আর নয়নতারা? নয়নতারার সর্বনাশই বা সে কী এমন করেছে?
হাজারি বেলিফ একটা গাছতলায় বসে তখন নিজের দাড়ি কামিয়ে নিচ্ছে। বেশ ধারালো ক্ষুরটা তার। একটা ছোট আয়নার ওপর নিজের মুখটার প্রতিবিম্বের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে-চেয়ে আপন মনে দাড়ি কামিয়ে যাচ্ছে সে।
সদানন্দ জিজ্ঞেস করলে–আচ্ছা হাজারিবাবু? নয়নতারার আমি কী সর্বনাশ করেছি?
হাজারি বেলিফ বললে–তা আমি কী জানি মশাই, আমার সমন ধরিয়ে দেওয়ার কাজ, আমি আপনাকে সমন ধরিয়ে দিয়ে খালাস, আপনি নয়নতারার কী সর্বনাশ করেছেন তা আপনিই জানেন–পুলিস যখন চালান লিখেছে তখন কি আর না-জেনে-শুনে লিখেছে? নয়নতারা তো আপনার বউ-এর নাম–
সদানন্দ বললে–হ্যাঁ—
হাজারি ক্ষুর চালাতে চালাতে একটু থেমে নিয়ে বললে–তা আপনার বউ রইল সেখানে, আর আপনিই বা চৌবেড়েতে একা-একলা পরের অন্নদাস হয়ে রয়েছে কেন? বউ-এর সঙ্গে আপনার বনিবনাই বা হলো না কেন? কী করেছিল আপনার বউ?
সদানন্দ বললে–সে তো অনেক কথা। সব কথা কি আর এইটুকু সময়ে বলা যায়?
হাজারি বললে–তা আমাকে না বলুন জেরার সময় হাকিমের সামনে তো সবই বলতে হবে। বউকে আপনি ত্যাগ করলেন কেন এটা যদি হাকিম জিজ্ঞাসা করেন, এর জবাব কী দেবেন? তা বউ কি আপনার কালোকুচ্ছিৎ?
সদানন্দ বললে—না–
–তাহলে? নষ্ট?
–না, তাও নয়। খুব সুন্দর দেখতে। আর স্বভাব-চরিত্রও তার খুব ভালো।
–দেখতেও সুন্দর আর স্বভাব-চরিত্রও ভালো? তাহলে তাকে ছাড়লেন কেন মশাই? তাহলে তো আপনারই দোষ। তাহলে খেতে-পড়তে পাচ্ছে না বলে হয়ত আপনার বউ খোরপোষের জন্যে হাকিমের কাছে আর্জি পেশ করেছে-আপনি যখন অগ্নি সাক্ষী রেখে তাকে বিয়ে করেছেন তখন তাকে খাওয়ানো-পরানোর দায়িত্ব তো আপনারই।
সদানন্দ বললে–না, তা নয় আমার বউ আবার আর একজনকে বিয়ে করেছে–
–আবার বিয়ে করেছে? কেন?
সদানন্দ বললে–আমি তাকে নিয়ে ঘর করিনি বলে।
হাজারি অবাক হয়ে গেল। বললে–তাই বলুন, বিয়ে করলেন আর ঘর করলেন না, সে বউ তো আর একটা বিয়ে করবেই। তা তারপর?
বলে আবার একমনে দাড়ি কামাতে লাগলো। দাড়ি কামানো থামিয়ে জিজ্ঞেস করলে– তারপর কী হলো?
সদানন্দ বললে–তারপর তাদের খুব অভাব-অনটন চলতে লাগলো—
হাজারি বেলিফ জিজ্ঞেস করলে–কেন? তার বরটা কী করে?
সদানন্দ বললে–একটা ছোটখাটো চাকরি করে। বউও চাকরি করে একটা অফিসে–
–তা উপরি কিছু আছে সে-চাকরিতে? মানে ঘুষ-টুষ?
সদানন্দ বললে–তা জানি না।
হাজারি বললে–ঘুষ না থাক, ওভারটাইম?
–তাও জানি না। বোধ হয় নেই।
হাজারি বললে–ঘুষ কি ওভারটাইম একটা কিছু না থাকলে আজকাল ছোট চাকরিতে লোকে সংসার চালাবে কী করে!
