–দেখ পাঁড়েজী, তুমি বিচক্ষণ লোক তাই ওই কথা বললে। পৃথিবীর সব বিচক্ষণ লোকই ওই কথা বলবে। আমিও তাই তোমার বাবুজীকে বললুম যে কেন ওদের দিচ্ছিস? ওরা ছোটলোক, ওরা টাকার মর্ম কী বুঝবে? কিন্তু সদা তবু শুনলে না, বললে–ওদের টাকা আমি ওদেরই দিচ্ছি। শোন একবার ভাগ্নের কথা! বাপের টাকা তুই আইনত পেয়েছিস, ও-টাকা তোর হকের টাকা। কিন্তু ওদের ও টাকা কী কাজে লাগবে? ওরা হুইস্কি খেতেও জানে না, মেয়েমানুষও পুষবে না, ওরা টাকা-গুলো নিয়ে নয়-ছয় করে ফেলবে। তা আমার কথা তো শুনলে না, চার লাখ টাকা ওদের দিয়ে দিলে বললে–গাঁয়ের লোকের জন্যে হাসপাতাল হবে, ইস্কুল হবে, কলেজ হবে–
–চার লাখ রুপিয়া?
প্রকাশ মামা বললে–তবে আর বলছি কী! অথচ দেখ আমি ছাপোষা মানুষ, মাগ-ছেলে মেয়ে আছে আমার, তার ওপর বুঝলে আমার আবার নেশাভাঙ করার সামান্য বদ অভ্যেস আছে, আমাকেও তো তার থেকে কিছু দিবি তুই! আমি তোর গরীব মামা, আমার কথা তুই একেবারে ভুলে গেলি রে? এত বড় নেমকহারাম তুই? বলো পাঁড়েজী, তুমি নিজেই বলো, এটা নেমকহারামী হলো না? তুমি তো বিচক্ষণ লোক, তুমিই বলো–
পাঁড়েজী কী বলবে বুঝতে পারলে না।
প্রকাশ মামা বলল–আমার কী ভয় হচ্ছে জানো পাঁড়েজী, ভয় হচ্ছে, বাকী যে চার লাখ টাকা সঙ্গে রয়েছে সেটা আবার কাউকে না দিয়ে দেয়–
পাঁড়েজী বললে–বাবুজী তা দিতে পারে, বাবুজীর কাছে টাকা থাকলে যাকে সামনে পাবে তাকেই দিয়ে দেবে।
প্রকাশ মামা আরো ভয় পেয়ে গেল। বললে–তাই নাকি? তবে তো সব্বোনাশ–
–হ্যাঁ বাবুজী, আমি একবার একটা গায়ে দেবার শাল কিনে দিয়েছিলুম, সেটা বাবুজী একটা বুড়িকে দিয়ে দিলে–
–কে বুড়িটা?
–সে বাবুজী একটা বস্তির বুড়ি, খাটালে থাকে, ঘুঁটে বিক্রি করে বেড়ায়—
প্রকাশ মামা বললে–ইস, তাহলে তো সব্বোনাশ পাঁড়েজী। এখনও যে হাতে চার লাখ টাকা রয়েছে–
–নগদ চার লাখ টাকা?
প্রকাশ মামা বললে–না, ব্যাঙ্কে টাকা আছে, কিন্তু চেক্ কেটে দিলেই হলো, চেক বই তো তার সঙ্গেই রয়েছে।
আর ভাবতে পারলে না প্রকাশ মামা। যতই ভাবছিল ততই তার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছিল। এতদিন ধরে ভাগ্নেটাকে শিখিয়ে পড়িয়ে শেষকালে কিনা একটা অপোগণ্ড হয়ে গেল সদা। ছোটবেলা থেকে কত মেয়ে-মানুষের বাড়িতে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছে, ভেবেছিল একদিন না একদিন সে মানুষ হবে!
বেরোবার সময় বললে–আমি আসছি পাঁড়েজী, আমি এসে ভাত খাবো
–তা এখন আবার কোথায় বেরোচ্ছেন?
প্রকাশ মামা বললে–-বেশি দেরি হবে না, আমি যাবো আর আসবো। একটা জরুরী কাজে বেরোচ্ছি, আমি যাবো আর আসবো–এসে ভাত খাবো–
–যদি বাবুজী তার মধ্যে এসে পড়ে তো আমি কী বলবো?
