সবাই বললে–রায় মশাই-এর তুল্য লোক হয় না মশাই। একেবারে দেবতুল্য লোক। অথচ ওই ভাগ্নের জন্যে রায় মশাই একদিন কী-ই না করেছে। নিজে পাত্রী পছন্দ করে তার বিয়ে দিয়েছে। সারা জীবন নিজের ছেলে-মেয়ে বউ কাউকে দেখেনি, কেবল ওই ভাগ্নে কীসে মানুষ হয় সেই চেষ্টাই করেছে। কিন্তু সে-ভাগ্নেটাও যে একটা আস্ত অপোগণ্ড। নিজের বউটা পর্যন্ত তার অত্যাচারে বাপের বাড়ি চলে গেল। শেষে যখন শুনলে যে দাদামশাই-এর সম্পত্তিও বাপের হাতে এসেছে, তখন আর থাকতে পারলে না–একদিন রাত্তিরে বাপ ঘুমোচ্ছিল, তখন বাপকে খুন করে কিন্তু রায় মশাই দেখতে পেয়ে তাকে ধরে ফেললে–
–তারপর?
তারপরের ঘটনাও সবাই বলে গেল। এমন ভাবে বলে গেল যেন তারা সবাই ঘটনাটা নিজের চোখে দেখেছে। সে একেবারে নিখুঁত বর্ণনা সব। কেমন করে চৌধুরী মশাই-এর অপঘাতে মৃত্যু হলো, কেমন করে রায় মশাই পুলিসকে খবর দেবার জন্যে থানায় গেল, সব বৃত্তান্ত বলতে লাগলো তারা।
যারা আসল খুনী হয় তারা নাকি এমনি করেই গা-ঢাকা দেয়। বাপের সব টাকা ছিল ব্যাঙ্কে, সেই টাকাটা পর্যন্ত কালেক্টারিতে ঘুষ দিয়ে তুলে নিয়ে কলকাতায় পালিয়ে গিয়েছিল। এদিকে পুলিসও খুঁজছে তাকে, ওদিকে রায় মশাইও খুঁজছে। খুঁজতে খুঁজতে শেষকালে তাকে পাওয়া গেল কলকাতার এক ধর্মশালাতে।
প্রকাশ রায় সদানন্দকে সামনে পেয়েই একেবারে চেপে ধরলে।
বললে–তুই জামাইবাবুকে খুন করেছিস!
সদানন্দ বললে—হ্যাঁ—
প্রকাশ বললে–কেন খুন করতে গেলি? জামাইবাবু কী দোষ করেছিল?
সদানন্দ বললে–বেশ করেছি খুন করেছি, অমন বাপকে আগে খুন করলেই ভালো হতো–
প্রকাশ বললে–কিন্তু হাজার হোক, জামাইবাবু তো তোর নিজের বাপ। নিজের বাবাকে খুন করতে তোর হাত একটুও কাঁপলো না রে? তুই কি ভেবেছিস নরকেও তোর ঠাঁই হবে? তোর যে মহাপাতক হবে রে–
সদানন্দ বললে–আমি স্বর্গ নরক মানি না।
–স্বর্গ নরক না মানিস ভগবান তো মানিস?
সদানন্দ বললে–না, ভগবানও আমি মানি না। ভগবান বলে কেউ নেই, কিছু নেই। ও-সব তোমাদের বানানো কথা, আজগুবী–
–তা কেন তুই জামাইবাবুকে খুন করলি তাই বল?
সদানন্দ বললে–টাকার জন্যে–
–টাকাই তোর কাছে এত বড় হলো? এত টাকা তুই কী করবি?
সদানন্দ বললে–লোকে টাকা পেলে যা করে আমিও তাই-ই করব। আমি টাকা দিয়ে মদ খাবো, মেয়েমানুষ রাখবো, ফুর্তি করবো, ওড়াবো।
প্রকাশ বললে–তা আমি গাঁয়ের লোককে বলেছি ওই টাকা দিয়ে গাঁয়ের লোকের দুঃখ ঘোচাবো, তাদের অভাব মেটাবো–
সদানন্দ বললে–গাঁয়ের লোকেরা টাকার মর্ম কী বুঝবে, তারা তো ছোটলোক, তারা জীবনে কখনও এত টাকা দেখেছে যে তাদের টাকা দেবে তুমি?
তখন প্রকাশ মামা বললে–তা আমি না হয় মামা হয়ে তোকে রেহাই দিলুম, কিন্তু পুলিস? পুলিস তো তোর পেছনে লেগে আছে, তোর নামে হুলিয়াও বেরিয়েছে, তাদের হাত থেকে তুই পালাবি কী করে?
