তবু নিখিলেশ স্টেশনের প্ল্যাটফরম লক্ষ্য করে চলতে লাগলো। শেষ পর্যন্ত নিখিলেশ প্ল্যাটফরমে গিয়ে একবার খুঁজে দেখবে সদানন্দবাবু আছে কি না।
কিন্তু নিখিলেশ জানতো না যে, যে-মানুষ এমন করে নিজের সর্বস্ব পরকে দিয়ে নিঃস্ব হতে পারে তাকে ফিরিয়ে আনে এমন ক্ষমতা ভূ-ভারতে কারো নেই। এমন কি নিখিলেশ বা নয়নতারা কারো বিধাতা পুরুষেরই তখন এমন সাধ্য নেই যে তাকে আবার তাদের এই ভাঙা সংসারের মাথায় এনে প্রতিষ্ঠা দেয়।
কিন্তু ওদিকে রাণাঘাট লোক্যালের একটা কামরার এক কোণে বসে তখন সদানন্দ জানালার বাইরের দুর্ভেদ্য অন্ধকারের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে। চেয়ে আছে আর নিজের মনে এক অনির্দেশ্য আবাঙমনসোগোচর বিশ্ব-নিয়ন্তার কাছে একটা প্রার্থনাই শুধু করে চলেছে। সে বলছে–আমি জেনেছি তুমি আছো, এই বিশ্ব-সৃষ্টির অনাদি-অনন্ত স্বরূপ হয়ে তুমি আমাদের অন্তরেই বিরাজ করছে। তাই আজ তোমাকেই আমি জানিয়ে গেলাম আমার শেষ প্রার্থনা। তোমাকে জানিয়েই আমার ঊর্ধতন পিতৃপুরুষের সমস্ত পাপের প্রায়চিত্ত করে গেলাম। লোকে জানুক আমি পাগল, লোকে বলুক আমি নির্বোধ। তাতে আমার কোনও ক্ষতি নেই। আজ আমি সমস্ত লাভ-ক্ষতির বাইরে সমস্ত দেনা-পাওনার সীমান্ত অতিক্রম করে সুদূর নির্বাসনে আশ্রয় নিতে চলেছি। আজ আমার নিজের জন্যে আর কিছু কাম্য নেই। শুধু কামনা করি মানুষ সৎ হোক, মানুষ সুখী হোক, মানুষের মঙ্গল হোক, মানুষের শুভ হোক। আর আমি কিছু চাই না।
আর এদিকে নিখিলেশ তখন নৈহাটি স্টেশনের প্ল্যাটফরমের ওপরে একে-একে প্রত্যেকটা লোকের মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে শুধু একটা মুখকেই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনুসন্ধান করে চলেছে। কই, কোথায় গেল সেই মানুষটা! সেই মহানুভব মহৎ মানুষটাকে খুঁজে বার করা তার কাছে যেন তখন একান্ত অপরিহার্য।
আর নয়নতারাও সেই বোসপাড়ার বাড়িটার সদর-দরজার সামনে রাস্তার দিকে তাকিয়ে শবরীর প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।
কিন্তু যার জন্যে নিখিলেশ আর নয়নতারার এই উদগ্রীব প্রতীক্ষা সে-মানুষটা তখন আরো দূরে আরো অনেক দূরের পথে চলতে শুরু করেছে। তার মনে তখন আর কোনও ক্ষোভ নেই, আর কোনও খেদ নেই। এবার সে প্রায়শ্চিত্ত করেছে, এবার আর কারো কোনও দুঃখ থাকবে না, নবাবগঞ্জ থেকে নিরক্ষরতা দূর হবে, নবাবগঞ্জের লোক ব্যাধি থেকে মুক্তি পাবে, নয়নতারার সংসারের সমস্ত আর্থিক কষ্ট দূর হবে। সবাই সুখী হবে, সকলের মঙ্গল হবে, সকলের শুভ হবে…শুভায় ভবতু…
৪. অন্তরা
