নিখিলেশ ব্যাগটা হাত তুলে নিলে। এটা কার?
হঠাৎ মনে পড়ে গেল। সদানন্দবাবুর হাতে তো সে এটা দেখেছিল। সে-ই ফেলে গেছে নাকি? হয়ত ভুল করে ফেলে গেছে। অত কাণ্ডের মধ্যে এটা নিয়ে যেতে ভুলে গেছে।
ব্যাগের মুখটা সে খুলে দেখলে। তেমন কিছু নেই ভেতরে। নিখিলেশ ভেবেছিল হয়ত টাকাকড়ি আছে কিছু। কিন্তু ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিতেই কী একটা ভাঁজ করা কাগজ বেরোল। ভাঁজটা খুলতেই দেখলে একটা চিঠি। আর তার সঙ্গে একটা চেক্। ক্রসড চেক।
নিখিলেশের মাথা থেকে পা পর্যন্ত শরীরের সমস্ত শিরাগুলোর ভেতরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। এ কীসের চিঠি! কার চিঠি!
কিন্তু চিঠির ওপরেই নিখিলেশ আর নয়নতারার নাম দেখে আরো অবাক হয়ে গেল। বেশ স্পষ্ট অক্ষরে শিরোনামায় লেখা রয়েছে নিখিলেশ বন্দ্যোপাধ্যায় আর নয়নতারার নাম।
তার নিচের লাইনে লেখা রয়েছে—
“নিখিলেশবাবু, আজকে আমি যে কথা বলতে এসেছিলুম তা মুখে বলতে পারবো না বলে এই চিঠিতে লিখে এনেছি। একদিন আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন আমি নয়নতারাকে স্ত্রীর মর্যাদা কেন দিইনি। কেন দিইনি তা আমি আপনাদের মুখে জানিয়েছিলুম। কিন্তু যুক্তিটাই তো জীবনে বড় কথা নয়। যুক্তির ওপরে আর একটা কথা আছে যা যুক্তি তর্কের ঊর্ধ্বে। আমি আপনাদের সংসারের অভাব অনটনের কথা নিজের চোখে দেখে এসেছি। সে অভাব-অনটন আমি দূর করতে পারবো এমন অহঙ্কার আমার নেই। কিন্তু তবু সে অভাব দূর করবার আশায় আমার সামান্য প্রচেষ্টা এই সঙ্গে জুড়ে দিলাম। জানি আপনাদের চাহিদা মোটানো আমার সাধ্যাতীত, তবু এই সামান্য দান গ্রহণ করলে আমি কৃতার্থ হবো। আমাকে খুঁজে বার করে কৃতজ্ঞতা জানাবার চেষ্টা করবেন না, কারণ এখন থেকে আমি চেনা জানা সকলের দৃষ্টির আড়ালে চলে যাবো এই মনস্থ করেছি। আমার প্রীতি ও শুভেচ্ছা রইল। ইতি—”
চিঠিটা পড়ে শেষ করার পর চেকটার দিকে আবার দেখলে নিখিলেশ। চার লাখ টাকা।
নিখিলেশের মনে হলো সে হয়ত পড়ে যাবে। হাত-পা তার অবশ হয়ে আসছে। চিঠিটা নিয়ে সে বিছানার ওপরে গিয়ে বসলো। আবার পড়তে লাগলো চিঠিটা। আবার পড়তে লাগলো চেকের অঙ্কটা একবার শুধু একটু সন্দেহ হলো সে ভুল দেখছে না তো! সে জেগে আছে তো ঠিক! একে একে বারকয়েক সে চিঠি আর চেকটা পড়লো। তারপর মনে হলো সদানন্দবাবুর উপর সে সত্যিই অবিচার করেছে। যে-মানুষ এত ভালো এত উদার তার সঙ্গে সত্যিই সে খারাপ ব্যবহার করেছে।
তাড়াতাড়ি ঘর থেরে বেরিয়ে পাশের দরজা ঠেলতে লাগলো নিখিলেশ–নয়নতারা নয়নতারা–ওঠো—ওঠো–
ভেতর থেকে কোনও সাড়া না-পাওয়ায় নিখিলেশ আবার ডাকলে–নয়নতারা, নয়নতারা, দরজা খোল, এই দেখ সদানন্দবাবু কী চিঠি লিখে রেখে গেছেন–
আগে হলে হয়ত নয়নতারা দরজা খুলতো না। কিন্তু সদানন্দবাবুর চিঠির কথা শুনে নয়নতারা দরজার খিল খুলে দিলে। বললে–কী বলছো তুমি?
