হরি মুহুরি মাস্টারবাবুর কথা শুনে অবাক হয়ে যেত। সদানন্দ বলতো কথাটা হয়ত খুব খারাপ শোনাবে কিন্তু আমি ছোটবেলা থেকে কেবল ওই টাকার খেলাই দেখে এসেছি মুহুরি মশাই, দেখে দেখে আমার টাকার ওপর ঘেন্না হয়ে গেছে
–তা সে যেন হলো, কিন্তু ওরা কারা? ওই আর যাদের নাম করেন আপনি?
–আর কাদের নাম করি?
সদানন্দর আবার সব মনে পড়ে যেত। মুখ-চোখ কেমন গম্ভীর হয়ে যেত শোনবার সঙ্গে সঙ্গে। আবার ভুলে যাবার চেষ্টা করতো। কিন্তু তবু কি ভোলা যায়? চৌবেড়িয়ায় রসিক পাল মশাই তাকে যে কী চোখে দেখেছিলেন কে জানে! তিনি বুঝেছিলেন এ মানুষটি ঠিক সাধারণ কেউ নয়। তার অতিথিশালায় কত লোক আসত যেত, সেখানে সদানন্দকেও তিনি তাদের সঙ্গে পরম আদরে রেখে দিয়েছিলেন। কিন্তু আদর বোধ হয় সদানন্দের কপালে ছিল না। খাওয়া-পরার কোনও বিলাসিতাই স্পর্শ করতো না তাকে। স্কুল উঠে যাবার পরেও সদানন্দকেও ছাড়তে চাইলেন না তিনি। ছেলে ফকির পালকে বলে দিয়েছিলেন–মাস্টার যতদিন থাকতে চাইবে ততদিন ওকে তোমরা এখানে রেখে দেবে, বুঝলে!
সত্যিই তো, কোথায়ই বা সদানন্দ যাবে! যাবার কোনও জায়গাও তো তার ছিল না। ভোরবেলা নদীতে গিয়ে স্নান করে আসার পর অন্য সকলের সঙ্গে তারও জল-যোগের ব্যবস্থা থাকতো। কোনও দিন সদানন্দ খেত, কোনও দিন খেত না। পৃথিবীতে কখন কোথায় কী ঘটছে তা চৌবেড়িয়াতে বসে জানাও যেত না। শুধু পূর্ব দিকে সূর্য উঠতো আর পশ্চিম দিকে সূর্য ডুবতো। ঠিক এই সময়েই একদিন সদানন্দ হরি মুহুরি মশাইকে বলেছিল–আমাকে একটা খাতা আর দোয়াত-কলম দিতে পারেন মুহুরি মশাই?
–কেন? খাতা-দোয়াত-কলম কী করবেন?
সদানন্দ বলেছিল বসে তো আছি, তাই একটু আঁকিবুকি করতাম আর কি?
মাস্টারবাবুর নামে সেই খাতা আর দোয়াত-কলমের বন্দোবস্ত হয়ে গিয়েছিল। সদানন্দ সেই দিন থেকেই বসে বসে লিখতে আরম্ভ করেছিল। প্রথমেই আরম্ভ করেছিল এইভাবে—”আমি অতি সাধারণ মানুষ। এই সাধারণ মানুষের কথা আজকালকার ক্ষমতালোভী মানুষেরা শুনিবে কিনা জানি না। ক্ষমতা পাইবার লোভে যখন আজকাল যে কোনও অন্যায় আচরণ করিতে প্রস্তুত সেই সময় আমার মত সাধারণ মানুষের কাহিণী শুনিবার লোক নাই জানিয়াও আমি আমার এই জীবনী লিখিতে বসিয়াছি। এই অবিশ্বাসীর যুগেও আমি বিশ্বাস করি পৃথিবীর কোথাও না কোথাও একজন বিশ্বাসী প্রাণ মানুষ আছে। সে-মানুষ এখনও সততা এবং সত্যবাদিতাকে বিশ্বাস করে। বিশ্বাস করে ধর্মকে, বিশ্বাস করে ভালবাসাকে এবং বিশ্বাস করে ঈশ্বরকে। এই তিন শক্তিকে যে বিশ্বাস করে না তাহার জন্য এ কাহিনী নয়। তারা আমার এ কাহিনী না পড়িলেও আমি দুঃখ করিব না। ঈশ্বর যদি একজন যীশুখৃষ্টের জন্য হাজার হাজার বছর অপেক্ষা করিতে পারেন তাহা হইলে আমার মত নগণ্য লোক একজন সৎ পাঠকের জন্য লক্ষ লক্ষ বছর অনায়াসেই অপেক্ষা করিতে পারিবে।”
এমনি আরম্ভ করে অনেক দূর এগিয়েছিল। আর তারপরেই এসে হাজির হয়েছিল এই হাজারি বেলিফ। কী অদ্ভুত এই লোকটা। কোর্ট-কাছারির মানুষেরা বোধ হয় এমনিই হয়। প্রকাশ মামাও একদিন তার সঙ্গ ছাড়তে চায়নি। পেছনে লেগে ছিল আঠার মত। অথচ প্রকাশ মামা তো কোটের বেলিফ ছিল না এর মত।
সদানন্দ জিজ্ঞেস করলে–কত দিন এই চাকরি করছেন আপনি?
