কিন্তু সদানন্দর কানে যেন কথাটা ঢুকলো না। থিয়েটার রোডে বাড়ি করেছে! ভালোই করেছে নয়নতারা। এখানে ভাড়াটে বাড়িতে থাকার চেয়ে কলকাতায় নিজস্ব বাড়ি করে ভালোই করেছে তারা। হয়ত আর নিখিলেশবাবুকে চাকরি করতে হচ্ছে না। নয়নতারাকেও হয়ত আর চাকরি করতে হচ্ছে না টাকার জন্যে। হয়ত মনে মনে তারা সদানন্দর ওপর কৃতজ্ঞ! টাকাটা তো সে নিজে তাদের হাতে তুলে দেয়নি। একটা ব্যাগের মধ্যে চিঠির সঙ্গে চেকটা রেখে দিয়ে চলে এসেছিল। চেকটা পাবার পর কি নিখিলেশবাবু চমকে উঠেছিল। মনে কি আনন্দ হয়েছিল টাকাগুলো পেয়ে! অতগুলো টাকা আচমকা পেয়ে মধ্যবিত্ত মানুষের আনন্দ হওয়াই তো উচিত। আর তা ছাড়া ওদের সংসারের অশান্তির মূল কারণটাই তো ছিল টাকা। আর শুধু ওদের কেন, পৃথিবীর সমস্ত সংসারের অশান্তির মূলেই তো ওই টাকা! টাকার অভাব ছিল বলেই তো ওরা নয়নতারার বিয়ের সময়কার গয়নাগুলো ফিরিয়ে নিতে নবাবগঞ্জ পর্যন্ত গিয়েছিল! হয়ত ওদের মত পৃথিবীর সমস্ত মানুষই টাকা চায়। আর নয়নতারার দোষ কী, কিম্বা নিখিলেশবাবুরই বা দোষ কোথায়! সেই কর্তাবাবুই কি টাকা চায়নি? যাদের বেশি আছে তারাও টাকা চায়, যাদের কিছুই নেই তারাও টাকা চায়।
হাজারি বেলিফ বললে–আবার এদিকে কোথায় যাচ্ছেন?
সদানন্দ বললে–সেই যে থিয়েটার রোডে!
হাজারি বেলিফ বললে–আপনার জন্যে তো আর পারা গেল না মশাই। এমন অদ্ভুত আসামী তো আমি দেখেনি! কোথায় চৌবেড়ে থেকে বেরিয়ে কাঁহা-কাঁহা ঘুরলুম বলুন তো!
সদানন্দ বললে–এইবারই শেষ হাজারিবাবু, এর পরে আপনাকে আর ঘোরাবো না। হাজারি বেলিফ তখন আর চলতে পারে না। বললে–আর কেন মিছিমিছি আমাকে কষ্ট দিচ্ছেন। আপনারই যত দোষ মশাই, আপনিই তো যত গণ্ডগোল বাধিয়েছেন–
–কেন?
হাজারি বললে–আপনি তো কারোর সঙ্গে তাল দিয়ে চলতে পারলেন না। পৃথিবীর সবাই-ই তো বেশ তালে তাল মিলিয়ে চলেছে–তার সঙ্গে আপনিও তাল দিলে পারতেন। তাহলে আর এই আপনার নামে হুলিয়া বেরোত না।
কলকাতার রাস্তায় তখন ভিড়ের বন্যা বয়ে চলেছে। সদানন্দ ভিড়ের পাশ কাটিয়ে কাটিয়ে এগিয়ে চলছিল। এতকাল পরে কলকাতায় ফিরে আসা। পনেরো বছর আগের ফেলে আসা সেই শহর। সদানন্দের চোখে শহরের এ চেহারা যেন নতুন মনে হলো। চিরকালের সেই উদার আকাশের তলায় এ শহরের মানুষগুলো যেন আরো রক্তহীন আরো বিবর্ণ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু আকাশটাই বা এত ধূসর হলো কী করে? আগে তো এরকম ছিল না। চারিদিকে লজ্জাহীন দারিদ্র্য যেন হাঁ করে রয়েছে। কয়েকটা গোটা পরিবার রাস্তার যাত্রীদের করুণার ওপর আত্মসমর্পণ করে তাদের ঘর-সংসার পেতে বসেছে। এরা কারা? কোত্থেকে এখানে এল?