এই হলো সদানন্দ চৌধুরীর অতীত। এই অতীত-জীবন নিয়েই সেদিন নিজের কাহিনী লিখতে শুরু করেছিল সদানন্দ চৌধুরী। সদানন্দ জানতো তার এ জীবন অকিঞ্চিৎকর। জীবনে সে নিজের জন্যে কখনও কিছুই কামনা করেনি। শুধু কামনা করেছিল সকলে সৎ হোক, সকলের মঙ্গল হোক। সকলের সততা সুখ আর মঙ্গলের মধ্যে দিয়েই সে নিজের জীবনের চরিতার্থতা খুঁজে পেতে চেয়েছিল। কোথায় সেই সুলতানপুর, কোথায় সেই নৈহাটি আর কোথায় সেই কলকাতা, আর কোথায় এই চৌবেড়িয়া। এই চৌবেড়িয়ার গন্ডগ্রামে অজ্ঞাতবাসের মধ্যেই একদিন সে নিজেকে বিলীন করে দিয়েছিল। ভেবেছিল নিজেকে অস্বীকার করে, নিজেকে বিলুপ্ত করেই সে নিজের হাত থেকে পরিত্রাণ পাবে। ঊধ্বর্তন পূর্বপুরুষের সমস্ত পাপ-পূণ্যের দায় থেকে সে নিষ্কৃতি পাবে।
কিন্তু তবু মাঝে-মাঝে তার সব কিছু মনে পড়ে যেত। মনে পড়ে যেত সেই কর্তাবাবুকে, সেই দুর্গা পিসিকে। মনে পড়ে যেত প্রকাশ মামাকে। সেই বেহারি পাল, সেই কপিল পায়রাপোড়া, সেই মানিক ঘোষ, ফটিক প্রামাণিক আর কৈলাস গোমস্তা মশাইকে। অজ্ঞাতবাসে এলে তার মন কখনও পড়ে থাকতো ধর্মশালার সেই পাঁড়েজীর কাছে, আবার কখনও বউবাজারের সেই নিঃসঙ্গ বউটির কাছে। আর পড়ে থাকতে নিখিলেশ আর নয়নতারার কাছে। মনে হতো, সকলে ভালো থাকুক, সকলের মঙ্গল হোক। সকলের অভাব অনটন দূর হোক। নবাবগঞ্জের মানুষ এবার লেখাপড়া শিখে মানুষ লোক, ব্যাধি থেকে তাদের মুক্তি হোক, তাদের সব শোক-তাপ দূর হোক।
কতদিন হরি মুহুরি জিজ্ঞেস করেছে–আপনি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কাদের কথা বলেন মাস্টারবাবু? কাদের নাম করেন? তারা আপনার কে?
সদানন্দ অবাক হয়ে যেত। বলতো–কেন? কাদের নাম করি?
–নয়নতারার নাম করেন আপনি! তা নয়নতারা কে? আপনার মা নাকি?
সদানন্দ এ-কথার কিছু উত্তর দিত না। হরি মুহুরি বলতো–আবার ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে গানও করেন আপনি–
–গান?
–হ্যাঁ, আপনার গলায় বেশ সুর আছে। হরু ঠাকুরের কবির গান কোথা থেকে শিখলেন? এককালে কবির দলে ছিলেন নাকি?
সদানন্দ জিজ্ঞেস করতো–কী গান গাই?
হরি মুহুরি হাসতো। বলতো–ওই যে কী যেন গানটা?
বলে সমস্ত গানটাই মুখস্থ বলে যেত–
আগে যদি প্রাণসখি জানিতাম।
শ্যামের পিরিত গরল মিশ্রিত।
কারো মুখে যদি শুনিতাম…
সদানন্দ শুধরে দিত। বলতো ‘শ্যামের পিরিত’ নয় মুহুরি মশাই কথাটা হচ্ছে ‘টাকার পিরিত’। ‘টাকার পিরিত গরল মিশ্রিত কারো মুখে যদি শুনিতাম…’
–কেন? টাকার পিরিত কেন?
সদানন্দ বলতো–হ্যাঁ মুহুরি মশাই, আমি যদি ও-গান লিখতুম তো শ্যামের পিরিত না লিখে টাকার পিরিত লিখতুম। সংসারে সবাই টাকাকে যত ভালবাসে আর কিছুকে তত ভালাবাসে না। পৃথিবীর মানুষের কাছে শুধু ওই একটা জিনিসই সত্যি, আর সব কিছু মিথ্যে–
