তাদের কথা শেষ হবার আগেই দূর থেকে একটা বোমা-ফাটার শব্দ হলো। লোকগুলো যদিও বা আরো কিছু বলতো, তখন আর বললে না। সোজা রেলবাজারের দিকে চলতে লাগলো। হাটবার। হাটের লোক সওদা করতে এসেছিল, সব যে-যার দিকে ছিটকে পালাতে লাগলো। কিন্তু বোমা কেন? সদানন্দ সেখানে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে সেই ধোঁয়ার দিকে চেয়ে দেখতে লাগলো। সত্যিই তো, বোমা কেন?
হাজারি বেলিফ বললে–আমি মশাই ওদিকে আর যাবো না, শেষকালে কি গুলি খেয়ে মরবো নাকি?
সদানন্দ বললে–কিন্তু আমার যে গিয়ে একবার দেখতে ইচ্ছে করছে। একবার গিয়ে দেখতুম স্কুল-কলেজ-হাসপাতাল করে দিয়ে দেশের লোকের কী ক্ষতিটা আমি করেছি–
–তা আপনি মশাই লোকের উপকার করতে গেলেনই বা কেন? আপনার কীসের মাথার দায় পড়েছিল?
সদানন্দ বললে–উপকার করবো না? পরোপকার করা তো মানুষের ধর্ম!
হাজারি বেলিফ বললে–ইস্, আপনার তো ফাঁসি হওয়া উচিত মশাই, আপনি করেছেন কী?
–কেন? ফাঁসি হওয়া উচিত কেন?
–ফাঁসি হবে না? পরের উপকার করতে গেলেন আপনি কী বলে? দেখুন তো, লোকগুলো বেশ ছিল, মাঝখান থেকে আপনি তাদের এই সর্বনাশটা করলেন। তারা আপনার কী ক্ষতি করেছিল যে তাদের আপনি ইস্কুল কলেজ হাসপাতাল করে দিলেন?
হঠাৎ আবার বন্দুকের গুলির আওয়াজ শুনেই হাজারি বেলিফ একেবারে দশ হাত পেছিয়ে গেছে। বললে–না মশাই, আমি আর এগোচ্ছি না, আপনি ফিরে চলুন—
সদানন্দও আর এগোল না। সদানন্দও ফিরলো। কিন্তু এরকম কেন হলো? স্কুল-কলেজ হাসপাতাল করে দিয়ে সে নবাবগঞ্জের মানুষদের কী এমন ক্ষতি করেছে, সেটা দেখতে তার বড় ইচ্ছে হচ্ছিল–
কিন্তু হাজারি বেলিফ বললে–না মশাই, আপনার যদি দেখতেই ইচ্ছে হয় তো আপনি আমায় পাঁচটা টাকা দিয়ে যেখানে ইচ্ছে চলে যান, আমি আপনার সঙ্গে যাচ্ছিনে
সদানন্দ আর কী করবে। সেও আবার উল্টো-পথে রেলবাজরের দিকে চলতে লাগলো।
.
নৈহাটির বাজারের স্যাকরা মনোহর দত্ত নিজের দোকানে বসে তখন সোনার গয়না কেনা বেচা করছিল। হঠাৎ শো-কেসের ওপার থেকে কে যেন একজন বুড়ো মানুষ তাকে লক্ষ্য করে একটা কথা জিজ্ঞেস করলে–হ্যাঁ মশাই, একটা কথা জিজ্ঞেস করব আপনাকে?
মনোহর দত্ত ভালো করে চেয়ে দেখলে সেদিকে। একজন বুড়োমানুষ, মুখময় কাঁচা পাকা দাড়িগোঁফ। তার পাশে আর একজন বুড়ো মানুষ। কিন্তু তার দাড়ি-গোঁফ সদ্য কামানো।
–বলুন, কী বলবেন?
–আচ্ছা, বলতে পারেন, এখানকার বোসপাড়ার নিখিলেশ ব্যানার্জি কোথায় গেছেন?
–নিখিলেশ ব্যানার্জি? কলিকাতার অফিসে চাকরি করতেন তো?
