–তা আপনার আর সময় নষ্ট করবো না মিস্টার সেন। মিসেস সেনকে নিয়ে আসবেন কিন্তু। সকলকেই আজকে আসতে বলেছি, মিস্টার নবিকভ্ও আসছেন–
–আর মিস্টার হেন্ডারসন?
–হ্যাঁ, মিস্টার হেন্ডারসনকেও বলেছি। সেদিক থেকে আমি কোনও ভুল করতে পারি?
–ও-কে।
শুধু চিফ-মিনিস্টার নয়, সকলেই এক-এক করে টেলিফোন পেতে লাগলেন। কর্তাবাবুকে বাদ দিলে যেমন চলে না, তেমনি প্রাণকৃষ্ণ সা’কেও বাদ দিতে পারা যায় না। তারিণী চক্রবর্তী, বেহারি পাল তারাও নবাবগঞ্জের গন্যমান্য লোক। নবাবগঞ্জের প্রজার বাড়িতে বিয়ে-অন্নপ্রাশন হলে গ্রামের যাঁরা মাথা তাদের ডাকতেই হবে। নইলে খোসামোদের সিঁড়ি বেয়ে ইজ্জতের শিখরে ওঠা যায় না। আর ইজ্জতের শিখরে ওঠার প্রধান ধাপই হচ্ছে পার্টি দেওয়া। ইজ্জতই যদি না পেলাম তো শুধু ব্যাঙ্কের টাকা নিয়ে কি আমি ধুয়ে খাবো? আর শুধু তো বাড়ি-গাড়ি বাবুর্চি-খানসামা নিয়ে পেট ভরে না! পদ্মশ্রীটা আজকাল বড় মামুলী হয়ে গেছে। পদ্মবিভূষণ না হোক, পদ্মভূষণটা অন্ততঃ পেতে হবে। তার পরে প্রথম না হয় এখন ছোট আছে। এই সবে বারো বছরে পড়লো। কিন্তু চিরকাল তো আর ছেলেমানুষ থাকবে না সে। একদিন প্রথম আরো বড় হবে। কলকাতায় থাকলে তো সে মানুষ হবে না। আরো পাঁচজন বখাটে ইণ্ডিয়ানদের সঙ্গে একই স্কুলে লেখাপড়া করলে সেও তাদের মত বখাটে হয়ে যাবে। এখন থেকেই তার ভবিষ্যতের কথা ভাবা উচিত। হয় রাশিয়া না হয় আমেরিকাতে তাকে পাঠাতে হবে। সুতরাং এমব্যাসিগুলোকে হাতে রাখা দরকার।
মিস্টার নবিকভ্ টেলিফোন-রিসিভারটা তুলে নিলেন–হ্যালো–
ওধার থেকে মিহি হাসির মত মিষ্টি গলায় আওয়াজ এল–আমি মিসেস ব্যানার্জি স্পিকিং–গুড মনিং মিস্টার নবিক, আজকে সন্ধ্যার কথা মনে আছে তো! আমার প্রথমের জন্মদিন, বার্থ-ডে, আমি একবার রিমাইণ্ড করে দিচ্ছি–
–ও শিওর শিওর। প্রথমের বার্থ-ডে!
মিসেস ব্যানার্জি বললে–আসা চাই কিন্তু, মিসেসকে সঙ্গে নিয়ে আসবেন, ভুলবেন না–
–প্রথম মানে কী মিসেস ব্যানার্জি? আপনি বলেছিলেন বটে, কিন্তু আমি ভুলে গিয়েছি!
মিসেস ব্যানার্জি বললে–-প্রথম মানে ফার্স্ট–
–ভেরি গুড নেম! বলে ডিপ্লোম্যাটিক হাসি হাসতে লাগলেন মিস্টার নবিকভ্।
এর পরে মিস্টার হেনডারসন। মিস্টার হেনডারসন ক্যালকাটায় পোস্টিং হবার আগে আমেরিকার এ্যামবাসাডার হয়ে ওয়েস্ট-এশিয়ায় ছিলেন। বলতে গেলে থার্ড-ওয়ার্ড সম্বন্ধে তিনি স্পেশ্যালিস্ট। প্রেসিডেন্টের বিশেষ প্রিয়পাত্র। ক্যালকাটায় পোস্টিং হবার আগে ভালো করে ট্রেনিং নিয়ে এসেছেন। তিনি সেখানে জেনেই এসেছে বাঙ্গালীরা ভারি শ্রুড অথচ ইমোশনাল। একবার যদি তুমি ওদের ককটেল পার্টিতে ডাকো তো ওরা বর্তে যাবে। ফ্ল্যাটারির রাজা ওরা। কিন্তু বাইরে সবাই ওরা এমন সেজে থাকে যেন কত ইনটেলেকচুয়্যাল। আসলে সবাই ফুলিশ। একবার যদি ওদের আমেরিকা টুর করাবার লোভ দেখাও তো যেন হাতে চাঁদ পাবে। ওরা তোমাকে মাথায় নিয়ে নাচবে।
হেন্ডারসন জিজ্ঞেস করেছিল–ওরা যদি পার্টিতে মেনন্তন্ন করে তো যাবো?
