টাকাগুলো পকেটে পুরতে পুরতে প্রকাশ বলে–জামাইবাবুকে এখন কোথায় খুঁজে পাই বলো দিকিনি–! আমারই বা অত সময় কোথায়? শেষকালে সব হিসেব দিলেই তো হলো–
বলে হন-হন করে যেমন হঠাৎ এসেছিল তেমনি হঠাৎই কোথায় উধাও হয়ে যায়। নাইবার খাবারও সময় নেই তার। নরনারায়ণ চৌধুরী এক-একবার জিজ্ঞেস করেন–কৈলাস, সব কাজকর্ম ওদিকে ঠিক চলছে তো?
কৈলাস গোমস্তা বলে–আজ্ঞে হা কর্তাবাবু, প্রকাশ মামা আছেন, তিনি সব করছেন–
নরনারায়ণ চৌধুরী চিনতে পারেন না। জিজ্ঞেস করেন–প্রকাশ মামা? সে আবার কে?
–আজ্ঞে আমাদের বৌমার ভাই।
–বৌমার ভাই মানে? নারায়ণের শালা?
–আজ্ঞে হ্যাঁ—
–তা বেয়াই মশাই-এর তো পুত্রসন্তান ছিল না। শালা কোত্থেকে এল?
–আজ্ঞে বৌমার মামাতো ভাই, আমাদের বেয়াই মশাই-এর কাছেই মানুষ, ছেলেবেলাতেই বাবা-মা মারা গিয়েছিল কিনা–
–ও–বলে তিনি চুপ করলেন। অনেকবার শুনেছেন তিনি কথাটা, তবু শেষের দিকে অনেক কিছুই তিনি ভুলে যেতেন।
যখন বিয়ে বাড়ি এমনি জম-জমাট, চৌধুরী বাড়িতে লোকজন গম গম করছে, তখন গ্রামের লোকের কানে গেল শাঁখ বাজার শব্দ। লোকজন সবাই ভিড় করে এল। গায়ে হলুদ এসেছে। গায়ে-হলুদ এসেছে। শাঁখ বাজাও, শাঁখ বাজাও! গায়ে-হলুদের দলের সঙ্গে এসেছে অনেক লোক। এসেছে সকাল আটটার আগেই। পুরুতমশাই পাঁজি দেখে সময় বলে দিয়েছেন। সেই সময়ের মধ্যে ছেলের গায়ে-হলুদ না হলে ওদিকে মেয়ের গায়ে-হলুদও হবে না। এদিকে টাইম দেওয়া হয়েছে সকাল আটটা, আর ওদিকে সেই হিসেব করে মেয়ের গায়ে-হলুদ হবে সকাল ন’টার সময়। হিন্দুর বিয়ে বলে কথা। এর নড়চড় হবার উপায় নেই। হলে অকল্যাণ হবে। অকল্যাণ হবে বর কনের। অকল্যাণ হবে চৌধুরী বংশের, অকল্যাণ হবে ব্যাকরণতীর্থ কালীকান্ত ভট্টাচার্যের বংশেরও।
কৃষ্ণনগর থেকে নবাবগঞ্জ। মাঝখানে রাণাঘাটে একবার ট্রেন বদল করতে হয়। সময়ও লাগে অনেক। তারপর আছে রেলবাজার থেকে এতখানি রাস্তা।
গায়ে-হলুদের দল যখন কেষ্টনগরে ফিরলো তখন বিকেল পুইয়ে গেছে। সামনের রাস্তার দিকে হা-পিত্যেশ করে চেয়ে ছিলেন ভট্টাচার্যি মশাই। বাড়ির ভেতরেও সকলের উদ্বেগ ছিল। কুটুমবাড়ি থেকে ঘুরে আসছে, ওদের মুখ থেকে অনেক খবর শোনা যাবে।
–কি গো বিপিন, গায়ে-হলুদ হলো? কী রকম খাতির করলেন বেয়াই মশাইরা?
বিপিনের মুখটা যেন কেমন গম্ভীর-গম্ভীর।
–কই, কথা বলছ না যে কিছু?
