হাজারি বেলিফ হঠাৎ উঠলো–আসুন মশাই, চলে আসুন–
কিন্তু সদানন্দ সে কথা শুনলে না। জিজ্ঞেস করলে–এ-সব কথা আপনারা কোত্থেকে শুনেছেন? এ-সব কি সত্যি কথা?
লোকটা বললে–এ-সব কথা তো খবরের কাগজেই বেরিয়েছে মশাই, আপনারা পড়েননি? খবরের কাগজে কি মিথ্যা কথা ছাপা হয় বলতে চান? আসলে তো মশাই টাকা। টাকার কাছে ছেলে বাপ-মামা-ভাগ্নে কিছু নেই, তা তো জানেন–
রাস্তায় চলতে চলতে সদানন্দের মনে হলো, কই, সুলতানপুরের মানুষ একজনও তো কেউ বললে–না চৌধুরী মশাই-এর ছেলের মহৎ লক্ষ্য ছিল, চৌধুরী মশাই-এর ছেলের ত্যাগের সাধনা ছিল, চৌধুরী মশাই-এর ছেলে উদার-প্রাণ ছিল। একজনও তো কেউ বললে না টাকা সে নিয়েছে পরকে আপন করার জন্যে। উত্তরাধিকারসূত্রে যে-টাকা সে পেয়েছে সে-টাকার এক কপর্দকও সে নিজের জীবন ধারণের জন্যে গ্রহণ করেনি তা তো কেউই বললে না। অথচ কত অবলীলায় প্রকাশ মামা এদের কাছে মহাপ্রাণ হয়ে উঠেছে। তার অজ্ঞাতবাসের এই পনেরো বছরের মধ্যে মিথ্যেটাই কি মুখে-মুখে এমন সত্যে পরিণত হয়ে গেছে যে, প্রতিবাদ করলেও তারা খবরের কাগজের দোহাই দেবে!
কোথায় সেই চৌবেড়িয়া, আর কোথায় এই সুলতানপুর। এই সুলতানপুর থেকেই আবার নবাবগঞ্জ। সদানন্দকে যেন আবার নতুন করে তার সমস্ত কর্মের পুনর্বিচার করতে হচ্ছে। এতদিন তাহলে যা সে বিশ্বাস করে এসেছে, তা সমস্তই কি তবে ভুল বিশ্বাস! তার সমস্ত পরিশ্রম কি তবে পণ্ডশ্রম!
রেল বাজার থেকে নেমে আবার সেই ছ’ ক্রোশ পথ! কখন সুলতানপুর থেকে বেরিয়ে চল্লিশ ঘণ্টা রাস্তায় কাটিয়ে আবার ট্রেনে উঠে রেলবাজারে নেমেছিল সেদিকে খেয়াল ছিল না সদানন্দর। তার মধ্যে হাজারি বেলিফ, শেয়ালদ’ স্টেশনের প্ল্যাটফরমে দাড়ি কামিয়ে নিয়েছে, চান করেছে। আবার ট্রেনে উঠেছে। তারপর রেলবাজারে এসে নেমেছে।
–আর কত দূর মশাই? আমি যে আর পারছি নে?
সদানন্দ বললে–এবার একবার যাবো নবাবগঞ্জে–
–তা নবাবগঞ্জ হলেই শেষ তো?
সদানন্দ বললে–না, নবাবগঞ্জটা দেখে একবার যাবো নৈহাটিতে–
–নৈহাটিতে কেন?