নিখিলেশ হাতের চিঠি আর তার সঙ্গে লাগানো চেকটা নয়নতারার দিকে বাড়িয়ে ধরলে। বললে–এই দেখ সদানন্দবাবু তোমার আর আমার নামে কী চিঠি লিখে রেখে গেছেন–
নয়নতারা চিঠিটা হাতে নিয়ে মনে মনে পড়তে লাগলো। চেকটাও দেখলে মন দিয়ে খানিকক্ষণ ধরে। পড়তে পড়তে যেন খানিকক্ষণের জন্যে তন্ময় হয়ে গিয়েছিল সে। তারপর নিখিলেশের দিকে মুখ তুলে চাইলে। চোখ দুটো তখন তার ছল্-ছল্ করছে।
নিখিলশে বললে–একটা ব্যাগের মধ্যে এইটে পড়ে ছিল। আমি প্রথমে দেখতে পাইনি, আলো নেবাতে গিয়ে দেখি টেবিলের ওপর এই ব্যাগটা পড়ে আছে। তার ভেতরে এইটে ছিল…
নয়নতারার মুখ দিয়ে কোনও কথা বেরোল না। নিখিলেশও যেন এই ঘটনায় একেবারে বিমুঢ় হয়ে গেছে। জীবনের সমস্ত হিসেব যেন হঠাৎ তাদের দুজনের কাছেই বেহিসেব হয়ে গেছে এক মুহূর্তে। যে-অঙ্ক দিয়ে সংসারী মানুষ সংসারের সব কিছুর মূল্যায়ন করে সেই গোড়ার অঙ্কতেই যেন তাদের গরমিল হয়ে গেছে হঠাৎ! একঘণ্টা আগে যে-বিপর্যযের চূড়োয় দাঁড়িয়ে তারা চরম সর্বনাশের জন্যে প্রস্তুত হয়ে প্রতীক্ষা করছিল, টাকার প্রলেপ লাগিয়ে সদানন্দ যেন তাদের সেই সমস্ত বিপর্যয় সমস্ত ক্ষত নিরাময় করে দিয়েছে।
নিখিলেশ বললে–অথচ দেখ, এখন ভাবতেও লজ্জা হচ্ছে, আমি সদানন্দবাবুর সঙ্গে কী অভদ্র ব্যবহারই না করেছি—
তারপর হঠাৎ তার কী মনে হলো। বললে–একটু দাঁড়াও, দৌড়ে গেলে হয়ত এখনও স্টেশনে তাঁকে ধরতে পারা যাবে–
নয়নতারা বললে–তুমি এখন স্টেশনে যাবে নাকি?
নিখিলেশ ততক্ষণে জামাটা গায়ে গলিয়ে নিয়েছ। তাড়াতাড়ি বাইরে যেতে-যেতে বললে–সত্যি বলছি আমি ভাবতে পারিনি, মানুষ এত ভালো হতে পারে। দেখি যদি তাঁকে ধরে আনতে পারি–
নয়নতারা পেছন থেকে একবার শুধু বললে–আমি যাবো তোমার সঙ্গে?
নিখিলেশ বললেন, তুমি আর কেন মিছিমিছি এত রাত্তিরে কষ্ট করবে—
নয়নতারা বললে–তাহলে তুমি গিয়ে তাকে বোল আমি তাকে আসতে বলেছি, বোল সে না এলে আমি রাগ করবো।
নিখিলেশের আর তখন কোনও দিকে জ্ঞান নেই। রাস্তাটা ধরে সোজা স্টেশনের দিকে জোরে জোরে চলতে লাগলো। কিন্তু তাকে বেশি দূর আর যেতে হলো না। রাণাঘাট লোক্যালটা তখন হু-হু করে স্টেশনে এসে পৌঁছুলো আর আধ মিনিট থেমেই প্ল্যাটফরমের সমস্ত প্যাসেঞ্জারকে তুলে নিয়ে আবার কলকাতার দিকে রওনা দিলে।
