একটা হাসির শব্দে হঠাৎ যেন সদানন্দর সম্বিৎ ফিরে এলো। চারিদিকে অনেক লোক, অনেক আলো। অনেক বাজনা। ঢোলকাঁসির আওয়াজে জায়গাটা তখন সরগরম হয়ে উঠেছে। তার সঙ্গে আছে শাঁখ আর উলুর শব্দ।
–বেয়াই মশাই, আমি তো খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলুম—
প্রকাশ মামা এগিয়ে এল ভট্টাচার্যি মশাই-এর দিকে। বললে–কেন, ভয় পেয়েছিলেন কেন?
ভট্টাচার্যি মশাই বললেন–আমাদের বিপিন গিয়েছিল, তার মুখেই শুনলাম বাবাজীকে নাকি পাওয়া যাচ্ছিল না সকাল থেকে।
কথাটা শুনে হো-হো করে হেসে উড়িয়ে দিল প্রকাশ মামা। জামাইবাবুর দিকে চেয়ে বললে–শুনুন জামাইবাবু, বেয়াই মশাই-এর কথা শুনুন, বরকে যদি পাওয়াই না যাবে তাহলে এখন বর এল কী করে?
কালীকান্ত ভট্টাচার্য মশাই বললেন বুঝতেই তো পারছেন, আমি হলুম মেয়ের বাপ, আমার তো একটা দুশ্চিন্তা থাকে–তা গায়ে-হলুদ নির্বিঘ্নেই হয়েছিল তো শেষ পর্যন্ত?
বরকর্তা চৌধুরী মশাই সাধারণত বেশি কথা বলেন না। গায়ে-হলুদের কথা শুনে মুখ খুললেন। বললেন–গায়ে-হলুদ না হলে বিয়ে হবে কী করে বেয়াই মশাই? অশাস্ত্রীয় ব্যাপার তো আমাদের বংশে চলবে না।
নিরঞ্জন পরামাণিক বরের সঙ্গে গিয়েছিল। কনের বাড়ির পরামাণিক বিপিন এসে চুপি চুপি জিজ্ঞেস করলে–শুনছিলাম কী নাকি হয়েছিল আপনাদের ওখানে–?
–কীসের কী?
–আমি তো গায়ে-হলুদ নিয়ে গিয়েছিলুম নবাবগঞ্জে তখন তো বরকে পাওয়া যাচ্ছিল না, তারপর কখন পাওয়া গেল?
নিরঞ্জন বললে–আরে খোকাবাবু তো খেয়ালী মানুষ, হঠাৎ কালীগঞ্জে চলে গিয়েছিল–
–কালীগঞ্জে? তা বিয়ের দিন বরবাবাজী কালীগঞ্জে চলে গিয়েছিলই বা কেন?
কেন যে সদানন্দ সেদিন কালীগঞ্জে চলে গিয়েছিল তা কি সদানন্দ নিজেই জানতো? এ এক বিচিত্র মানসিকতা। আগের দিনও সে জানতো না যে, সে কালীগঞ্জে যাবে। প্রকাশ মামা তাকে সব জায়গাতেই সঙ্গে করে নিয়ে গেছে। ছোটবেলা থেকে সে মামার সঙ্গে কত জায়গাতেই তো গেছে। কালীগঞ্জেও গেছে। রেলবাজার থেকে নবাবগঞ্জে এসে আরো কয়েক ক্রোশ দক্ষিণে যাও তবে কালীগঞ্জ পড়বে। কালীগঞ্জে পোস্টাফিস আছে, থানা আছে, বাঁধা বাজার আছে। বলতে গেলে নবাবগঞ্জের চেয়ে কালীগঞ্জ আরো বর্ধিষ্ণু গ্রাম। সদানন্দ জানতো ওইখান থেকেই কালীগঞ্জের বউ তার দাদুর কাছে আসতো। জানতো দাদুর কাছে এসে কালীগঞ্জের বউ টাকা চাইতো, আর যতবার টাকা চাইতো ততবার দাদু বলতো টাকা নেই। কেন যে বউ টাকা চাইতো আর কীসের টাকা, তা সদানন্দ জানতো না। কাউকে জিজ্ঞেস করলেও কেউ স্পষ্ট জবাব দিত না।
বিয়েবাড়িতে তখন লোকজনের ভিড় হয়েছে খুব। ভাগলপুর থেকে দাদামশাই এসেছে। তার নাতির বিয়ে। বুড়ো মানুষ। বেশি নড়া-চড়া করতে পারেন না। তিনি বললেন কই, খোকাকে তো দেখতে পাচ্ছিনে–
দীনু ডেকে নিয়ে এল খোকাকে। দাদু শুয়ে ছিলেন সামনে। বললেন–দাদুকে প্রণাম করো–
–থাক থাক–বলে কীর্তিপদবাবু পা-জোড়া সামনের দিকে একটু এগিয়ে দিলেন। তারপর বললেন–বেঁচে থাকো বাবা, আশীর্বাদ করি সুখী হও–
সদানন্দ তখনও সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। কীর্তিপদবাবু আবার বলতে লাগলেন–এসে পর্যন্ত তোমাকে দেখতেই পাইনি মোটে, খুবই ব্যস্ত বুঝি–
নরনারায়ণ চৌধুরী বললেন–না, ও আবার ব্যস্ত কীসের! ও তো বরাবরই ওই রকম। আমিই বলে আজকাল দেখতে পাইনে ওকে, অথচ একই বাড়ির মধ্যে থাকি। ওকে কেউই দেখতে পায় না–
