খবরটা যেমন রাধার কাছে বিস্ময়কর, তখন সেই ছোটবেলায় সদানন্দর কাছেও তেমনি। প্রকাশ মামার সেই সেদিনকার কথাতেই সে প্রথম জানতে পারলো যে, তাদের কত টাকা। সে কত বড়লোক।
রাধা বললে–কিন্তু তুমি এই বয়সেই ওকে এই লাইনে নিয়ে এলে! ও তো বয়স হলে সব ওড়াবে–
–সে গুড়ে বালি। বুঝলে গো, টাকা ওদের বংশে কারোর হাত দিয়ে গলে না।
রাধা বললে–তাই নাকি?
–হ্যাঁ, তাই তো আমি আমার দিদির কাছ থেকে যা পারি হাতিয়ে নিই। এর বাবা, আমার জামাইবাবু এক-পয়সার ফাদার-মাদার। সেই জন্যেই তো এই ভাগ্নেটাকে এ লাইনে এনে একটু মানুষ করার চেষ্টা করছি। দেখি, এখন আমার হাতযশ আর এর কপাল–
সদানন্দ তখনও রাধার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে। তার মনে হলো মেয়েমানুষটার মধ্যে কিছু যেন অস্বাভাবিকতা রয়েছে একটা। তাদের নবাবগঞ্জের অন্য মেয়েমানুষদের মত নয় যেন। শেষ পর্যন্ত সেদিন আর ঘুমনোই হয়নি সদানন্দর। ওই রকম জায়গায় কারো ঘুম হয় নাকি?
মনে আছে বাড়িতে ফিরে আসতেই মা জিজ্ঞেস করলে কীরে, সমস্ত রাত কোথায় ছিলি? কোথায় ঘুমোলি?
প্রকাশ মামা বললে–ঘুম হবে কী করে? সাধুদের আশ্রমে কি ঘুম হয় কারো? সবাই কেবল খোলকর্তাল বাজাচ্ছিল–
–সাধুদের আশ্রমে? সাধুদের আশ্রমে মানে?
প্রকাশ মামা বললে–যাত্রা তো শেষ হয়ে গেল রাত দুটোর সময়, তখন কোথায় যাই? সদা বললে–ওর ঘুম পেয়েছে। তাই ওকে নিয়ে রাণাঘাটের একটা সাধুদের আশ্রমে গেলুম। কিন্তু সেখানে সবাই এমন হেঁড়ে গলায় ‘রাধাকৃষ্ণ রাধাকৃষ্ণ’ করতে লাগলো যে, বাপ-বাপ বলে আমাদের ঘুম পালিয়ে গিয়ে বাঁচলো–
দিদি হাসতে লাগলো। বললে–তা আমাদের সদরের উকিলবাবুর বাড়ি থাকতে সাধুদের আশ্রমে তোরা গেলিই বা কেন?
প্রকাশ মামা বললে–গেলুম সদাকে দেখাতে। যখন বড় হয়ে হাতে ওর অনেক টাকা আসবে তখন যাতে না ঠকে তাই এখন থেকে জোচ্চোরদের চিনিয়ে রাখলুম–
কথাটা শুনে দিদিও হাসতে লাগলো, প্রকাশ মামা নিজেও হাসতে লাগলো। কিন্তু সদানন্দ সেদিন হাসতে পারেনি প্রকাশ মামার কথা শুনে। তখনও সেই রাণাঘাটের বাজারের মেয়েমানুষটার কথা মনে পড়ছিল তার।
হঠাৎ প্রকাশ মামা জিজ্ঞেস করলে–জামাইবাবুকে তুমি যাত্রা শুনতে যাওয়ার কথা বলোনি তো?