লোকটা বললে–তা কি মনে আছে মশাই, সেই ছোটবেলা থেকেই তো এ-লাইনে আছি। এতকাল কত লোকের সর্বনাশ করেছি তারই কি ঠিক আছে! কত হাজার হাজার লোকের ভিটে-মাটি চাঁটি করেছি, কত হাজার হাজার লোক সর্বস্বান্ত হয়েছে আমার জন্যে। হাজারি বেলিফকে দেখলে তাই তো সবাই শিউরে ওঠে–
সদানন্দ জিজ্ঞেস করলে–কেন?
–তা শিউরে উঠবে না? কাছারির বেলিফ তো কখনও কারো ভালো করে না মশাই। আমার বাপ-মা তো তাই জেনেশুনেই আমার নাম রেখেছিল-হাজারি! এই যেমন আপনি, আপনি তো বেশ চৌবেড়িয়ায় নিশ্চিন্তে খাচ্ছিলেন-দাচ্ছিলেন, হঠাৎ শনির মত হাজারি বেলিফ এসে আপনার কাছে হাজির হলো। হাজারি বেলিফ যাকে একবার ছুঁয়েছে তার আর কোনও কালে নিস্তার নেই–
সদানন্দ বললে–তাহলে আমারও নিস্তার নেই?
হাজারি বেলিফ বললে–নিস্তার থাকবে কী করে? ধর্মের কল বাতাসে নড়ে তা তো জানেন? আপনি লুকিয়ে অধর্ম করবেন আর ভাবছেন হাজারি বেলিফের হাত থেকে নিস্তার পাবেন? তাহলে জজ ব্যারেস্টার-উকিল-মুহুরি কোর্ট-কাছারি আছে কী করতে? তাদের পেট চলবে কী করে? তারা কি বসে বসে ঘাস কাটছে বলতে চান? এই যে আমাদের দেশের যত বড় বড় লোক দেখছে সবাই উকিল ব্যারিস্টার। মহাত্মা গান্ধী থেকে শুরু করে সি আর দাশ, সুভাষ বোস, সবাই উকিল। উকিল-মুহুরি না হলে দেশ চালানো যায়? দেশে যত লোক আছে তাদের সব্বাইকে একদিন না একদিন কোর্টে আসতেই হবে, তাদের হাত থেকে পালিয়ে আপনি যাবেন কোথায়?
তারপর কথা থামিয়ে হঠাৎ বললে–কী মশাই, আর কতদূর নিয়ে যাবেন আমাকে? আর তো পারছি না।
কিন্তু সদানন্দ সেকথার উত্তর দিলে না। হাজারি বেলিফের কথাগুলোই সে ভাবতে লাগলো। সকলকেই কি তাহলে একদিন কোর্টে যেতে হবে? কোর্টে গিয়ে নিজের পাপ পূণ্যের জবাবদিহি করতে হবে? এতদিন তো বেশ ছিল সে। নিজের মনের অন্তস্থলে নিজের কৃত কর্মের প্রশান্তির মধ্যে একটা আত্মতৃপ্তির সন্তোষ নিয়ে অজ্ঞাতবাস করছিল। সে ভাবত নবাবগঞ্জের মানুষ এই পনেরো বছরে গ্রামের স্কুল-কলেজে লেখাপড়া শিখে মানুষ হচ্ছে, তার তৈরী করে দেওয়া হাসপাতালে নবাবগঞ্জের মানুষরা অসুখে ওষুধ পাচ্ছে সেবা পাচ্ছে। নয়নতারার সংসারে শান্তি এসেছে, সাচ্ছল্য এসেছে, তারা সুখী হয়েছে। তার নিজের বলতে যথাসর্বস্ব যা ছিল সব কিছু দিয়ে সে সকলকে সুখী করতে পেরেছে এর চেয়ে মহৎ কাজ আর কী থাকতে পারে! তবু কিনা তাকে বিচারালয়ে যেতে হবে।