সদানন্দ বললে–হ্যাঁ, তার বাড়ি থেকেই আমরা আসছি। সে বাড়িতে এখন দেখলুম কেউ নেই। তাঁর স্ত্রী নয়নতারা ব্যানার্জী, তিনিও কলকাতার একটা অফিসে চাকরি করতেন, তাঁকেও বাড়িতে পেলাম না। অন্য ভাড়াটেরা রয়েছে, তারাও কিছু বলতে পারলেন না কোথায় গেছেন তাঁরা–
মনোহর দত্ত বললে–তারা তো অনেক দিন আগেই নৈহাটি ছেড়ে চলে গেছে। সে প্রায় পনেরো বছর আগের কথা। তারা তো এখন কলকাতায় থাকে। থিয়েটার রোডে বিরাট বাড়ি করে উঠে গেছে। আপনারা কোথা থেকে আসছেন?
সদানন্দ বললে–নবাবগঞ্জ বলে একটা গ্রাম থেকে–
মনোহর দত্ত বললে–ও, তা তাদের অবস্থা এখন খুব ভালো হয়ে গেছে মশাই, এককালে তাদের খুবই দুরবস্থা ছিল, তারপর হঠাৎ একদিন কোথাকার লটারিতে চার-পাঁচ লাখ টাকা পেয়ে গেল, আর সঙ্গে সঙ্গে রাতারাতি অবস্থা পালটে গেল–
–লটারিতে টাকা পেয়েছিল?
মনোহর দত্ত বললে–কপাল মশাই, সবই কপাল! শুনলুম এখানকার বাড়ি ছেড়ে দিয়ে কলকাতায় চলে গিয়েছে। সেখানে থিয়েটার রোডে নাকি একটা বাড়ি করেছে–
সদানন্দ বললে–থিয়েটার রোডে? বাড়ির নম্বর কত?
মনোহর বললে–তা জানি নে মশাই, থিয়েটার রোডে গিয়ে পাড়ার লোকদের জিজ্ঞেস করলেই টের পারেন বড়লোকদের বাড়ির ঠিকানা খুঁজতে কখনও অসুবিধে হয় না–
তা বলে! সদানন্দ আর সেখানে দাঁড়ালো না। আস্তে আস্তে আবার যে রাস্তা দিয়ে এসেছিল সেই রাস্তা দিয়েই আবার উল্টোদিকে চলতে লাগলো। আবার স্টেশনের দিকে। পনেরো বছর আগে একদিন এই নৈহাটিতে কতবার এসেছে সে। পনেরো বছর আগে একদিন এই রাস্তা দিয়েই সে এখান থেকে বিদায় নিয়ে চলে গিয়েছিল। নিজের যাবতীয় অর্থ, নিজের যাবতীয় শুভেচ্ছা সমস্ত নিঃশেষ করে উজাড় করে ঢেলে দিয়ে গিয়েছিল এইখানে, এই বোসপাড়ার বাড়িটার দু’জন লোকের হাতে। তাদের সংসারের সাচ্ছল্য আর সমৃদ্ধি কামনা করে, তাদের পরস্পরের প্রতি আর সৌহার্দ্য অটুট থাকার প্রার্থনা করে সে এই রাস্তা দিয়েই চলে গিয়েছিল। সদানন্দ কল্পনাও করেনি যে আবার তাকে একদিন এই নৈহাটিতে ফিরে আসতে হবে। শুধু নৈহাটি কেন, সুলতানপুর, নবাবগঞ্জ কোনও জায়গাতেই ফিরে আসবার পরিকল্পনা ছিল না তার। এই হাজারি বেলিফ না এলে হয়ত এখানে আর কখনও আসতোও না সে।
–কী হলো মশাই? আবার কোথায় যাচ্ছেন?
পেছনে হাজারি বেলিফ হাঁফাতে হাঁফাতে আসছিল। সে আর হাঁটতে পারছিল না তখন। বললে–আপনার সঙ্গে বেরিয়ে তো মহা মুশকিলে পড়া গেল দেখছি।
সদানন্দ বললে–আর বেশি দূর নয় হাজারিবাবু, আর একটা জায়গা দেখলেই আমার সব দেখা হয়ে যাবে। আমি জানতে চাই, আমি দোষী না নির্দোষ
হাজির বললে–আপনি তো দেখছি মহা-আহাম্মক মানুষ। আমি এই তিরিশ বছর ধরে অনেক সমন ধরিয়ে এসেছি, কিন্তু আপনার মত এমন আসামী তো আমার বাপের জন্মেও দেখিনি–। তার চেয়ে আমাকে পাঁচটা টাকা দিয়ে দিন না মশাই, আমি মুক্তি পেয়ে যাই। আমার এত টানা-হ্যাঁচড়া আর ভাল্লাগছে না মশাই–
