সদানন্দ বললে–তাহলে ওদের কী হবে?
–থামুন মশাই, যত বাজে কথার জবাব দিতে পারি নে আমি। আপনি আসবেন তো আসুন, নইলে আমি এই চললুম–
কিন্তু হাজারি বেলিফ চলে যাবে বললেই কী চলে যেতে পারে! যেদিন সদানন্দ পৃথিবীতে জন্মেছে সেই দিনটি থেকেই যে সে তার সঙ্গে নিয়েছে। সেইদিন থেকেই সে বারবার সদানন্দকে জানিয়ে এসেছে কোনটা ন্যায় আর কোনটা অন্যায়। ন্যায়-অন্যায় জ্ঞান দেবার যিনি বিধাতা তিনি তো সমস্ত মানুষেরই সৃষ্টিকর্তা। একদিন কর্তাবাবু যখন জন্মেছিলেন সেদিন তার পেছনেও তিনি এই রকম হাজারি বেলিফদের পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধেও সমন পাঠিয়েছিলেন হাজারি বেলিফের হাত দিয়ে। কিন্তু হাজারি বেলিফের হাত দু’ টাকা চার টাকা ঘুষ দিয়ে তিনি সে-সময় ঠেকিয়ে রেখেছিলেন। আর শুধু কর্তাবাবুই বা কেন? ছোট মশাই সুলতানপুরের মুখুজ্জে মশাই থেকে শুরু করে সবাই-ই তো ছিলেন আসামী। আসামী হলেও তাঁদের কাউকেই আসামী কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়নি। হাজারি বেলিফকে ঘুষ দিয়ে দিয়ে তারা বরাবর বিচারককে এড়িয়ে গেছেন। কপিল পায়রাপোড়া, মানিক ঘোষ, ফটিক প্রামাণিক আর কালীগঞ্জের বউরা তাঁদের বিষ-নিঃশ্বাসে নিঃশেষ হয়ে গেছে তবু কোর্টের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তার জন্যে কখনও জবাবদিহি করতে হয়নি। আর জবাবদিহি করতে হয়নি বলেই হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি কপিল পায়রাপোড়া, মানিক ঘোষ, ফটিক প্রামাণিক আর কালীগঞ্জের বউরা আজ আবার এখানে এসে জন্ম নিয়েছে। আর পনেরো বছর পরে তাদের বংশধররা আজ এই কলকাতায় রাস্তায় রাস্তায় কিলবিল্ করে ঘুরছে বেড়াচ্ছে। আজকের কর্তাবাবু, আর আজকের ছোট মশাইদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে এমন সদানন্দ আবার কবে জন্মগ্রহণ করবে।
হঠাৎ যেন সমস্ত কলকাতাময় একটা শোরগোল পড়ে গেল। এসেছে, এসেছে! তোমার সব সাবধান, তোমরা সব হুঁশিয়ার! আসামী এসে পড়েছে! পনেরো বছর আগে যে একদিন আমাদের ওপর প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল সে আবার এসেছে। তোমরা সব পাপ ঢাকা দিয়ে রাখো, সব ঘা লুকিয়ে ফেলো। সে দেখতে পেলে আবার অনর্থ বাধাবে। আবার তার ফুলশয্যার রাত্রে শোবার ঘর থেকে পালিয়ে যাবে, আবার নয়নতারাদের ওপর চরম প্রতিশোধ নেবে, আবার কাচের দোয়াতদানিটা নিয়ে নিজের কপালের ওপর ঠাঁই-ঠাঁই করে আঘাত করবে, আবার রক্তে মুখ ভেসে যাবে, আবার নয়নতারা সে রক্ত দেখে অজ্ঞান-অচৈতন্য হয়ে পড়বে।
আজকের কর্তাবাবুরা আবার চিৎকার করে উঠলো–দীনু–দীনু–
দীনু সামনে আসতেই কর্তাবাবু বলে উঠলেন–বংশী ঢালী কোথায়? বংশী ঢালীকে একবার ডাকো তো দীনু–
বংশী এসেই হুজুরকে পেন্নাম করলে। বললে–বলুন কর্তাবাবু কী কাজ, নিজের জান দিয়ে আমি আপনার কাজ করে দেব–
কর্তাবাবু বললেন–খুব সাবধানে করতে হবে কিন্তু বংশী, কেউ যেন জানতে না পারে–
বংশী বললে—আগে
কি কখনও অসাবধান হয়েছি যে আপনি ওকথা বলছেন?
