কিন্তু সদানন্দর তখন অন্য চিন্তা। প্রকাশ মামা তার দিকে চেয়ে বললে–কিচ্ছু ভাবিস নি তুই। বিয়ে করতে ভয় কীসের? আমি তো আছি। এই দ্যাখ না, বিয়ে কে না করেছে। আমি বিয়ে করেছি, তোর বাবা বিয়ে করেছে, তোর ঠাকুর্দা বিয়ে করেছে, তোর ঠাকুরদার বাবাও একদিন বিয়ে করেছিল। বিয়ে করতে ভয়ের কিচ্ছু নেই। এই আমার কথাই ধর না, আমি তো একবার বিয়ে করেছি, এর পর যদি দরকার হয় আরো দশবার বিয়ে করবার হিম্মত রাখি, আমি কি কাউকে পরোয়া করি?
সেদিন প্রকাশ মামার কথায় মনে মনে হেসেছিল সদানন্দ। প্রকাশ মামাও তো একজন মানুষ। কেউ তাকে মানুষ ছাড়া জানোয়ার বলবে না। মানুষের মত দুটো হাত, পা, চোখ, কান। মানুষেরই মতন মুখের ভাষা। সংসার ওরকম লোককে সবাই মানুষ বলেই জানে। অথচ প্রকাশ মামা কি সত্যিই মানুষ! কতদিন সদানন্দকে সিগারেট খাইয়েছে, তামাক খাইয়েছে, বিড়ি খাইয়েছে। যাত্রা থিয়েটার শুনতে কত দূর দূর গ্রামে নিয়ে গিয়েছে। তারপর অন্য গ্রামে রাত কাটিয়ে সকাল বেলা বাড়ি ফিরিয়ে দিয়েছে। বাড়ি আসবার আগে ভাগ্নেকে সাবধান করে দিয়েছে। বলেছে–খবরদার, কাউকে যেন বলিস নি এসব কথা–
সদানন্দ তখন ছোট। মামার কথা ঠিক বুঝতে পারতো না। জিজ্ঞেস করতো–কী সব কথা?
প্রকাশ মামা বলতো–এই কার ঘরে রাত কাটিয়েছিস—
সদানন্দ জিজ্ঞেস করত–কেন? বললে–কী হয়েছে?
প্রকাশ মামা বকতো। বলতো–দূর হাঁদা। মেয়েমানুষের ঘরে রাত কাটালে কাউকে বলতে নেই–
–কেন? মেয়েমানুষের ঘরে রাত কাটালে দোষ কী? ও মেয়েমানুষটা কে?
প্রকাশ মামা বলতো–দূর, তুই দেখছি সত্যিই একটা হাঁদা-গঙ্গারাম। দেখলি না ওটা একটা বাজারের মেয়েমানুষ!
–বাজারের মেয়েমানুষ মানে?
প্রকাশ মামা অধৈর্য হয়ে উঠতো। বলতো–আরে, তোকে নিয়ে দেখছি মহা মুশকিলে পড়া গেল। বাজারের মেয়েমানুষ কাকে বলে তাও এত বড় ছেলেকে বুঝিয়ে বলতে হবে। দেখলি নে মাগীর কী রকম ঠাঁট?
–ঠাঁট মানে?
প্রকাশ মামা বলতো–নাঃ, তোকে দেখছি আর মানুষ করতে পারলুম না। তুই বড় হয়ে যে কী করবি তা বুঝতে পারছি না। শেষকালে তুই কেলেঙ্কারি না বাধিয়ে বসিস। যখন তোর বাবা মারা যাবার পর লাখ লাখ টাকার সম্পত্তির মালিক হবি, তখন দেখছি সবাই তোকে সব ঠকিয়ে নেবে–
সদানন্দ ছোটবেলায় প্রকাশ মামার কথা শুনে অনেক জিনিস জানতে পারতো। সে জানতে পারতো যে, তাদের অনেক টাকা। তার ঠাকুরদা আর তার বাবা মারা যাবার পরই সে নাকি লাখ লাখ টাকার মালিক হয়ে যাবে! আর শুধু যে তার বাবার টাকা তাই-ই নয়, তার দাদামশাই-এর নাকি অনেক টাকা। দাদামশাই-এর মৃত্যুর পর সে-টাকাও নাকি সদানন্দ একলাই সব পাবে। তখন তার বয়েস পনেরো কি ষোল, সেই সময়েই সে এই সব কথা শুনলো। রানাঘাটের বাজারের একটা বাড়িতে তখন তাকে নিয়ে গেছে প্রকাশ মামা। সারা রাত যাত্রা শুনেছে মামার সঙ্গে। যাত্রা যখন শেষ হয়েছে তখন মাঝরাত। ঘড়িতে বোধ হয় রাত তখন দুটো। সেই অত রাত্রে সদানন্দর খুব ঘুম পেয়েছে। প্রকাশ মামা জিজ্ঞেস করলে–কী রে, খুব ঘুম পেয়েছে?
