–কী মশাই? আর কত দূর? কথা বলছে না যে?
সত্যিই তো, একদিন তো সকলকেই বিচারশালায় গিয়ে বিচারকের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। একদিন সকলকে সেই বিচারকের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলতে হয় মানবজন্ম পেয়ে আমি কী কী করেছি। কিন্তু সেখানকার জন্যেও তো সদানন্দর বক্তব্য আছে। সদানন্দ সেখানে গিয়ে বলবে–আমার সমস্ত অর্থ আমি সকলকে দান করে দিয়েছি, আমার নিজের কোনও লোভ নিজের কোনও কামনাকে আমি প্রশ্রয় দিইনি, আমি এমন কোনও কাজ করিনি যা প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে আমার লজ্জা হবে! আমি নিষ্পাপ, আমি নিষ্কলুষ!
হাজারি বেলিফ্ আবার বললে–আমি আর হাঁটতে পারছি না মশাই, আমি এই এখানে বসে পড়লুম–
জীবন-প্রদক্ষিণ কি অত সোজা! একদিন যে যাত্রা তার অনাদিকাল থেকে শুরু হয়েছিল, আবার শুরু থেকে সেই জীবন পরিক্রমা করা কি আজ অত সোজা নাকি! শুরু থেকে আবার সেই একই যন্ত্রণায় দগ্ধ হওয়া।
হাজারি বেলিফ সত্যিই সেখানে বসে পড়লো। নৌকো থেকে নেমে সেই যে দু’জনে হাঁটতে শুরু করেছিল সে-হাঁটা যেন তাদের আর শেষ হয় না। পথে অনেক গ্রাম পড়েছে, অনেক হাট, অনেক গঞ্জ অতিক্রম করে এসে তবে পড়বে বাসডিপো। সেখান থেকে বাসে উঠে তবে যেতে হবে কলকাতায়। তারপর ভাগলপুর। ভাগলপুর থেকে ফিরে আবার কলকাতায়। তারপর সেই কলকাতা থেকে ট্রেনে উঠে তবে যেতে হবে নবাবগঞ্জ।
সদানন্দ বললে–চলুন চলুন, দেরি হয়ে যাচ্ছে। প্রথম সুলতানপুরে যাবো–তারপর সেখান থেকে যাবো নবাবগঞ্জ–
হাজারি বেলিফ বললে–ও-সব জায়গা দেখে আর কী করবেন মশাই? মিছিমিছি কষ্টই সার হবে। পুলিস কি আর মিছে কথা বলতে গেছে আপনার নামে? মিছে কথা বলে তাদের লাভ কী?
–কিন্তু আপনি যে বলছেন আমি আমার বাবাকে খুন করেছি—
হাজারি বেলিফ বললে–হ্যাঁ, আপনি নিজেই নিজের বাপকে খুন করেছেন আর তবু বলছেন খুন করেছেন কিনা জানেন না? তাহলে তিনশো দুই ধারার চার্জ হলো কেন আপনার নামে? পুলিস কি মিথ্যে কথা বলছে?
হঠাৎ হাজারি বেলিফ বললে–তার চেয়ে মশাই একটা কাজ করুন না, আমাকে গোটা পাঁচেক টাকা দিয়ে দিন না–
–কেন? আপনাকে পাঁচ টাকা দিলে কী হবে?
–আমি কোর্টে গিয়ে রিপোর্ট দিয়ে দেব যে আসামীকে খুঁজে পেলুম না।
সদানন্দ বললে–কিন্তু আপনি তো আমাকে খুঁজে পেয়েছেন–
হাজারি বললে–খুঁজে পেলেও আমি গিয়ে বলবো খুঁজে পাইনি–এরকম তো আমরা হামেশাই করি মশাই। এরকম না করলে আমাদের পেট চলে? কী বলছেন আপনি? মাইনে তো পাই মাত্তোর তিরিশ টাকা, এই সব উপরি পেয়েই তো আমাদের সংসার চলছে। নইলে এই মাগ গি-গণ্ডার বাজারে মেয়ের বিয়ে, লোক-লৌকিকতা কী করে সব কিছু করছি? ঘুষ নিয়েই তো পেয়াদা-পেসকারদের সংসার চলে–। তা পাঁচটা টাকা পেলে আপনিও বাঁচেন, আমিও বাঁচি–
হাজারি যত না কাজ করে তার চেয়ে কথা বলে বেশি। আসামীর খোঁজে একবার গেছে নবাবগঞ্জে, সেখান থেকে গেছে সুলতানপুরে, তারপর গেছে নৈহাটিতে। নৈহাটি থেকে কলকাতার ধর্মশালাতে। যেখানে যেখানে সদানন্দ চৌধুরীকে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে, সেখানেই সে গেছে। কোর্টের পেয়াদা, এইটেই তার কাজ–এই আসামীদের সমন ধরিয়ে দেওয়া। তার সঙ্গে কিছুই থাকে না বলতে গেলে। থাকবার মধ্যে থাকে শুধু একটা পুঁটলি। পুঁটলির মধ্যে থাকে একখানা ধুতি আর একখানা গামছা। আর থাকে দাড়ি কামাবার সাজ-সরঞ্জাম। সাজ-সরঞ্জাম মানে একখানা ধারালো ক্ষুর আর ক্ষুর শান দেবার একটা পাথর। আর কিছু না। গাছতলা পেলে তো গাছতলা, আর নয় তো কোনও হাটের অটচালা। আর খাওয়া? কোর্টের পেয়াদাকে কে আর জামাই-আদর করে খাওয়াবে! কোর্টের পেয়াদা কি কারো কাছে সুখের খবর দেয়? কোর্টের পেয়াদা মানেই তো ঝামেলা!