কীর্তিপদবাবু বললেন–তা তো পাবেই না, এখন ওদের বয়েস হয়েছে, বুড়োদের সঙ্গে থাকতে ওদের আর ভালো লাগবেই বা কেন? যাও, যাও, তোমার নিজের কাজে যাও বাবা, কাল তোমার বিয়ে, আর কোথাও বেরিও না–
সদানন্দ ছাড়া পেয়ে বেঁচে গেল যেন। সে চলে যাবার পর কীর্তিপদবাবু বললেন অনেকদিন পরে দেখলাম খোকাকে, খুব বড় হয়ে গেছে–আর চেনা যায় না–
নরনারায়ণ চৌধুরী বললেন বড় হলে কী হবে, বৈষয়িক বুদ্ধি-টুদ্ধি তেমন হয়নি
কীর্তিপদবাবু বললেন–এইবার বিয়ে হচ্ছে, কাঁধে জোয়াল চাপলেই সব ঠিক হয়ে যাবে, ছোট বয়সে সবাই ওরকম একটু হয়েই থাকে–পরে দেখবেন তখন ও-ই আপনাকে শেখাবে। আমি যখন ছোট ছিলুম তখন আমিই কি জমিদারির কিছু বুঝতুম–
দুই বেয়াই-এর বহুদিন পরে দেখা। দুজনেরই অনেক সম্পত্তি। একদিন এই দুজনের সব সম্পত্তিরই মালিক হয়ে বসবে সদানন্দ। কীর্তিপদবাবুর একমাত্র সন্তান এই সদানন্দর মা। আর নরনারায়ণ চৌধুরীরও একমাত্র সন্তান এই সদানন্দর বাবা। সদানন্দ নিজেও হরনারায়ণ চৌধুরীর একমাত্র সন্তান। সুতরাং দুই বেয়াই-এরই একমাত্র ভরসা এই সদানন্দ। তাই দুজনেরই এক কামনা। দুজনেরই কামনা সদানন্দ দীর্ঘজীবী হোক, সদানন্দ সুখী হোক, সদানন্দ সংসারী হোক, সদানন্দ বৈষয়িক হোক।
কিন্তু হায় রে মানুষের জীবন আর হায় রে মানুষের জীবনের ইতিহাস! নইলে সেদিন নবাবগঞ্জ আর ভাগলপুরের সেই দুই দুর্ধর্ষ জমিদার-পুঙ্গব কি কল্পনা করতেই পেরেছিলেন যে তাদের একমাত্র উত্তরাধিকারী শ্ৰীমান সদানন্দ চৌধুরী লক্ষ লক্ষ টাকার মালিক হওয়া সত্ত্বেও কপর্দকশূন্য অবস্থায় এক অখ্যাত চৌবেড়িয়া গ্রামের রসিক পালের অতিথিশালায় অন্নদাস হিসেবে শেষ জীবনটা কাটাবে! নইলে ঠিক বিয়ের আগের দিনই কেউ নিজের বাড়ি ছেড়ে পালায়, না নরনারায়ণ চৌধুরীর শেষ জীবনের চরম শত্রু কালীগঞ্জের বৌ-এর কাছে গিয়ে আশ্রয় নেয়!
২.২ কালীগঞ্জের বৌ
কালীগঞ্জের বৌ-এরও তখন চরম অবস্থা। নিঃসন্তান বিধবা মানুষ তিনি। এককালে স্বামীর জীবিতাবস্থায় তিনি অনেক সুখ অনেক ঐশ্বর্য দেখেছেন। দুটি ছেলে হয়েছিল তার। তারাও তখন আর নেই। কালীগঞ্জে যেবার কলেরা মহামারী হয়ে দেখা দিয়েছিল সেবার দুই ছেলেই তার চোখের সামনেই মারা গিয়েছিল! স্বামীর মৃত্যু, দুই ছেলের মৃত্যু, সবই তিনি সহ্য করেছেন বুকে পাথর বেঁধে। তখন ওই নরনারায়ণ চৌধুরীই ছিল কালীগঞ্জের জমিদারের নায়েব। তার হাতেই সব কিছুর ভার দিয়ে কালীগঞ্জের বউ বড় নিশ্চিন্ত ছিলেন। পনেরো টাকা মাইনে পেতেন তখন নরনারায়ণ চৌধুরী। সামান্য নায়েব মাত্র। অতি কষ্টেসৃষ্টে সংসার চলতো তার। কিন্তু সন্তান-হারা বিধবার হাতে জমিদারির ভার পড়ার পর থেকেই নরনারায়ণ চৌধুরীর অবস্থা ফিরতে লাগলো। তিনি নায়েবগিরি করেন কালীগঞ্জে কিন্তু একখানা ছোট কোঠাবাড়ি করলেন নবাবগঞ্জে, নিজের গ্রামে। মাসে পনেরো টাকা মাইনে পাওয়া নায়েবের কোঠাবাড়ি করবার সামর্থ্য হয় কী করে সে প্রশ্ন জমিদারির বিধবা মালিক কালীগঞ্জের বৌ-এর মাথায় আসেনি। এলে আর নরনারায়ণ চৌধুরী আজ এত বড়লোক হতে পারতেন না। আর তখন সে-প্রশ্ন উঠলে আজকের এই আসামী সদানন্দ চৌধুরীকে নিয়ে উপন্যাস লেখবার প্রয়োজনও এমন করে অনিবার্য হয়ে উঠতো না।