সদানন্দ বললে–হ্যাঁ।
–তা হলে আয় তোকে বিছানায় শুইয়ে দিই গে। আয় আমার সঙ্গে—
বলে বাজারের গলির ভেতরে একটা বাড়ির সামনে গিয়ে ডাকলে রাধা, রাধা, ও রাধা–
অনেক ডাকাডাকির পর একজন মেয়েমানুষ চোখ রগড়াতে রগড়াতে এসে দরজা খুলে দিলে। জিজ্ঞেস করলে–এ কী, এত রাত্তিরে? এ কে?
প্রকাশ মামার হাব-ভাব দেখে মনে হলো যেন মেয়েমানুষটা তার খুব চেনা। কথা বলতে বলতে একেবারে তার বিছানায় গিয়ে বসে পড়লো। সদানন্দ তখনও মেয়ে-মানুষটার দিকে হাঁ করে চেয়ে আছে। যাত্রা শুনতে শুনতে তখন যে তার অত ঘুম পাচ্ছিল, সেখানে সেই মেয়েমানুষটার বাড়িতে গিয়ে কিন্তু সে-সব যেন কোথায় হাওয়ায় উড়ে গেল।
–কী রে, রাধার দিকে চেয়ে অমন করে কী দেখছিস?
প্রকাশ মামা হাসতে হাসতে সদানন্দকে কথাটা বলতেই সে মাথা নিচু করে নিয়েছিল। তার সেই ওই অল্প বয়সেই মনে হয়েছিল যে, অমন করে কোনও অচেনা মেয়েমানুষের দিকে চেয়ে থাকতে নেই।
তারপর প্রকাশ মামার কথাতেই তার যেন আবার জ্ঞান ফিরে এলো। প্রকাশ মামা তখন মেয়েমানুষটার দিকে চেয়ে বলে চলেছে সদানন্দর কথা। লাখ লাখ টাকার জমিদার এর বাবা। বাবার এক ছেলে, বুঝলে? বাপ মারা গেলে এই ছেলেই সেই অত টাকার সম্পত্তির একচ্ছত্র মালিক হবে।
–তা ওকে নিয়ে আমার এখানে কেন এসেছ? ওর বাবা-মা জানতে পারলে কিছু বলবে না?
প্রকাশ মামা হেসে উঠলো। বললে–কেন, তোমাদের এখেনে আসা কি খারাপ?
রাধা বললে–না, তোমার কথা বলছি নে। তুমি তো এ-লাইনে পাকা ঘুঘু। শেষকালে ভাগ্নেকেও এ-লাইনে নিয়ে এলে, তাই বলছি–
প্রকাশ মামা সদানন্দর দিকে চাইলে। বললে–এ-লাইনে এলে ক্ষতি কী! তোমারও লাভ, আমারও লাভ–
–তোমার কিসের লাভ?
–লাভ নয়? এত টাকা এ একলা খেতে পারবে? পরের গলায় গামছা দিয়ে টাকা করেছে এর ঠাকুর্দা। কালীগঞ্জে এর ঠাকুর্দা পনেরো টাকা মাইনেতে গোমস্তার চাকরি করতো। মাত্তোর পনেরো টাকা। গোমস্তা বললে–খারাপ শোনাতো বলে সবাই এর ঠাকুর্দাকে নায়েবমশাই বলে ডাকতো। সেই পনেরো টাকায় শুরু করে আজ পনেরো লাখ টাকার জমিদারির মালিক তিনি। আর এই নাতিই হলো তার সেই সমস্ত সম্পত্তির একমাত্তোর ওয়ারিশন্।
