–তার মানে? আমি মাতাল? আমি মদ খেয়েছি?
লোকটা বললে–তা মাতাল নয় তো শুঁড়িখানার খবর জানতে চাইছো কী করতে শুনি? ঠাকুর-পুজো করতে?
প্রকাশ মামা শাসিয়ে উঠলো–খবরদার বলছি, মাতাল বোল না আমাকে–
–মাতাল বলেছি বেশ করেছি মাতালকে মাতাল বলবো না তো কী বলবো? শ্বশুর বলবো? সেটা ভালো হবে?
সঙ্গে সঙ্গে ক্ষেপে গেছে প্রকাশ মামা। একেবারে লোকটার ঘাড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল। কিন্তু আশেপাশের কয়েকজন লোক হাঁ হাঁ করে একেবারে ছুটে এল, এসেই প্রকাশ মামার হাতটা ধরে ফেলেছে। কী হলো মশাই, কী হলো? মুখ থাকতে হাতাহাতি কেন?
প্রকাশ মামা একটু জোর পেলে। বললে–দেখুন না মশাই, আমাকে শুধু-মুধু মাতাল বললে–
–কেন, উনি মাতাল বলতে গেলেন কেন? আপনি কি মদ খেয়েছেন?
প্রকাশ মামা বললে–রামঃ, আমি মদ খেতে যাবো কোন্ দুঃখে মশাই? এই তো আমি হাঁ করছি আপনাদের সামনে আপনারা শুঁকুন গন্ধ শুঁকুন–
বলে সকলের সামনে হাঁ করে বললে–কী? মদের মন্ধ পেলেন আমার মুখে? পেলেন গন্ধ?
কেউ ‘হাঁ’ কিছুই বললে–না। প্রকাশ মামা আবার বললে–দোষের মধ্যে আমি শুধু ওকে জিজ্ঞেস করেছি এখানে শুঁড়িখানাটা কোন্ দিকে। তা সেটা জিজ্ঞেস করাই আমার দোষ হয়ে গেল?
একজন বললে–তা আপনি শুঁড়িখানার খোঁজ নিতেই বা গেলেন কেন? আপনি কি মদ খান?
প্রকাশ মামা বললে–আপনারাও তো দেখছি তেমনি লোক মশাই, শুঁড়িখানার কথা জিজ্ঞেস করলেই ওমনি মদ খাওয়া হয়ে গেল? আমার আত্মীয়দের মদের দোকান থাকতে পারে না? আমরা তো মশাই জাতে শুঁড়ি, জাত-ব্যবসা করবো তাতেও দোষ? আমাদের সাত পুরুষের মদের কারবার। এই মদের কারবার করেই আমার ঠাকুর্দা সে-যুগে রায় বাহাদুর হয়েছিল তা জানেন? আমার কাকা মদের কারবার থেকে দু’লাখ টাকা দিয়েছিল দেশবন্ধু সি আর দাশের হাতে, সেই টাকায় এখন দেশ স্বাধীন হয়েছে। মদের টাকা দেশসেবার কাজে লাগাতে দোষ নেই আর মদ খেলেই দোষ?
অকাট্য যুক্তি সব। লোকগুলোর মুখ বন্ধ হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। প্রকাশ মামা আর দাঁড়ালো না সেখানে। সকলের মুখে জুতো মেরে অন্য দিকে চলে গেল। দেশ স্বাধীন হয়েছে না কলা হয়েছে। নিজের পয়সায় মদ কিনে খাবো তারও স্বাধীনতা নেই তখন দেশ স্বাধীন হয়ে লাভটা কী হলো?
