–তবে রে মাতাল—
বলে সবাই মিলে–প্রকাশ মামাকে ধরে নামিয়ে দিলে। প্রকাশ মামার যেন তখন একটু চৈতন্য হয়েছে। চারদিকে এত ভিড় দেখে অবাক হয়ে গেল। বললে–কে? কে তোমরা?
একজন তার মাথায় চাঁটি মারলে।
–আরে মারছো কেন?
আরো একজন সুবিধে পেয়ে পেছন থেকে জামা ধরে টানতে লাগলো। সামনে পেছনে যে-যেখান থেকে পারছে ঠেলে দিচ্ছে। প্রকাশ মামা এদিকে চায় তো ওদিক থেকে ঠেলে। ওদিকে চায় তো এদিক থেকে ঠেলে।
না, নেশাটা জমতে দিলে না শালারা। প্রকাশ মামা অন্য দিকে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করলে। কিন্তু সব দিকেই লোক গিজ গিজ করছে।
শেষকালে একটা ফাঁক দেখে মরীয়া হয়ে পালিয়ে বাঁচবার চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু সবাই পেছন-পেছন তাড়া করে গেল। তখন প্রকাশ মামা প্রাণপণে দৌড়তে লাগলো–
পেছনে সবাই চেঁচিয়ে উঠলো-চোর—চোর—
‘চোর-চোর’ শুনে আরো কিছু লোক এসে জুটলো। বড়বাজারে ভিড় জমাবার লোকের অভাব নেই। সেখানে সবাই কাজের লোক, আবার সবাই বেকার।
দৌড়তে দৌড়তে একটা বড় রাস্তার ওপর পড়তেই হঠাৎ ‘হাঁ-হা-হাঁ’ চিৎকার উঠলো। আর সঙ্গে সঙ্গে একটা মাল-বোঝাই লরীর ব্রেক কষার কর্কশ শব্দ!
-কী হলো মশাই, কী হলো?
আশেপাশে যারা কর্মব্যস্ত মানুষ ঘোরাঘুরি করছিল তাদের সকলের মুখ ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। সবাই আঁতকে উঠেছে এই অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনায়। কোথাও কিছু নেই হঠাৎ গলির ভেতর থেকে লোকটা অমন দৌড়ে বেরোলই বা কেন? বড় রাস্তায় বেরোবার সময় চারদিকে দেখেশুনে বেরোতে হয় তো!
যারা পেছন থেকে এতক্ষণ তাড়া করছিল তারা আর এগোল না। এখনি আবার পুলিস পাহারাওয়ালা আসবে। তখন সাক্ষী হতে বলবে, চাক্ষুষ সাক্ষদের জবানবন্দি নেবে। অত ঝঞ্ঝাটে যেতে আছে! তার চেয়ে সসম্মানে কেটে পড়াই ভালো।
–নিয়তি মশাই নিয়তি! একেই বলে নিয়তি!
প্রকাশ মামা তখন লরীর তলায় পড়ে কার কাছে নিঃশব্দে তার আর্জি জানাচ্ছে কে জানে? মা কালী না মা-মঙ্গলচণ্ডী কার কাছে হুইস্কি খাবার প্রার্থনা জানিয়ে তার শেষ সাধ নিবেদন করছে তাই বা কে জানে! ইহকাল পরকাল কোনও কাল বলে যদি কোথাও কিছু থাকে তো প্রকাশ মামার সাধ কি তারা কেউ মেটাতে পারবে? কেউ কি কোনও দিন প্রকাশ মামাদের খাই মেটাতে পেরেছে! প্রকাশ মামার দিদি তা মেটাতে পারেনি, প্রকাশ মামার জামাইবাবুও তা মেটাতে পারেনি, তারপর তার ভাগ্নেও তা মেটাতে পারলে না।
জায়গাটা তখন টাটকা রক্তে একেবারে লাল হয়ে গেছে। সমস্ত লোকের পায়ের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে ফ্যাকাশে পিচের রাস্তার ওপর যেন রক্তগঙ্গা বয়ে যাচ্ছে।
.