বিপিন বললে–আজ্ঞে পণ্ডিত মশাই, খাতির খুব ভালোই পেয়েছি, পেটভরে খেয়েছি। সবাই আমরা, কিন্তু…
কী বলতে গিয়ে যেন বিপিন থেমে গেল।
পণ্ডিত মশাই বুঝতে পারলেন না। বললেন–কিন্তু কী…
–আজ্ঞে গায়ে-হলুদ হয়নি।
–গায়ে-হলুদ হয়নি মানে? এদিকে নয়নতারার যে গায়ে-হলুদ হয়ে গেল সকাল ন’টার সময়। ওদিকে আটটার সময় ছেলের গায়ে-হলুদ হবার কথা, সেই হিসেব করে আমরাও যে মেয়ের গায়ে-হলুদ দিয়ে দিয়েছি। সেই রকম ব্যবস্থাই তো করা ছিল–
বিপিন মুখ কাচুমাচু করে বললে–আজ্ঞে, বরবাবাজীকে পাওয়া গেল না–
–পাওয়া গেল না মানে?
বিপিন বললে–আগের রাত্তির থেকেই বরবাবাজী কোথায় বেরিয়ে গেছে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না–
–শেষ পর্যন্ত? শেষ পর্যন্ত কী হলো আগে তাই বলো! শেষ পর্যন্ত বরকে পাওয়া গেল?
–আজ্ঞে না, পাওয়া গেল না। আমরা আর কতক্ষণ অপেক্ষা করবো, তাই আমরা চলে এলুম–
খবরটা কানে যেতেই ভট্টাচার্য-গৃহিণীও ছুটে বাইরে এলেন। বললেন–কী হলো গো? গায়ে-হলুদ হয়নি? এদিকে যে নয়নতারার গায়ে-হলুদ হয়ে গেছে। তাহলে কি বর আসবে না নাকি?
বলে বিপিনের দিকে চাইলেন তিনি।
ভেতরের একটা ঘরে নয়নতারা তখন চুপ করে বসেছিল। তার কানেও গেল কথাটা। কানে যেতেই সমস্ত শরীরটা অবশ হয়ে এল। বর আসবে না!
কিন্তু না, বোধ হয় পণ্ডিত কালীকান্ত ভট্টাচার্যের পূর্ব-পুরুষের বহু পুণ্যফল ছিল, তাই তার কন্যার বিয়েতে কোনও বিপর্যয় ঘটলো না। কিংবা বিপর্যয়টা সাময়িকভাবে না ঘটলেও হয়ত অদূর ভবিষ্যতের জন্যে মুলতুবী রইল। জীবনে দুর্যোগ যখন আসে তখন আপাতত তার আসার রকমটা দেখে অনেক সময় মনে হয় সেটা বুঝি হঠাৎই উদয় হলো। কিন্তু ঝড় আসবার অনেক আগে থাকে ঝড়ের সঙ্কেত। ঘরের চালে যখন আগুন লাগে, সে আগুনের উদ্ভব যে তার কত আগে কারো তামাক-খাওয়ার নেশার তাগিদে, আমরা তার খোঁজ রাখি না।
কালীকান্ত ভট্টাচার্য মশাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচলেন। একেবারে শেষ ট্রেনটাতে বর এসে পৌঁছুলো। বিপিন দৌড়ে এসে খবর দিয়ে গেল পণ্ডিত মশাইকে। পণ্ডিত মশাই আবার খবর দিলেন বাড়ির ভেতরে। বিয়ে বাড়িতে তখন চাপা কান্নার রোল উঠেছিল। সুখবর পেয়ে সেই বাড়িই আবার গমগম করে উঠলো। আবার হাসি ফুটে উঠলো সবার মুখে। কে যেন বলে উঠলো–ওরে শাঁখ বাজা, শাঁখ বাজা, উলু দে,–উলু দে–বর এসেছে–
হ্যাঁ, কালীকান্ত ভট্টাচার্যির বাড়িতে বর এসেছে, নয়নতারার বর এসেছে—
.
স্টেশনের প্ল্যাটফরমে প্রকাশ মামা তখন সদানন্দকে আগলে আগলে আসছে। ভাগ্নে আবার না পালায়! পাশে হরনারায়ণ চৌধুরী ছিলেন। তিনিই বরকর্তা। পেছনে পেছনে নাপিত।
প্রকাশ মামা বললে–আপনি কিছু ভাববেন না জামাইবাবু, আমি সদাকে আগলে আছি–
প্ল্যাটফরমে কিছু লোক বর দেখতে ভিড় করেছিল। প্রকাশ মামা তাদের দিকে চেয়ে তেড়ে গেল। বললে–আপনারা কী দেখছেন মশাই? আপনারা কি বর দেখেন নি কখনও? একটু রাস্তা দিন, রাস্তা দিন আমাদের–সরুন–
