কথাগুলো শুনে হাজারি বেলিফের চোখ দুটো গোল হয়ে গেল। বললে–আপনি মশাই দেখছি আসল শয়তান। আর মশাই, তা যদি বলেন তো সংসারে কে পাপী নয় বলুন? আমরা তো সবাই পাপী, সবাই আসামী! আপনি, আমি, আমাদের কোর্টের উকিল মুহুরি পেশকার, হাকিম, কে আসামী নয়?
সদানন্দ বুঝতে পারলে না। হাজারি আবার বলতে লাগলো–পৃথিবীর সবাই আসামী মশাই, সবাই আমরা আসামী। এই যে আমি, আমি তো কোর্টের বেলি, আমিই কি আমার ডিউটি করি? আমি তো ঘুষ নিই। তা আমার কথা না-হয় ছেড়েই দিন, আমাদের কোর্টের উকিল-মোক্তার মুহুরি-পেশকার এমন কি আমাদের কোর্টের হাকিম সাহেবরা, তারাও পর্যন্ত তাদের ডিউটি করে না! আর আপনার কথাই ধরুন না কেন, আপনিও তো একজনকে বিয়ে করেছিলেন, আপনিই কি কখনও স্বামীর ডিউটি করেছিলেন? সংসারে মশাই কেউই নিজের নিজের ডিউটি করে না। আজকাল বাবা বাবার টিউটি করে না, মা মা’র ডিউটি করে না, ছেলেও ছেলের ডিউটি করে না। ডিউটি করলে কি কেউ আসামী হয়! ডিউটি করি না বলেই তো আমরা সবাই আসামী–ডিউটি যদি সবাই করতে তো এ পৃথিবী তো তাহলে স্বর্গ হয়ে যেতো, আমাদের কোর্টের উকিল-মুহুরি-পেশকার-হাকিম, কাউকে তাহলে আর করে খেতে হতো না—
সদানন্দ বললে–না হাজারিবাবু, অন্য কেউ তার কর্তব্য করে কি না আমি জানি না, আমি তা জানতে চাইও না। কিন্তু আমি সারা জীবন আমার যা-যা কর্তব্য সব পালন করে এসেছি
–বলছেন কী? তাহলে আপনি কী বলতে চান আপনি দেবতা?
সদানন্দ বললেন, তা কেন বলবো, আমি মানুষ, মানুষ হয়ে জন্মে মানুষের যা কর্তব্য তা করেছি। আমি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছি, ন্যায়ের সমর্থন করেছি, যেখানে প্রতিবাদ করে ফল হয়নি সেখানে বিদ্রোহ করেছি, সারা জীবন তাই সকলে আমাকে পাগল বলেছে–
হাজারি বললে–তা হতে পারে। আপনি পাগলই বটে। আমি তো মশাই এই তিরিশ বছর কোর্টের পেয়াদাগিরি করছি, এমন আসামী আমি আমার জীবনে দেখিনি–
হঠাৎ সদানন্দ বললে–এখানে নামুন, এই ভাগলপুর এসে গেছে–
ট্রেন থামতেই সদানন্দ নামলো। হাজারি বেলিফও পেছন-পেছন নামলো। ভাগলপুর স্টেশনে নেমে সুলতানপুরে যেতে হবে। সেই সুলতানপুর। চৌধুরী মশাই শেষ জীবনটা এই সুলতানপুরেই কটিয়েছিলেন। এতদিন পরে আসা এ যেন আসা নয়, আবির্ভাব সদানন্দ চৌধুরীর পুনরাবির্ভাব!