সদানন্দ বললে–আপনার কাছে একটা টাকা হবে হাজারিবাবু?
হাজারি বেলিফ চমকে লাফিয়ে উঠেছে। বললে–টাকা?
–হ্যাঁ, আমার কাছে আর টাকা নেই, ওদের কিছু দিতুম, দেখছেন না কীরকম অভাব ওদের!
হাজারি বেলিফ বললে–আপনি রাখুন মশাই, আপনার নামে কোর্টের হুলিয়া ঝুলছে আর আপনি ওদের দেবেন ভিক্ষে! আপনাকে কে ভিক্ষে দেয় তার ঠিক নেই! এই জন্যেই তো মশাই আপনার এত হেনস্থা!
সদানন্দ বললে–কিন্তু ওদের দেখে যে মায়া হচ্ছে বড়–
–মায়া? আপনার মায়া হচ্ছে? ওই দয়া-মায়াই তো পাপ। ওই পাপ করেই তো আপনি গেলেন!
সদানন্দ বললে–দয়া-মায়া পাপ? আপনি বলছেন কী? দয়া-মায়া ভালবাসা-স্নেহ মমতা পাপ, এ কথা কে বললে?
হাজারি বেলিফ বললে–চলে আসুন, চলে আসুন, এখানে দাঁড়াবেন না, দাঁড়ালেই সবাই পয়সা চাইবে। আজকাল সব মানুষ কেবল পয়সা-পয়সা করে ভিখিরি হয়ে গেছে–
সদানন্দ চারদিকে চেয়ে দেখলে। একশো জোড়া হাত তাদের ঘিরে ধরেছে। সকলের মুখে-চোখে কঙ্কালের ছাপ। হাজারি বেলিফ সদানন্দর হাত ধরে টানতে লাগলো। টেনে বাইরে নিয়ে আসবার চেষ্টা করলে। কিন্তু যেদিকেই যায় সেদিকেই ভিখিরিদের ভিড়।
হাজারি তাড়া দিতে লাগলো। বললে–চলে আসুন, শিগগির চলে আসুন–
সদানন্দ বললে–এরা কারা হাজারিবাবু? এর তো আগে এখানে ছিল না–আগে শুধু বড়বাজারেই থাকতো এরা। ভিক্ষের জন্যে সেখানে আমাকে সবাই রাজাবাবু বলে ডাকতো
হাজারি বেলিফ বললে–এরা সব মানুষ মশাই, মানুষ–
সদানন্দ বললে–আপনি আমার সঙ্গে রসিকতা করেছেন! এরা মানুষ তা কী আমি জানি না? কিন্তু দুটো হাত আর দুটো চোখ যাদের আছে তারাই কী মানুষ?
হাজারি বেলিফ বলে উঠলো–আরে মশাই, আজকাল এরাই কলকাতাময় ছড়িয়ে আছে। এদের জ্বালায় রাস্তায় হাঁটতে পারবেন না, যেখানে যাবেন সেখানেই এরা। এদের দিকে মোটে চোখ দেবেন না, একবার চোখ দিলেই এরা পেয়ে বসবে–আপনি তাড়াতাড়ি চলে আসুন–
সদানন্দও চেয়ে দেখেলে, সত্যিই তাই। পনেরো বছরে এ শহরের শেষ পর্যন্ত এই হাল হয়েছে। মানুষগুলোরও এই হাল! অথচ আগে তো এমন ছিল না। এরা সবাই রাস্তায় কিলবিল করছে কেন?
হাজারি বললে–বাড়িতে যে এদের থাকবার ঘর নেই, তাই রাস্তায় কিলবিল করছে!
–তা বাড়িতে এদের ঘর নেই-ই বা কেন?
–ঘর থাকবে কী ঘরে? বছর বছর মানুষের ছেলে হলে তো আর সেই অনুযায়ী ঘর বাড়ানো যায় না। ছেলে তৈরী করতে তো কারো পয়সা লাগে না, কিন্তু ঘর তৈরি করতে যে পয়সা লাগে মশাই। আপনি চলে আসুন, ও-সব ভাবতে গেলে আপনার শরীর খারাপ হয়ে যাবে–