সত্যিই তখনকার দিনে কেউ-ই জানতো না প্রকাশ মামার সঙ্গে বাড়ির বাইরে সে কোথায় কোথায় যেত। চৌধুরী বংশের কুলতিলকের পক্ষে যেখানে যাওয়া নিষিদ্ধ সেখানেও যে সেই বয়েসেই গিয়ে সে সব-কিছু বিধি-নিষেধ অমান্য করে বসে আছে–এ-কথা গুরুজনদের কারোরই তখন গোচরে আসেনি। জীবন দেখা কি এতই সোজা! প্রকাশ মামা না হলে কি জীবনের উল্টো-পিঠটা সে দেখতে পেত? একদিকে নরনারায়ণ চৌধুরীর অর্থ লালসা, আর তার বাবার বৈষয়িক কূট-কৌশলী বুদ্ধি, আর অন্যদিকে প্রকাশ মামার বেপরোয়া জীবনভোগ। একদিকে কালীগঞ্জের বৌ এসে পালকি থেকে নামতো আর দাদুর কাছে গিয়ে টাকা চাইতো, আর একদিকে সেই টাকাই প্রকাশ মামার হাতের ফুটো দিয়ে রাণাঘাটের বাজারের চালাঘরে গিয়ে নিঃশেষ হতো। মানুষের জীবনের এই অঙ্কটা সে কিছুতেই কষতে পারতো না।
এক-একদিন মা’কে জিজ্ঞেস করতো–মা, ও বউটা কে পালকি করে আসে আমাদের বাড়িতে? কেবল দাদুর কাছে টাকা চায় কেন?
মা বলতো–ও কালীগঞ্জের বউ।
–কালীগঞ্জের বউ কালীগঞ্জে থাকে না কেন? আমাদের নবাবগঞ্জে কেন জ্বালাতে আসে?
মা তাড়াতাড়ি ছেলেকে চুপ করিয়ে দিত। বলতো–চুপ, চুপ, ওকথা বলতে নেই, কর্তাবাবু শুনতে পেলে রাগ করবেন।
সদানন্দ বলতো–তা কালীগঞ্জের বৌ-এর পাওনা টাকা দিয়ে দিলেই হয়। যখনই কালীগঞ্জের বউ টাকা চায় তখনই দাদু বলে টাকা নেই। দাদু কেন মিথ্যে কথা বলে? দাদুর তো অনেক টাকা আছে, আমি দেখেছি–
এ-সব কথার কোনও উত্তর তার মা দিতে পারেনি।
প্রকাশ মামাকেও সে অনেকবার জিজ্ঞেস করেছে–তুমি কেন ওখানে যাও মামা?
প্রকাশ মামা ভাগ্নের কাছে এমন প্রশ্নের আশা করতো না। বলতো–তুই কী বুঝবি কেন যাই! তুই যখন বড় হবি তখন তুইও যাবি–
সেই ছোটবেলায় যখন রাধার বাড়িতে প্রথম গিয়েছিল সে তখন সেই গানটা শুনিয়েছিল। সেই গানটা–আগে যদি প্রাণসখি জানিতাম।
আসবার সময় রাস্তায় প্রকাশ মামা তাকে জিজ্ঞেস করেছিল–কী রে, কীরকম গান শুনলি?
সদানন্দ বলেছিল—ভালো–
–ভালো তো বুঝলুম, কিন্তু, কী রকম ভালো তাই বল না—
সদানন্দ বলেছিল–খুব ভালো–
প্রকাশ মামা বলেছিল–তা দ্যাখ, দিদি যদি তোকে জিজ্ঞেস করে কোথায় রাত কাটিয়েছিলি তাহলে কিন্তু রাধার কথা বলিসনি, বুঝলি? তোর বাবাকেও বলবি না, তোর দাদুকেও বলবি না।
সদানন্দ আবার জিজ্ঞেস করেছিল কিন্তু তাহলে তুমি কেন ওখানে যাও মামা?
প্রকাশ মামা বলেছিল–জীবনটাকে ভোগ করতে।
–ভোগ করতে মানে?
প্রকাশ মামা বলেছিল–ওই তো তোর বড় দোষ! বলছি তুই বড় হলে সব বুঝতে পারবি! তবু বারবার সেই এক কথা। তোর ভালোর জন্যেই তোকে এসব শেখাচ্ছি। নইলে তোর হাতে যখন টাকা আসবে তখন তুই খরচ করবি কী করে?
সদানন্দ জিজ্ঞেস করেছিল–কেন? টাকা খরচ করা কি শক্ত?
প্রকাশ মামা বলেছিল–নিশ্চয়ই, টাকা খরচ করা কি সোজা নাকি! তোর দাদুর তো অত টাকা, তাহলে কালীগঞ্জের বৌকে তার পাওনা টাকা দেয় না কেন বল?
সদানন্দ বলেছিল–সত্যিই বলো তো, কালীগঞ্জের বৌকে দাদু টাকা দেয় না কেন?