–শিওর, সাদা চামড়া, বিশেষ করে আমেরিকানদের ওপর ওদের একটা উইকনেস আছে!
মিস্টার হেন্ডারসন বলেছিল কিন্তু আমি শুনেছিলুম, ওরা নাকি একটু রাশিয়া ঘেঁষা?
–রাবিশ! বরং বলতে পারো টাকা-ঘেঁষা। আসলে সব বাঙালীই এক-একজন পোয়েট, পোয়েটরা কি পলিটিক্স বোঝে? বোঝে? বোঝে শুধু হুজুগ। নিজের কেরিয়ারের জন্যে ওরা সব কিছু করতে পারে–ওই বাঙালীরা–
আসবার আগে ওয়াশিংটন থেকে হেন্ডারসনকে সব কিছু শিখিয়ে পড়িয়ে ক্যালকাটায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আর শুধু ওয়াশিংটন কেন, মসকো থেকেও মিস্টার নবিকভকে সব কিছু পাখীপড়া করে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাই এখানে আসবার পর থেকে দু’জনেই বাঙালী-সমাজে মিশতে আরম্ভ করেছিল। সেই সূত্রেই মিসেস ব্যানার্জির সঙ্গে আলাপ।
আসলে একটুখানি শুধু হচ্ছে। ইচ্ছে আর টাকা ওই দুটো মূলধন থাকলে তুমি ইচ্ছের সিঁড়ি বেয়ে একেবারে ইজ্জতের শিখরে গিয়ে উঠতে পারবে।
এর পরে পুলিস কমিশনার।
–হ্যাল্লো!
–মিস্টার সামন্ত আমি মিসেস ব্যানার্জি বলছি। আজকে আসছেন তো?
–মিস্টার সামন্ত বললেন নিশ্চয়ই। প্রথমের বার্থ-অ্যানিভার্সারি, আর আমি যাবো না? বলছেন কী আপনি?
–তাহলে একটা অনুরোধ করবো মিস্টার সামন্ত। আমার লোক্যাল থানার ওসি’কে যদি একবার বলে দেন, বাড়ির সামনে কয়েকজন কনস্টেবল-এর বন্দোবস্ত করতে।
–ও-কে, আমি এখনি ব্যবস্থা করছি।
এমনি করে সমস্ত নবাবগঞ্জের তাবৎ ভি-আই-পি’দের ডাকা হয়েছিল। আবার সেদিন সকলকে মনে করিয়েও দেওয়া হলো। কর্তাবাবুর বাড়ির কাজে সবাইকে আসতেই হবে। তাতে যারা আসবে তাদেরও ইজ্জৎ বাড়বে, আর যার বাড়িতে আসবে তাদেরও ইজ্জৎ বাড়বে।
কিন্তু কালীগঞ্জের বউ কেন বিনা নিমন্ত্রণে আসতে গেল?
কর্তাবাবু কৈলাস গোমস্তাকে জিজ্ঞেস করলেন–কৈলাস, তুমি কি কালীগঞ্জের বউকে নেমন্তন্ন করেছিল নাকি?
কৈলাস বললে–আজ্ঞে না–
–তা নেমন্তন্ন না করলে সে এখন এ বাড়িতে আসে কেন? কোন্ সাহসে আসে? কৈলাস বললে–আজ্ঞে নতুন বউ-এর মুখ দেখতে এসেছে–
–তা নতুন বউএর মুখ দেখতে কি আজকেই আসতে হয়? যা হোক, যখন এসে গেছে তখন আর তাড়িয়ে দেবার দরকার নেই? কিন্তু বেশিক্ষণ যেন না থাকে–
