–তুমি আমার টাকা মিটিয়ে দেবে? তা আমি মরে গেলে আমার টাকা মিটিয়ে দিলে আমার কী লাভ? বেঁচে থেকেই যদি খেতে না পেলুম তো আমি মারা গেলে সে টাকা কে খাবে? ভূতে খাবে?
হঠাৎ একটা শব্দে সদানন্দর যেন চম ভাঙলো। হঠাৎ বাইরে কে যেন বলে উঠলো– ওরে বাজনা বাজা–বাজনা বাজা–
সঙ্গে সঙ্গে ঢোল বেজে উঠলো বাইরে। তখন সম্প্রদান হচ্ছে। পুরুতমশাই মন্ত্র পড়তে শুরু করেছেন–
যদিদং হৃদয়ং তব তদিদং হৃদয়ং মম
নয়নতারার হাতের পাতাটা ধরে আছে সদানন্দ আর পুরুতমশাই নিজের মনেই গড় গড় করে মন্ত্র পড়ে চলেছেন। কিন্তু একটা কথাও যেন আর তখন কানে যাচ্ছে না তার। তার তখন কেবল মনে পড়ছে সেই রাধার গাওয়া গানটা। রাণাঘাটের বাজারের রাধা।
আগে যদি প্রাণসখি জানিতাম
শ্যামের পীরিত গরল মিশ্রিত
কারো মুখে যদি শুনিতাম।
কুলবতী বালা হইয়া সরলা
তবে কি ও বিষ ভখিতাম ॥
সদানন্দর মনে হলো প্রকাশ মামার রাধা সেদিন গানটা ঠিক গায়নি। ‘শ্যামের পীরিত’ নয়, ওটা হবে ‘টাকার পীরিত’। টাকার পীরিত গরল মিশ্রিত বললেই যেন ঠিক হতো। টাকার জন্যেই তো আজ তার দাদু বড়লোক, টাকার জন্যেই তো তারা জমিদার, টাকার জন্যেই তো আজ এই সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ে হচ্ছে। অথচ এ টাকা তারও নয়, তার বাবারও নয়, তার দাদুরও নয়। এই সমস্ত যা কিছু তাদের সম্পত্তি সব তো কালীগঞ্জের বৌ-এর।
পুরুতমশাই তখনও মন্ত্র পড়িয়ে চলেছে–যদিদং হৃদয়ং তব, তদিদং হৃদয়ং মম, যদিদং হৃদয়ং তব তদিদং হৃদয়ং……
কোথা দিয়ে যে সেদিন কী ঘটে গেল তা সদানন্দ জানতেও পারলো না। কিম্বা হয়ত জানতে চাইলোও না। সব সময় প্রকাশ মামা পাশে দাঁড়িয়ে। কানের কাছে মুখ এনে বলতে লাগলো, কী রে, অমন গোমড়া মুখ করে আছিস কেন? কী হয়েছে তোর? দেখছিস কত মেয়েছেলে রয়েছে চারদিকে, একটু চেয়ে দেখ!
.
চৌধুরী মশাই ভোরের ট্রেনেই চলে এলেন। আসবার সময় প্রকাশকে কাছে ডাকলেন। প্রকাশ সারারাত জেগেছে। বিয়ের সম্প্রদান থেকে শুরু করে একেবারে বাসর-ঘর পর্যন্ত। নিরঞ্জন পরামাণিকও ছিল সঙ্গে। নিরঞ্জনের ঘুমোলে চলবে না। একেবারে বাসর-ঘরের দরজার সামনেই কাছাকাছি কোথাও থাকতে হবে। যেন সে নজর রাখে একটু। যেন সদানন্দ পাগলামি না করে।
প্রকাশ বলেছিল–অমিও তো আছি জামাইবাবু, আমি রাত্তিরে ঘুমোব না।
তা নিরঞ্জন আর প্রকাশ মামা দু’জনের ভরসাতেই চৌধুরী মশাই-এর জন্যে ব্যবস্থা-বন্দোবস্তের কোনও ত্রুটি রাখেননি। পাকা বন্দোবস্ত একেবারে। নিজে আলাদা বসিয়ে তাঁকে খাইয়েছেন। চৌধুরী মশাই যে নিজে আসবেন এটা কালীকান্ত ভট্টাচার্যের কাছে কল্পনার বাইরে ছিল। অত বড় রাশভারি মানুষটাকে নেহাৎ বেকায়দায় পড়েই ছেলের বরকর্তা হয়ে এত দূরে আসতে হয়েছে।
রাত্রে শুতে যাবার আগেও জিজ্ঞেস করলেন–তাহলে আমি শুতে যাই প্রকাশ?
