তা সেদিন সেই সদানন্দ চৌধুরীর বিয়ের আগের দিন সন্ধ্যেবেলা হঠাৎ কালীগঞ্জের বৌ সদানন্দকে তার বাড়িতে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল। বুড়ি মানুষ, ভালো করে তখন চোখেও দেখতে পায় না। বিরাট বাড়ি। কিন্তু ওই বিরাট বাড়িটাই শুধু আছে তখন। আর কিছু নেই। সব ঘরগুলোতে ভালো করে ঝাঁটও পড়ে না। আগেকার সেই সব লোক-লস্করও নেই আর তখন। একটা ঝি শুধু হাতের কাজগুলো করে দেয়। আগে গোয়াল-ভরা গরু ছিল, বলদ ছিল চাষবাসের। আর ছিল কিছু লোকজন, যারা এককালে কর্তাদের নিমক খেয়েছে। তারা কৃতজ্ঞতার তাগিদে বাড়ির আনাচে-কানাচে কোনও রকমে তখনও বাসা বেঁধে আছে। দরকার হলে ভাঙা পালকিটায় করে গিন্নীমাকে এখানে–ওখানে নিয়ে যায়। তাও পালকিটার তখন রং চটে গেছে, একটা পায়া ভেঙে গেছে। কোনও রকমে মেরামত করে করে সেটা একটু চালু আছে।
–তুমি কে বাবা?
সদানন্দ একেবারে নিচু হয়ে বুড়ির পায়ে হাত দিয়ে মাথায় ঠেকালে।
–আমি সদানন্দ। আমি নবাবগঞ্জের নরনারায়ণ চৌধুরীর নাতি, আর হরনারায়ণ চৌধুরী আমার বাবা।
কালীগঞ্জের বৌ তখন বিস্ময়ে হতবাক। যেন কথাটা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছিল না বুড়ির।
বললে–তা আমার কাছে যে তুমি হঠাৎ? নায়েবমশাই কি তোমার হাত দিয়ে আমাকে টাকা পাঠিয়েছে?
সদানন্দ বললে–না
–তাহলে তুমি কী করতে এয়েছ?
–আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি কালীগঞ্জের বৌ! আমি বাড়ি থেকে চলে এসেছি। আমার কালকে বিয়ে, এবার থেকে আমি তোমার কাছেই থাকবো।
কালীগঞ্জের বৌ কথাগুলো শুনে কেমন যেন আকাশ থেকে পড়লো। কী করবে বুঝতে পারলে না। তখনও আহ্নিক সারা হয়নি তার। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল, এবার বসে পড়লো বুড়ি। বললে–তোমার বিয়ে? কাল?
–হ্যাঁ–
–তা কাল তোমার বিয়ে যদি হয় তো তুমি বাবা আজকে আমার বাড়িতে এলে কেন? কাল সকালেই তো তোমার গায়ে-হলুদ হবে, তখন তো তোমার খোঁজ পড়বে। তখন তো আমার নামেই দোষ পড়বে যে, আমি তোমাকে আমার কাছে আটকে রেখেছি। তা নায়েব মশাই জানে যে, তুমি আমার কাছে এসেছ?
সদানন্দ বললে–না। আমি কাউকেই জানাইনি এখানে আসার কথা। কাউকে আর জানাবোও না। আমি আর ও বাড়িতে যাবোও না।
কালীগঞ্জের বৌ বললে–তোমার হলো কী বাবা? তুমি কি বাড়ির সঙ্গে রাগারাগি করেছ?