কর্তাবাবু বললেন–ওরে, তা বলছি নে, আবার একটা ঝামেলা হয়েছে, সেই ঝামেলাটা তোকে কাটাতে হবে–
বংশী বললে–বলুন না, কাকে খতম করবো?
কর্তাবাবু বললেন–এই এখুনি খবর পেলুম। সেবার জানিস তো খোকার বিয়ের পরদিন কালীগঞ্জের বউ এসেছিল?
বংশী বললে–খুব মনে আছে হুজুর, আমি তাকে খতম করে দিয়েছিলুম, কেউ কি সে খবর টের পেয়েছিল?
–না, তা পয়িনি। সেই জন্যেই তো তোকে এবার আবার ডেকেছি।
–তা বলুন না হুজুর, এবার কাকে খতম করতে হবে? আবার কে এসেছে? বড় বিশ্বাসী কর্মচারী এই বংশী ঢালীরা। সেই কর্তাবাবুর অনেক আগেকার আমলেও এরা ছিল, এই এতদিন পরেও এরা আছে। জমিদারি উঠে গেল, ইজিপ্ট, আফ্রিকা, এশিয়ার সব দেশ থেকে কর্তাবাবুরা সবাই চলে গেল, সব দেশ আবার স্বাধীন হয়ে গেল, গণতন্ত্র চালু হয়ে গেল, কিন্তু রয়ে গেল সেই আয়-আদায় আর সঙ্গে রয়ে গেল কর্তাবাবুদের সেই দাপট। আর তার সঙ্গে রয়ে গেল এই বংশী ঢালীরা। সত্যিই বড় বিশ্বাসী কর্মচারী এই বংশী ঢালীরা। সুখশান্তির দিনে তারা খেতে পাচ্ছে কি উপোস করে মরছে তা দেখবার দায় ছিল না কর্তাবাবুদের, এখনও তাদের সে দায় নেই। কিন্তু বিপদের দিনে এখনও তারাই ভরসা। তারাই বরাবর বুক দিয়ে বাঁচায় কর্তাবাবুদের। এবারও তাই বংশী ঢালীদের ডাক পড়েছে দরবারে।
–বলুন হুজুর, এবার কাকে খতম করতে হবে? কে এসেছে?
কিন্তু উত্তর দেবার আগেই টেবিলের টেলিফোনের বাজনাটা বেজে উঠলো।
কর্তাবাবু রিসিভারটা তুলেই বললেন–কে?
–চীফ-মিনিস্টার বলছেন?
কর্তাবাবু বললেন–হ্যাঁ, কী হলো? মিসেস ব্যানার্জি নাকি?
ওধার থেকে মিসেস ব্যানার্জির মিহিগলার কৃতজ্ঞ সম্মতির হাসি ভেসে এল।
–আজকে আমার এখানে আপনার আসবার কথা, আমি একবার রিমাইণ্ড করে দিচ্ছি, প্রথমের জন্মদিন, মনে আছে তো মিস্টার সেন?
কর্তাবাবু বললেন–শিওর, প্রথমের জন্মদিন, আমার মনেই ছিল না একেবারে। মনে করিয়ে দিলে ভালো করেছেন। সত্যি কী চমৎকার নাম রেখেছেন। প্রথম!
মিসেস ব্যানার্জি বললে–প্রথম নামটা সত্যিই পছন্দ হয়েছে আপনার?
–সত্যিই বড় বিউটিফুল নাম। এমন অরিজিন্যাল নাম কে দিলে মিসেস ব্যানার্জি?
মিসেস ব্যানার্জি বললে—ও–
–মিস্টার ব্যানার্জ? তাই নাকি? নাঃ ওঁর তো দেখছি ইমাজিনেশান আছে খুব!