নৈহাটির বাড়ির মধ্যে তখন আর এক দৃশ্য। আসলে এ দৃশ্য নয়, দৃশান্তর। একটু আগেই যে বাড়িতে ঝড় বয়ে গেছে তার সামান্যতম চিহ্নও তখন আর কোথাও নেই। সমস্ত বাড়িটা তখন স্তব্ধ। নয়নতারা খেয়েছে কি খায় নি সে-খবর রাখবার দরকার নেই যেন নিখিলেশের। নয়নতারার চোখ-মুখের চেহারা দেখে তার সঙ্গে কথা বলতেও তার ভয় হয়েছে। এত বড় দুর্যোগ যে নিখিলেশ শেষ পর্যন্ত সামলাতে পেরেছে এইটেই যথেষ্ট।
এই সব কাণ্ড দেখে গিরিবালাও যেন কেমন নির্বাক হয়ে গিয়েছিল। নিখিলেশ তখনও নিজের খাটের ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে ছিল। কোথাও কোনও দিকে আর কোনও আশার চিহ্ন নেই। কেউ আর তার নেই। সে এই বিরাট পৃথিবীতে একা। একলাই তাকে তার এই শরীরটার মত এই সংসারটাকে বয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে, প্রতিদিন তাকে অফিসে যেতে হবে, প্রতি মাসে তাকে তার মাসকাবারি গোনাগুন্তি মাইনের টাকাটা নিয়ে আসতে হবে। কেউ আর তাকে সাহায্য করবে না। নয়নতারা চাকরি করবে না আর। নয়নতারা তার মাইনের টাকা বাড়িতে এনে তার সংসারে সাচ্ছল্য বাড়াতে আর সাহায্য করবে না।
তাহলে? তাহলে কী করবে সে? যা করে সে এতদিন চালাচ্ছে তেমনি করেই শেষ দিন পর্যন্ত চলবে? তারপর একদিন যখন রিটায়ার করবে, তখন শুরু হবে তার পেনশন। এখন যে-অবস্থা তার চলছে, সে-অবস্থা তখন আরো খারাপ হবে। তখন কী করে শেষ জীবনটা চলবে তার?
এ-কথা বহুদিন ধরেই ভাবছিল নিখিলেশ। কিন্তু আজকের ঘটনার পর ভাবনাটা যেন আরো জটিল হয়ে উঠলো। সত্যিই যদি শেষ পর্যন্ত নয়নতারা সদানন্দবাবুর সঙ্গে চলে যেত তাহলে কী হতো? আর তা ছাড়া আজ না-হয় নিখিলেশ নয়নতারাকে কোনও রকমে বাড়িতে আটকে রাখতে পেরেছে, কিন্তু কাল? কাল যখন নিখিলেশ অফিসে চলে যাবে, তখন যদি আবার সদানন্দবাবু আসে? আর নয়নতারা যদি তার সঙ্গে চলে যায়, তখন কে তাকে আটকাবে? কে তাকে ধরে রাখবে? চিরকাল তো কেউ অফিস কামাই করে বউকে পাহারা দিতে পারে না! আর, আর একটা উপায় আছে অবশ্য। নয়নতারার ঘরের বাইরে থেকে তার দরজায় তালা লাগিয়ে দিতে পারে। কিন্তু তা-ই কী সম্ভব? নয়নতারাই কী সেই রকম মেয়ে যে সেটা মাথা পেতে সহ্য করবে?
নিখিলেশের মনে হলো আজ রাতে আর তার ঘুম আসবে না।
কিন্তু হঠাৎ খেয়াল হলো ঘরের আলোটা তখনও জ্বলছে। উত্তেজনায় উদ্বেগে সে আলোটা নিবোতেও ভুলে গিয়েছিল। বিছানা থেকে উঠলো নিখিলেশ। আলোর সুইচটা বন্ধ করে দিয়েই সে বিছানায় এসে লুটিয়ে পড়বে, ঘুমোবার জন্যে একবার শেষ চেষ্টা করে দেখবে সে।
কিন্তু টেবিলের ওপর নজর পড়তেই দেখলে কার যেন একটা ব্যাগ পড়ে রয়েছে সেখানে। লম্বা-চওড়া একটা প্ল্যাস্টিকের ব্যাগ।