প্রকাশ বললে–হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনি শুতে যান জামাইবাবু। আপনি কী করতে জেগে থাকবেন? আমি তো আছি, আমি আছি, নিরঞ্জন আছে–
তবু যেন স্বস্তি পাচ্ছিলেন না চৌধুরী মশাই। বললেন–দেখো প্রকাশ, যেন আবার কেলেঙ্কারি না হয়!
প্রকাশ বলেলে–কেলেঙ্কারি? আমি থাকতে কী কেলেঙ্কারি হবে?
চৌধুরী মশাই বললেন–মানে আবার যদি খোকা পালিয়ে যায় সেই কথাই বলছি–
–আর পালাবে না।
চৌধুরী মশাই বললেন কীসে বুঝলে? প্রকাশ একটু ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি হাসলো।
বললে–বুঝি জামাইবাবু, আমি বুঝি–
–খুলে বলো না কীসে বুঝলে?
প্রকাশ বললে–সদার বউ পছন্দ হয়েছে–
–তাই নাকি? খোকা তোমায় বললে?
প্রকাশ বিশেষজ্ঞের মত ভঙ্গি করে বলে উঠলো–ও কি আর মুখে বলবার জিনিস জামাইবাবু? ও বুঝে নিতে হয়।
চৌধুরী মশাই বললেন–তাহলে ত আর কোনও ভাবনাই নেই–
প্রকাশ বললে–না, কোনও ভাবনা নেই, আপনি নিশ্চিন্তে নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে যান।
এর পরে চৌধুরী মশাই-এর কোনও দুশ্চিন্তা ছিল না। তিনি তার নির্দিষ্ট বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়েছিলেন। তারপর সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে যাবার আয়োজন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। যাবার আগে আবার ডেকে পাঠালেন প্রকাশকে। শুধু প্রকাশ নয়, তার সঙ্গে নিরঞ্জন পরামাণিকও এলো।
তাদের জন্যেই চৌধুরী মশাই উগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছিলেন।
বললেন–কী খবর প্রকাশ?
প্রকাশ বললে–যা বলেছিলুম তাই–
–তার মানে?
প্রকাশ বললে–তার মানে আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না, জিজ্ঞেস করুন এই নিরঞ্জনকে-একে বাসর-ঘরের কাছেই একটা বারান্দায় শুতে বলেছিলুম। ও শুয়ে শুয়ে সব শুনেছে–
চৌধুরী মশাই নিরঞ্জনের দিকে চাইলেন।
নিরঞ্জন বললে–হ্যাঁ বড়বাবু, শালাবাবু যা বলেছেন ঠিক বলেছেন। খোকাবাবু কাল বাসর-ঘরে কথা বলেছেন।
–কী কথা?
–আজ্ঞে বাসর-ঘরে কাল রাত্তিরে মেয়েরা গান গাইছিলেন তো, আমি বারান্দা থেকে সব শুনতে পাচ্ছিলাম। গানের পর মেয়েরা বরকে জিজ্ঞেল করলেন–গান কেমন লাগলো!
–তা খোকা কী উত্তর দিলে?
–খোকাবাবু মনে হলো খুব খুশী। খোকাবাবুর গলা শুনতে পেলুম। খোকাবাবু বললেন–খুব ভালো।
যাক, সুখবরটা শুনে চৌধুরী মশাই খুশী হলেন। তাহলে আর ভয় নেই।
প্রকাশ বললে–আমি তো আপনাকে আগেই বলেছিলুম জামাইবাবু, ও কনের মুখ দেখলে সদার সব পাগলামি বাপ বাপ বলে পালিয়ে যাবে। অমন ডানাকাটাপরী দেখলে মুনি-ঋষিদের ধ্যান পর্যন্ত ভেঙে যায় তো আমাদের সদা তো কোন্ ছার–
