। তারা সবাই-ই ভেবেছিল পা চালিয়ে চললেই বুঝি তারা আরো একটু এগিয়ে যেতে পারবে। ভেবেছিল আরো টাকা, আরো ক্ষমতা, আরো আয়ু পাবে আর একটু পা চালিয়ে চললেই। তারা পা চালিয়েই চলতে চেয়েছিল, কিন্তু থেমে থেমে এগিয়ে যাওয়ার প্রজ্ঞা তাদের আসেনি। তারা জানতো না যে যারা থেমে থাকে তারাই চলা লোকদের হারিয়ে দিয়ে এগিয়ে যায়।
আশ্চর্য, শেষ পর্যন্ত তাই-ই হয়েছিল তাদের। তাদের সকলের।
সদানন্দর মনে আছে রসিক পালের বাড়িতে যেমন আজকে কাছারির পেয়াদা এসে হাজির হয়েছে সমন নিয়ে, ঠিক তেমনিই একদিন ওই প্রকাশ মামা তার কাছে এসে হঠাৎ হাজির হয়েছিল। সদানন্দ তখনও এখনকার মত নিঃস্ব নিঃসহায়। কলকাতার এক ধর্মশালায় তখন অন্নদাস হয়ে জীবন কাটছে তার।
প্রকাশ মামা তাকে দেখে অবাক। বললে–আমি তো তোকে খুঁজতেই বেরিয়েছি রে? তুই এখানে রয়েছিস?
সদানন্দ বললে–কেন? আমার সঙ্গে আবার তোমার কী দরকার?
প্রকাশ মামা বললে–তোর জন্যে কোথায় কোথায় গিয়েছি জানিস?
সদানন্দ বিরক্ত হয়ে উঠলো প্রকাশ মামার ওপর। বললে–ও-সব কথা থাক, তুমি আমার খোঁজ করছো কেন তাই বলো।
প্রকাশ মামা বললে–কেন, তোর এত তাড়া কিসের? আমি তো তোর ভালোর জন্যেই এসেছি, আমার নিজের তো কিছুই না–
সদানন্দ বললে–আমার তুমি অনেক ভালো করেছ মামা, আর আমার ভালোর দরকার নেই। তুমি আমার ভালোর জন্যেই আমার বিয়ে দিয়েছিলে, আমার ভালোর জন্যেই তোমরা আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলে, তোমরা আমার ভালোর জন্যেই কপিল পায়রাপোড়াকে ভিটে মাটি ছাড়া করেছিলে, আর আমার ভালোর জন্যেই তোমরা কালীগঞ্জের বৌ-এর সর্বনাশ করেছিলে, আবার আমার ভালোর জন্যেই তোমরা সেই বংশী ঢালীকে দিয়ে তাকে খুনও করিয়েছিলে। দয়া করে তোমরা আর ভালো করতে চেয়ো না মামা। আমার যথেষ্ট ভালো করেছ, আর ভালো করতে হবে না
কথাগুলো প্রকাশ মামার ভালো লাগলো না। বললে–তুই তো বেশ কথা বলতে শিখেছিস, অথচ জামাইবাবু বলতো–তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। এখন তো বেশ সেয়ানা মানুষের মত কথা বলছিস তুই!