কিন্তু বড়বাজারে চেষ্টা করলে কী না পাওয়া যায়! খুঁজতে খুঁজতে শেষকালে সেই দোকানটা পাওয়া গেল। ঝাঁ ঝাঁ করছে রোদ। কিন্তু সেই কড়া রোদের মধ্যেও দোকানে খদ্দেরের কমতি নেই। ভিড় ঠেলে একেবারে সামনের দিকে টাকাটা হাত বাড়িয়ে ধরে বললে–দেখি একটা দু’নম্বর পাঁট-
বোতলটা নিয়ে পাশের একটা কাঠের বেঞ্চির ওপর আয়েস করে বসলো প্রকাশ মামা। তারপর কোঁচার খুঁট দিয়ে মালটা ছেঁকে গেলাসে ঢালতে লাগলো। তারপর কাঁচা পেঁয়াজকুচো আর ভিজেছোলা চিবোতে চিবোতে গেলাসটায় আলতো করে চুমুক দিলে। আঃ, প্রকাশ মামার মনে হলো–যেন সমস্ত শরীরটা জুড়িয়ে গেল। হোক দিশী মাল, কিন্তু মালটা খাঁটি–
একটা পাঁটে ঠিক যেন শানালো না। আর তা ছাড়া এত ঝামেলা, এত ঝঞ্ঝাটের পর কি এক পাঁটে শানায়? জিভটা ভিজোতেই সবটা শেষ হয়ে গেল। এবার একটা ছোট বোতল নিয়ে নিলে। তখন একটু গরম হলে শরীরটা। পকেটে তখন আরো কয়েকটা টাকা রয়েছে। প্রকাশ মামা আবার হাত বাড়িয়ে দিলে–আর একটা ছোট দেখি দাদা–
আবার কাঁচা পেঁয়াজকুচো আর ভিজেছোলা খেতে খেতে বেশ মৌজ হলো যখন তখন বেঞ্চি ছেড়ে উঠলো।
সকলকে বললে–সরো সরো–হাটো ভাই, হাটো–
মাতাল দেখে সব মাতালই রাস্তা করে দিলে। মাতালরাই মাতালদের চেনে। প্রকাশ মামার মেজাজ তখন তর হয়ে এসেছে। তখন আর খারাপ লাগছে না কিছুই, খারাপ লাগছে না কাউকেই। সবাই ভালো, সবাই গুড! মাথার ওপর কড়া সূর্যটাকেও যেন তখন চাঁদ বলে মনে হলো। বেশ স্নিগ্ধ, বেশ নীল।
–এই রিকশাওয়ালা! রিকশাওয়ালা!
রিকশাওয়ালাটা দৌড়ে কাছে এল রিকশাটা নিয়ে।
বললে–কাঁহা যায়গা বাবুজী?
প্রকাশ মামা বললে–না বাবা, কোথাও যাবো না। শুধু বসবো তোমার রিকশার ওপর তুমি রিকশাটা রাখো।
রিকশাটা সামনে নামিয়ে রাখতেই প্রকাশ মামা তার ওপর উঠে বসলো। রিকশাওয়ালা রিশাটা টানতে যাচ্ছিল। কিন্তু প্রকাশ মামা বাধা দিল। বললে–আরে, টানতা হ্যায় কেঁও। টেনো না, এমনি দাঁড়িয়ে থাকো–
রিকশাওয়ালা জীবনে এমন খদ্দের কখনও দেখেনি। সে রিকশা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে আর সওয়ারি রিকশার ওপর চুপ করে বসে থাকবে, এ কখনও সম্ভব?
কয়েকজন লোক জড়ো হয়ে গেল কাণ্ড দেখে। বড়বাজারে কারণে-অকারণেই লোক জড়ো হয়।
সবাই জিজ্ঞেস করলে–ও মশাই, আপনি যাবেন কোথায়?
প্রকাশমামা বললে–কোথাও যাবো না–
–কোথাও যাবেন না তো এমনি করে রিকশার ওপর বসে থাকবেন?
–হ্যাঁ, আমি এখানে বসে থাকবো, বসে বসে ঘুমোব। তাতে তোমাদের কী?
একজন ততক্ষণে গন্ধ পেয়ে গেছে। বলে উঠলো–ওরে মাতাল রে, লোকটা মাতাল–
–কী বললে? আমি মাতাল?
–তা আপনি ওখানে বসে থাকবেন কেন? হয় আপনি কোথাও যান, না-হয় রিকশা থেকে নেমে পড়ুন। আর ঘুমোতে হয় তো বাড়িতে গিয়ে ঘুমোন–
প্রকাশ মামা বললে–না, আমার ইচ্ছে আমি এই চাঁদের আলোর তলায় ঘুমোব–
তখন লোকগুলো ক্ষেপে উঠলো। সবাই হাত ধরে টানলে–এই শালা নাম–নাম শালা–
–না আমি নামবো না।