সদানন্দ বললে–হাজারিবাবু, একটা কথা, এখানে কাউকে বলবেন না যে আমার নাম সদানন্দ চৌধুরী, বলবেন না, যে আমি হরনারায়ণ চৌধুরীর বংশধর–
হাজারি বললে–ঠিক আছে–
বহু দিন আগে প্রকাশ মামাই তাকে সঙ্গে করে শেষ এখানে নিয়ে এসেছিল। তখনই মানুষগুলোকে চিনতে পেরেছিল সদানন্দ। সুলতানপুরের সবাই-ই ছিল যেন এক-একজন প্রকাশ মামা। সবাই-ই যেন টাকা-টাকা করে অস্থির। কারো মেয়ের বিয়ে কারো ছাদের টিন, কারো খামারের বলদ। অভাব থাকলেও তাদের অভাব, অভাব না-থাকলেও তাদের অভাব। টাকার গন্ধ পেলেই তারা ছেঁকে ধরবে। যতদিন চৌধুরী মশাই বেঁচে ছিল ততদিন তাকে ছেঁকে ধরেছে। তারপর যখন চৌধুরী মশাই মারা গেল তখন ছেঁকে ধরেছে প্রকাশ মামাকে। ভেবেছে প্রকাশ মামাই তার পিসেমশাই-এর সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী। প্রতিদিন সকাল থেকে সবাই তার মোসায়েবি করেছে। কিন্তু যেদিন জানতে পারলে চৌধুরী মশাই-এর ছেলেই সমস্ত টাকার উত্তরাধিকারী, সেই থেকে সদানন্দকেই তারা ছেঁকে ধরেছে টাকার জন্যে।
সুলতানপুরে নতুন মুখ দেখে সবাই কৌতূহলী হয়ে উঠলো–কোথায় যাবেন আপনারা?
সদানন্দ বললে–এখানে প্রকাশ রায় বলে একজন ছিলেন, তিনি আছেন?
–প্রকাশ রায়? আজ্ঞে না, তিনি তো নেই।
–নেই মানে? তিনি এখানে থাকেন না আর?
লোকটা বললে–আগে থাকতেন, সে অনেক কাল আগে। প্রায় পনেরো বছর আগে। কিন্তু তিনি তো মারা গেছেন।
–মারা গেছেন? কী করে মারা গেছেন?
দেখতে দেখতে তখন চারদিক থেকে আরো অনেক বেকার লোক জুটে গেছে। তারাও কথা শুনছিল এতক্ষণ। তাদের মধ্যে একজন লোক হলে উঠলো–সে অনেক কাণ্ড মশাই, প্রকাশ রায়ের এক ভাগ্নে ছিল, সেই ভাগ্নেটাই যত নষ্টের গোড়া। এক নম্বরের শয়তান ছিল সে–
সদানন্দ জিজ্ঞেস করলে–তার ভাগ্নে? কী নাম তার?
লোকটা বললে–তার নাম সদানন্দ চোধুরী। একেবারে বখাটে ছেলে যাকে বলে। সে তার নিজের বাপকে পর্যন্ত খুন করেছে, তা প্রকাশ রায় তো দুরের কথা।
সদানন্দ বললে–সে কোথায় এখন?
সকলেই বললে–কোথায় আর থাকবে সে, খুন করে গা-ঢাকা দিয়েছে। সে তো আজ পনেরো বছর আগের কথা, পুলিস তাকে অনেক ধরতে চেষ্টা করেছিল মশাই, কিন্তু সেই যে গা-ঢাকা দিলে তারপর আর কেউ তার খোঁজ পায়নি–
–ছেলে হয়ে বাবাকে সে খুন করেছিল? এ কখনও সম্ভব?
বুড়োবুড়ো কয়েকজন লোক এসে দাঁড়িয়েছিল। তারা সবাই-ই নাকি প্রত্যক্ষদর্শী। সকলেই সমর্থন করলে কথাগুলো। বললে–টাকা মশাই টাকা! টাকা এমনই জিনিস মশাই; বাপের অনেক টাকা ছিল তো। বাপ না মরলে তো আর ছেলে সে টাকাগুলো হাতাতে পারে না। আট লাখ টাকার লোভ কি ছাড়া সোজা? কলিযুগ মশাই, ঘোর কলিযুগ! রায় মশাই সকলেই কথা দিয়েছিল যে, টাকাটা পেলে সুলতানপুরের সকলকে কিছু কিছু দেবে। কিন্তু ওই যে সদানন্দ, ও এসেই সব ভণ্ডুল করে দিলে।
কথাগুলো শুনতে শুনতে সদানন্দর মনে হলো সে যেন রূপকথা শুনছে। বললে–তাহলে প্রকাশ রায় ভালো লোক বলছেন?