সদানন্দ বললে–পুলিসকে আমি চিনি। ঘুষ দিলেই তাদের মুখ বন্ধ হয়ে যাবে—
প্রকাশ বললে–কিন্তু আমি? আমার মুখ বন্ধ করবি কী করে?
সদানন্দ বললে–তুমি যদি টাকা চাও তো তোমাকেও টাকা দিতে পারি। তুমি কত টাকা নেবে বলো?
প্রকাশ বললে–তুই কি আমাকে এত নীচ মনে করিস? টাকা দিয়ে তুই আমার মুখ বন্ধ করতে চাস?
সদানন্দ বললে–টাকা দিয়ে কার মুখ বন্ধ করা না যায় শুনি? তুমি তো কোন্ ছার মামা–
কিন্তু প্রকাশ রায় তেমনি পাত্রই নয় যে টাকার বদলে মিথ্যে বলে চালাবে। তা যদি রায় মশাই চাইতো তবে জীবনে কোনও দিন তার টাকার অভাব থাকতো না। তার নিজের বউ-ছেলে-মেয়ের দিকে না তাকিয়ে যাকে সে প্রাণের চেয়ে ভালবালতো সেই ভাগ্নেই যখন তাকে টাকা দেখাতে লাগলেন তখন তার মনে বড় কষ্ট হলো মশাই। হায় রে টাকা! টাকা সংসারে এমনই জিনিস। নিজের বাপকে খুন করতেও যার বাধে না, সেই টাকার ওপরে রায় মশাই-এর তখন ঘেন্না হয়ে গেল। সে তখন ভাবলে অমন ভাগ্নের মুখ সে আর দেখবে না। বলে ধর্মশালা থেকে বেরিয়ে আসছে, পেছন পেছন সদানন্দও রাস্তায় বেরিয়ে এল।
রাস্তায় এসে বললে–কোথায় যাচ্ছো?
রায় মশাই বললে–কোথায় যাচ্ছি তা তোর শুনে দরকার কী?
সদানন্দ বললে–আমি জানি তুমি পুলিসে খবর দিতে যাচ্ছো!
রায় মশাই বললে–তোর ফাঁসি হলে তবে আমার শান্তি হয়। তুই টাকার জন্যে তোর বাপকে খুন করেছিস, এর পর তোর মুখদর্শন করাও পাপ–
সদানন্দ বললে–বুঝেছি, তুমি থানায় যাচ্ছ—
রায় মশাই বললে–তুই তোর বোঝা নিয়ে থাক, আমি তা নিয়ে তোর সঙ্গে তর্ক করতে চাই না–
বলে তাড়াতাড়ি সামনের দিকে এগিয়ে যেতেই সদানন্দ রায় মশাইকে এক ধাক্কা দিয়েছে। ধাক্কা খেয়ে রায় মশাই রাস্তার ওপরেই পড়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে উঠতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই একটা চলন্ত লরী এসে তাকে একেবারে চেপটে দিয়েছে। যখন লোকজন জড়ো হলো তখন রায় মশাই-এর শরীরে আর প্রাণের চিহ্নটুকু পর্যন্ত নেই। রক্তে একেবারে জায়গাটা ভেসে গিয়েছে–
সমস্ত কাহিনীটা শুনে সদানন্দ কেমন যেন স্তম্ভিত হয়ে গেল। এমন করেই কি সমস্ত ঘটনাটাকে বিকৃত করতে হয়! এই-ই কি পৃথিবী! পাশে হাজারি বিলিফ নিঃশব্দে সব কিছু শুনছিল। এতক্ষণে তার মুখে যেন হাসি ফুটে উঠলো। জীবনে অনেক আঘাত সহ্য করেছে সদানন্দ। সে আঘাত যতটা এসেছে বাইরে থেকে তার হাজারগুণ আঘাত এসেছে তার নিজের ভেতর থেকে। এই ভেতরের আঘাতেই এতদিন বাইরের সমস্ত কিছুর প্রভাব থেকে সে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছিল। নিজের চারিদিকে আচ্ছাদন দিয়েই ভেবেছিল সে আত্মরক্ষা করবার সহজ পথটা আবিষ্কার করেছে। কিন্তু সেই আচ্ছাদনের কোন্ অদৃশ্য ফুটো দিয়ে কবে যে সে একেবারে নিরাবরণ হয়ে গেছে তা সে টের পায়নি। তাহলে এই-ই কি তার আসল স্বরূপ! আজকের সুলতানপুরের মানুষের কাছে এই-ই কি তার সঠিক পরিচয়!