সদানন্দও ভাবছিল যেতে যেতে। কী এমন সে করেছে! সংসারের সকলের সুখ, সকলের সমৃদ্ধি, সকলের শুভকামনাই তো সে চিরকাল করে এসেছে। সকলের শেষে যেদিন নৈহাটি থেকে চলে এসেছে সেদিন সে তো একেবারে যাকে বলে নিঃস্ব। নয়নতারাকে বিয়ে করে তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দেয়নি বলে তার ওপর যে অন্যায় সে করেছিল তার প্রায়শ্চিত্তও তো সে সেদিন করে এসেছে টাকা দিয়ে। শুধু একটা মাত্র কামনাই সে করেছিল সেদিন যে নয়নতারা যেন সুখে থাকে। সেইজন্যেই তো সে প্রথমেই লিখেছিল–এই অবিশ্বাসের যুগেও আমি বিশ্বাস করি পৃথিবীর কোথাও না কোথাও একজন বিশ্বাসী-প্রাণ মানুষ আছে। সে মানুষ এখনও সততা এবং সত্যবাদিতাকে বিশ্বাস করে। বিশ্বাস করে ধর্মকে, বিশ্বাস করে ভালবাসাকে, বিশ্বাস করে ঈশ্বরকে।
নয়নতারার বাড়ি থেকে চলে আসার সময় ট্রেনে বসে তার ইষ্টদেবতার উদ্দেশে সেই শ্লোকটা বারেবারে সে আবৃত্তি করেছিল?
সর্বেহত্র সুখীনঃ সন্তু।
সর্বে সন্তু নিরাময়াঃ ॥
সর্বে ভদ্ৰানি পশ্যন্তি
মা কশ্চিৎ দুঃখং আপ্লুয়াৎ ॥
অর্থাৎ সকলে সুখী হোক, সকলে ব্যাধিমুক্ত হোক, সকলে শান্তি পাক, সকলের দুঃখ দূর হোক। এই একটি কামনাই তো সারাজীবন সে করে এসেছে। এই কামনার জন্যেই তো সে নিজের পিতা-পিতামহের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, এই কামনার জন্যেই তো সে মা’র মনে কষ্ট দিয়েছে, এই কামনার জন্যেই তো সে সমরজিৎবাবুর মনে দুঃখ দিয়েছে। এই কামনার জন্যেই তো সে পৃথিবীর সমস্ত বিলাস-বৈভব থেকে দূরে থেকেছে। নইলে বাস্তব-জগতে কীসের অভাব ছিল তার! ইচ্ছে করলে সে তো ভোগের শিখরে বসে সমস্ত বিলাসের উপকরণের সাহায্যে ষোড়শ উপচারে নিজের বাহ্যিক ইন্দ্রিয়কে পরিতুষ্ট করতে পারতো। তা না করে সে নবাবগঞ্জকে সোনার দেশে রূপান্তরিত করে দিয়েছে। সেখানে বিরাট কলেজ হয়েছে। মানুষের জীবনের সব চেয়ে বড় যে আশীর্বাদ সেই জ্ঞানের আশীর্বাদ পাবার পথ সে দেখিয়ে দিয়েছে। আজ নবাবগঞ্জের ছেলেমেয়েদের আর জলকাদা মাড়িয়ে ছ’ক্রোশ দূরে পড়তে যেতে হয় না। নবাবগঞ্জ এখন স্বর্গে পরিণত হয়েছে। যে কাজ তার পিতা-পিতামহের করার কথা, সদানন্দই সেই কাজ সমাধা করে দিয়ে এসেছে। সেখানে হাসপাতাল হয়েছে, সেই হাসপাতালে আজ শুধু নবাবগঞ্জ কেন, আশেপাশের সব গ্রামের লোকের বিনামূল্যে চিকিৎসা হচ্ছে। নবাবগঞ্জের কোনও কপিল পায়রা পোড়াকে আর অভাবে-অনটনে গলায় দড়ি দিয়ে মরতে হবে না। মানিক ঘোষ আর ফটিক প্রামাণিকদেরও আর অর্থাভাবে পাগল হয়ে পথে ঘুরে বেড়াতে হবে না। এ সব কাজ তো সদানন্দই করেছে।