সদানন্দ অবাক হয়ে গেল। বললে–কেন? দু’জনের চাকরিতেও সংসার চলবে না?
হাজারি বললে–আপনি আছেন কোথায় মশাই? চাল ডালের দর কত জানেন? থাকেন তো পরের বাড়িতে, জিনিস-পত্তোরের দামের হিসেব তো আর রাখতে হয় না আপনাকে।
বলে দাঁড়িয়ে উঠলো হাজারি। হাজারি বেলিফ কোর্টের পেয়াদাগিরি করে করে কেমন যেন ছটফটে স্বভাবের মানুষ হয়ে গেছে। কোথাও চুপ করে যেমন বসে থাকতেও জানে না, তেমনি আবার যেখানে সেখানে একফালি জায়গা পেলে ঘুমিয়ে পড়তেও পারে। ঘুম থেকে ধড়ফড় করে হঠাৎ উঠে বসে। বলে–কী মশাই, আপনি পালিয়ে যাননি তো? আমি একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলুম–
সদানন্দ বলে–পালিয়ে আর যাবো কোথায় হাজারিবাবু?
হাজারি বেলিফ বললে–পালাবার জায়গার কি অভাব আছে মশাই, আমার কত আসামী পালিয়ে গেছে—। তা আপনি পালিয়ে যাচ্ছেন না-ই বা কেন বলুন তো? আমাকে পাঁচটা টাকা দিলেই তো আপনি পালাতে পারেন, আমি হাকিমকে গিয়ে সোজা বলবো আপনাকে খুঁজে পাই নি। আজ পনেরো বছর তো এমনি করেই চালালুম, আরো না-হয় কয়েক বছর চালাবো। আর তার বদলে আমাকে শুধু মাঝে-মাঝে কিছু টাকা দিয়ে যাবেন, তাতে আমারও কিছু সুরাহা হবে।– ব্যাস–
সদানন্দ বললে–কিন্তু তাহলে তো পৃথিবীতে পাপীর শাস্তি হবে না–পৃথিবী যে পাপে একেবারে ভরে যাবে–
হাজারি বেলিফ বললে–পাপ-পুণ্যের কথা রেখে দিন, ও-সব ইস্কুলের কেতাবে লেখা থাকে। সব পাপী যদি ধরাই পড়বে তাহলে উকিল মুহুরি পেশকার কী খাবে শুনি? তাদেরও তো চলা চাই। আরে মশাই সেই জন্যেই তো আমাদের কোর্টে আশি হাজার মামলা এখনও ঝুলছে–
–আশি হাজার?
হাজারি বেলিফ বললে–হ্যাঁ, আসামীরা আমাদের কিছু কিছু করে দেয় তাই আমরাও সমন ঝুলিয়ে রাখি। এই রকম যত ঝুলবে তত উকিল-মুহুরি-পেশকারদের পকেট ভরবে। ফয়শালা হয়ে গেলেই তো আমাদের লোকসান। তাই তো বলছি আপনিও মশাই পালিয়ে যান–
সদানন্দ বললে–না হাজারিবাবু, আমি পালাবো না। আমি যদি দেখি যে সত্যিই পাপ করেছি তো হাকিম আমাকে যে শাস্তিই দিক আমি তা মাথা পেতে নেব–
হাজার অবাক হয়ে গেল। বললে–সে কী? আপনি দোষ স্বীকার করবেন? আপনি হলফ্-নামা করে বলবেন আপনি আপনার বাবাকে খুন করেছেন?
–হ্যাঁ, যদি সত্যিই খুন করে থাকি তো তা বলবো!
–আপনি বলবেন যে আপনি আপনার বউকে খেতে পরতে দেননি, তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন?
–তা সত্যি হলে তাও বলবো।
–আপনি বলবেন যে আপনার গাঁয়ের লোকদের ভিটে-মাটি চাঁটি করেছে?
সদানন্দ বললে–হ্যাঁ, তাও বলবো। যদি আমি সত্যিই দেখি যে পৃথিবীর একজন মানুষেরও আমি ক্ষতি করেছি তো আমি তার জন্যে ফাঁসি যেতেও তৈরি–