–না কালীগঞ্জের বৌ, আমি তোমার এখানে থাকবো বলেই এসেছি। এবার থেকে আমি বরাবর তোমার এখানেই থাকবো। নবাবগঞ্জে আর যাবো না।
কালীগঞ্জের বৌ বললে–তুমি দেখছি ছেলেমানুষ আছ এখনও। আমার এখানে যে তুমি থাকবে তা খাবে কী? তুমি বড়লোকের বাড়ির ছেলে, আমি গরীব মানুষ, আমি কি তোমাকে খাওয়াতে পারবো বাবা? তুমি ছেলেমানুষি কোর না, বাড়ি চলে যাও। একে তো তোমার দাদু আমাকে দেখতে পারে না, এর পরে যদি তোমাকে আমার এখানে দেখতে পায় তো আমাকে আর আস্ত রাখবে না, আমাকে আর তোমাদের বাড়িতেও ঢুকতে দেবে না–
সদানন্দ জিজ্ঞেস করলে–তা তুমি দাদুর কাছে যাও কেন? কেন তুমি দাদুর কাছে ভিক্ষে করতে যাও? ভিক্ষে করতে তোমার লজ্জা করে না?
কালীগঞ্জের বৌ বললে–কিন্তু আমার পাওনা টাকা চাইতে যাওয়াও ভিক্ষে? তোমার দাদু তো আমার সর্বস্ব নিয়েছে। আমার জমি-জমা কিচ্ছু আর বাকি রাখে নি। কেবল এই ভিটেটুকু ছাড়া আর আমার নিজের বলতে কিছু নেই। আমার লাখ-লাখ টাকার সম্পত্তি সব তোমার দাদু নিয়ে নিয়েছে, তাই শেষকালে আমি অনেক কান্নাকাটি করাতে তোমার দাদু বলেছিল আমাকে হাজার দশেক টাকা দেবে। তাই শুনে আমি মামলা তুলে নিয়েছিলুম। তা এখন সেই টাকাটা চাওয়াও নাকি আমার অন্যায়! আমি তো আর দুদিন পরে মরে যাবো, তখন টাকা দিলে আমার কী লাভ হবে বলো বাবা? সে টাকা কি আমার ছেরাদ্দে খরচ হবে?
সদানন্দ বললে–তোমাকে কিছু বলতে হবে না, আমি সব জানি–
–তুমি সব জানো বাবা? সব জানো তুমি? বুড়ির যেন আনন্দে গলা বন্ধ হয়ে এলো।
সদানন্দ বললে–সব জানি বলেই তো আমি এসেছি–
–কী করে জানলে তুমি? কে বললে–তোমাকে? কে আমার এমন শুভাকাঙ্ক্ষী আছে বাবা? আমি জানতুম, আমার কেউ নেই। কর্তা গেছেন, নিজের পেটের দুটো ছেলে থাকলেও আজ আমার এই দুর্দশা হতো না। তাই ভাবি, মানুষ এমনি করেই মানুষের সর্বোনাশ করে? কই, তোমার দাদুর তো কোনও ক্ষতি হয়নি? তার তো ছেলে বেঁচে রয়েছে! তুমি তার নাতি, তোমারও তো কাল বিয়ে হবে, তারপর একদিন তোমারও ছেলে পুলে হবে, ঘর-সংসার ভরে উঠবে তোমাদের। তখন তো একবার কেউই ভাববে না কার টাকায় এসব হলো, কার সর্বোনাশ করে তোমাদের এত বাড়বাড়ন্ত হলো। কিন্তু আমার কী হলো? আমি তোমার দাদুর কাছে কী অপরাধ করেছি যে তিনি আমার এত বড় সর্বোনাশটা করলেন। দেখ বাবা, আমি তাই তাঁকে রাগের মাথায় শাপ দিয়ে এসেছি–
–শাপ দিয়ে এসেছো? কাকে?
–তোমার দাদুকে। ওই নায়েব মশাইকে রাগের মাথায় শাপ দিয়েছিলুম। শাপ দিয়ে বলেছিলুম যে আপনি নির্বংশ হবেনই, বামুনের শাপ নিষ্ফল হবে না। তা রাগ হলে কি মানুষের জ্ঞান থাকে বাবা? আমিও তাই রাগের মাথায় ওই কথা বলে ফেলেছিলুম। তাই আমার ওপর তোমার দাদুর অত রাগ। এখন বলছে আর টাকা দেবে না–
সদানন্দ বললে–আমি তোমার টাকা সব মিটিয়ে দেবো–আমি তোমাকে তো সেই কথা বলতেই এসেছি–