–নৈহাটিতে আমার স্ত্রী আছে।
হাজারি বেলিফ বললে–আপনার আবার স্ত্রী কোথায়? সে স্ত্রীকে তো আপনি ত্যাগ করেছেন–
সদানন্দ বললে–হ্যাঁ ত্যাগ করেছি বটে, কিন্তু আপনি যে বলছেন সেই স্ত্রী আমার বিরুদ্ধে নালিশ করেছে। আমি শুধু একবার নৈহাটিতে জানতে যাব সে কেন আমার বিরুদ্ধে নালিশ করেছে, আমার বিরুদ্ধে কী তার অভিযোগ আমি তার কী ক্ষতি করেছি–
হাজারি বেলিফ বললে–কিন্তু অন্যায় একটা কিছু করেছেন আপনি নিশ্চয়ই, নইলে কেউ কি কারো মিথ্যে মিথ্যে দোষ দেয়? আপনি তো দেখলেন সুলতানপুরের লোক কী বললে! সবাই তো বললে–আপনিই আপনার বাপকে খুন করেছে–
সদানন্দ বললে–হ্যাঁ, তা তো দেখলুম
–তবে? তবে কেন আপনার নামে সবাই মিথ্যে মিথ্যে বলতে যাবে বলুন। একজন বললে–তবু না-হয় একটা তার মানে ছিল, দেশসুদ্ধ লোক আপনার নামে নালিশ করছে। কেন? আপনি কি বলতে চান মশাই যে সবাই খারাপ আর একলা আপনিই ভালো, আপনিই একেবারে ধর্মপুত্তুর যুধিষ্ঠির? আপনি মশাই আমাকে কি তেমন বোকা পেয়েছে যে আপনি যা বললেন তাই-ই আমি বিশ্বাস করবো–
সদানন্দ বললে–না হাজারিবাবু, তবু আমি নিজের চোখে একবার সব কিছু দেখতে চাই–আমাকে আর কিছু সময় দিন। শেষ বিচারের আগে আমি একবার দেখে যেতে চাই যে, আমি যা কিছু করেছি তা ভুল করেছি না ঠিক করেছি–
মুবারকপুরের কাছে আসতেই হঠাৎ সদানন্দ দেখলে নবাবগঞ্জের দিক থেকে দলে-দলে লোকজন পালিয়ে আসছে।
সদানন্দদের দেখে তারা বললে–কোথায় যাচ্ছেন আপনারা?
সদানন্দ বললে–নবাবগঞ্জে—
লোকগুলো বললে–যাবেন না ওদিকে, যাবেন না মশাই, গুলি চলছে নবাবগঞ্জে–
–গুলি? গুলি চলছে কেন? আপনারা কারা?
লোকগুলো বললে–আমরা ভেণ্ডার, নবাবগঞ্জের হাটে সওদা করতে গিয়েছিলুম, এখন প্রাণ নিয়ে পালাচ্ছি। ওই দেখুন আগুন জ্বলছে, ধোঁয়া দেখতে পাচ্ছেন?
সদানন্দ দূর আকাশের দিকচক্রবালের দিকে চেয়ে দেখলে সেদিকটা ধোঁয়ায় ধোঁয়া হয়ে গেছে। কেন? আগুন জ্বলছে কেন?
–সি-আর-পি পুলিস গুলি চালিয়ে সব ঠাণ্ডা করে দিচ্ছে—
–কেন? কী হয়েছে ওখানে?
ছেলেদের ইস্কুলে বোমা পড়েছে, তারা হরতাল করেছে। ছেলেরা পড়বে না—
সদানন্দ চমকে উঠলো। তারই দেওয়া টাকায় স্কুল হয়েছে। সেই স্কুলেই হরতাল হয়েছে নাকি? কেন, কীসের হরতাল?
কিন্তু সদানন্দর কথার উত্তর দেবার তখন সময় নেই কারো। পেছনে আর একদল লোক বড় বড় ঝাঁকা নিয়ে আসছিল। তারাও পালাচ্ছে। উত্তরটা তারাই দিলে। বললে– হাসপাতাল, ইস্কুল, কলেজ সব পুড়ছে মশাই–সব পুড়ছে–
–হাসপাতালও পুড়ছে? তাহলে রুগীরা কী করছে? ডাক্তাররা?
–আরে মশাই, রুগীরা কি হাসপাতালে ওষুধ পায় নাকি যে, হাসপাতালে রুগীরা থাকবে? ডাক্তাররা তো ওষুধ বিক্রি করে ফাঁক করে দিচ্ছে। নবাবগঞ্জের কেউ হাসপাতালে যায় না, ছেলে-মেয়েরাও কেউ লেখাপড়া করে না নবাবগঞ্জে–
সদাননন্দর মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলে–তা, এরকম হলো কেন বলতে পারো?
লোকগুলো বললে–যত নষ্টের গোড়া নবাবগঞ্জের চৌধুরী মশাই-এর ছেলে। সেই ছেলেই তো নবাবগঞ্জের এই সব্বোনাশটা করে গেছে। আগে মশাই আমরা বেশ ছিলুম, এখানে আমাদের কোনও ঝঞ্ঝাট ছিল না, যেদিন থেকে ইস্কুল কলেজ আর হাসপাতাল হয়েছে সেই দিন থেকেই এই উটকো ঝঞ্ঝাট শুরু হয়েছে, সেই চৌধুরী মশাই-এর ছেলেই এখানকার সব্বোনাশটা করে গেছে–