–বলবে আপনার মামা এসেছে। এসে আপনার জন্যে বসে আছে। আমি না-আসা পর্যন্ত যেন তাকে ছেড়ো না বুঝলে? আমি যাবো আর আসবো—
বলে দু’পায়ে জুতোজোড়া গলিয়ে হনহন করে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো। বড়বাজারের ঘিঞ্জি রাস্তা। তার ওপর গিজগিজ করছে লোক। চলতে গেলে লোকের গায়ে ধাক্কা লেগে যায়। যেন দুনিয়ার সব লোক এখানে এসে হাজির হয়েছে। রাস্তার এক কোণে দাঁড়িয়ে ভেতরের পকেট থেকে মানিব্যাগটা বার করে একবার দেখলে। গোটা কয়েক টাকা রয়েছে তখনও। ওতেই এখানকার মত কাজ চলে যাবে তার। তারপর সদা এলে টাকা চেয়ে নিলেই চলবে।
–ও দাদা, শুনুন!
একটা বখাটে গোছের লোককে দেখে প্রকাশ মামা তাকেই ডাকলে। দেখে বোঝা যায় লোকটা মাল-টাল খায়।
থতমত খেয়ে লোকটা দাঁড়িয়ে গেল। বললে–কী?
প্রকাশ মামা জিজ্ঞেস করলে–আচ্ছা বলতে পারেন মশাই শুড়ি-খানাটা কোন্ জায়গায়?
–শুঁড়িখানা?
প্রকাশ মামা বললে–হ্যাঁ, শুঁড়িখানা
লোকটার মুখে বিস্ময়ের চিহ্ন দেখে প্রকাশ মামা আরো বিশদ করে বুঝিয়ে বললে–মানে মদের দোকান, দিশি মদের দোকান। আমি আগে অনেকবার এসেছি, এবার দিনের বেলা কিনা তাই চিনতে পারছি না, আগে রাত্তিরে এসেছিলুম তো–
লোকটা খানিকক্ষণ প্রকাশ মামার দিকে কী রকম কটমট করে তাকিয়ে বললে–আমি জানি না–
বলে হন-হন করে যেদিকে যাচ্ছিল তেমনি আবার চলতে লাগলো।
প্রকাশ মামা লোকটার দিকে হাঁ করে খানিকক্ষণ চেয়ে রইলো। আশ্চর্য তো! মদের নাম শুনেই এমন ঘেন্না! কেন, মদ কি খাবার জিনিস নয়। মদের নাম করে কী এমন অন্যায়টা করেছি।
মনে বড় আঘাত লাগলো প্রকাশ মামার। না, এমন বেআদপি সহ্য করলে চলবে না। লোকটা যেদিকে যাচ্ছিল প্রকাশ মামা সেইদিকেই দৌড়তে দৌড়তে চললো–ও মশাই, শুনুন শুনুন–
লোকটার কাছে যেতেই লোকটা শুনতে পেয়েছে। পেছন ফিরে দাঁড়ালো লোটা।
প্রকাশ মামা বললে–আপনি যে কটমট করে চাইলেন আমার দিকে, আমি কী করেছি আপনার?
লোকটা আরো হতবাক!
কিন্তু প্রকাশ মামা ছাড়বার পাত্র নয়। বললে–বলুন, আমি কী করেছি আপনার? আমি তো শুধু আপনাকে জিজ্ঞেস করেছি শুঁড়িখানাটা কোথায়! তা আপনার গায়ে কি ওমনি ফোঁসকা পড়ে গেছে? মদ কি এত ঘেন্নার জিনিস সে আপনি আমার দিকে অমন কটমট করে চাইলেন?
লোকটা বললে–তা আমি কি মাতাল যে তুমি আমার কাছে শুঁড়িখানার হদিস জানতে চাইছো?
প্রকাশ মামা চটে গেল। বললে–খবরদার বলছি তুই-তোকারি কোর না, ভালো হবে না–
লোকটা বললে–মাতালকে আবার তুই-তোকারি করবো না তো কি আপনি-আজ্ঞে করবো নাকি?
