সদানন্দ কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই নয়নতারা বলে উঠলো–কেন তুমি ওকে তাড়িয়ে দিচ্ছ? আমি বলছি উনি যাবেন না, উনি চলে গেলে আমিও এখানে আর থাকবো না–
নয়নতারার কোনও কথার উত্তর না দিয়ে নিখিলেশ সদানন্দর দিকে চাইলে। বললে– আপনি উঠুন সদানন্দবাবু, দোহাই আপনার, আপনি উঠুন–
নয়নতারা বললো, উনি উঠবেন না–
–নিশ্চয়ই উঠবেন। আপনি উঠুন সদানন্দবাবু—
নয়নতারা বললে–কিছুতেই উঠবেন না, আমি ওঁকে উঠতে দেব না—
নিখিলেশ বললে–তোমার জোর নাকি?
বলে নিখিলেশ সদানন্দবাবুর হাত ধরলে। বললে–দোহাই আপনার, আপনি উঠুন—
কিন্তু সদানন্দ তখন নিজেই উঠে দাঁড়িয়েছে। বললে–কিন্তু আমার কথা তো কিছু বলা হলো না–
–সে আর বলতে হবে না আপনাকে, আপনি এখন যান–
সদানন্দ তখন ঘরের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। নিখিলেশ বললে–দেরি করছেন কেন, আপনি যান—আসুন–
নয়নতারা বলে উঠলো–তাহলে আমিও এ বাড়িতে থাকবো না, আমিও চলে যাবো–
নিখিলেশ তখন সদানন্দকে ঠেলতে ঠেলতে উঠোন দিয়ে সদর-দরজার বাইরে ঠেলে দিয়েছে। বললে–দেখছেন তো আমি কী অবস্থার মধ্যে বেঁচে আছি-এর পরও আপনি এখানে আসবেন?
পেছন থেকে নয়নতারা দৌড়তে দৌড়তে এল। বললে–তুমি পথ ছাড়ো, পথ ছাড়ো, আমিও যাবো–
কিন্তু তার আগেই নিখিলেশ সদর দরজাটা সশব্দে বন্ধ করে দিয়েছে। দিয়ে পথ আটকে দাঁড়িয়ে রইল।
নয়নতারা বললে–তুমি সরো–আমি বাইরে যাবো—সরো—
নিখিলেশ গলা চড়িয়ে বললে–না–
–আমি আর কিছুতেই থাকবো না এ বাড়িতে–আমিও চলে যাবো–সরো বলছি—
নিখিলেশ তখনও তেমনি করে পথ আটকে দাঁড়িয়ে রইল। বললে–না, কিছুতেই সরবো না–দেখি তুমি কী করে যাও—
.
বড়বাজার তখন আরো জম-জমাট। দেশের অবস্থা ভালো হোক আর মন্দই হোক বড়বাজারের বাড়বাড়ন্ত যেন কখনও কমতে নেই। বড়বাজারের মানুষ যেন কিছুতেই দমে না। উৎসবে ব্যসনে রাজদ্বারে শ্মশানে বড়বাজার চিরকালের জন্যে সকলের অন্তরঙ্গ বান্ধব। প্রকাশ মামা বেশিক্ষণ এক জায়গায় চুপ করে বসে থাকবার মানুষ নয়। বিশেষকরে বড়বাজারের হট্টগোলের মধ্যে ধর্মশালার একটা অন্ধকার ঘরের কোণে প্রকাশ মামার মত মানুষ কী বেশিক্ষণ বন্দী হয়ে থাকতে পারে! আগেও প্রকাশ মামা কলকাতায় এসেছে বড়বাজারে। কিন্তু সে তো টাকা ওড়াতে। তখন নবাবগঞ্জই ছিল প্রকাশ মামার বড়বাজার। সেই নবাবগঞ্জের বড়বাজারে টাকা আয় করে তা খরচ করতে আসতো কলকাতার এই বড়বাজারে। এটা ছিল প্রকাশ মামার টাকা ওড়াবার বড়বাজার। বলতে গেলে প্রকাশ মামার কাছে সমস্ত কলকাতা শহরটাই ছিল তার বড়বাজার। রাতটা কাটাতো মানদা মাসির কালীঘাটের বস্তি বাড়িতে। আর দিনটা কাটতো এই বড়বাজারে। এখানে কোন দোকানে খাঁটি সিদ্ধির সরবৎ পাওয়া যায়, কোন গলির মধ্যে কার কোন্ কোটরে চোলাই মদ পাওয়া যায়, সে-সব ছিল প্রকাশ মামার নখদর্পণে!
আহা প্রকাশ মামার কত সাধের কলকাতা! জামাইবাবু মারা যাবার পর থেকে কত স্বপ্ন দেখে এসেছে প্রকাশ মামা। বরাবর মনে মনে চার লাখ-টাকার স্বপ্ন দেখে এসেছে। স্বপ্ন দেখেছে কলকাতায় একখানা বাড়ির। আর স্বপ্ন দেখেছে বিলিতি হুইস্কির। জীবনে বিলিতি হুইস্কি খাওয়ার বড় সাধ ছিল প্রকাশ মামার। যতদিন দিদি বেঁচেছিল ততদিন পেট পুরে বিলিতি হুইস্কি খেয়েছে। কিন্তু দিদি মারা যাওয়ার পর থেকে আর খাওয়ার পয়সা জোটেনি। দিশী হুইস্কি দু’একবার খেয়ে দেখেছে সে, কিন্তু সে ধেনো মদের মতন। তাতে নেশা হয় না, বরং নেশাটা কেটে যায়।
পাঁড়েজী দেখতে পেয়েছে। বললে–কোথায় যাচ্ছেন মামাবাবু?
প্রকাশ মামা কথাটা কী করে বলবে বুঝতে পরলে না। বললে–আমার ভাগ্নে তো এল না পাঁড়েজী, কোথায় গেল বলো তো? এখনও এল না কেন?
পাঁড়েজী কী করে জানবে কেন বাবুজী এল না!
প্রকাশ মামা বললে–অথচ জানো, একসঙ্গেই আমরা রেলবাজার থেকে ট্রেনে উঠলুম, আমি একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলুম আর তারই ফাঁকে কোথায় কোন্ ইস্টিশানে সদা নেমে গেল টেরই পেলুম না।
একটু থেমে বললে–তা কোথায় গেল বল তো সে? কোথায় যেতে পারে?
পাঁড়েজী বললে–তা কী করে বলবো হুজুর–
প্রকাশ মামা বললে–তা তো বটেই, তুমিই বা কী করে বলবে? আসলে আমারই দোষ, পোড়া চোখে কী ঠিক সেই সময়েই ঘুম আসতে হয়? শালা ঘুমেরও কী একটা সময় অসময় নেই রে? জানো আমার এমন রাগ হচ্ছে নিজের ওপর, মনে হচ্ছে নিজের গালে নিজে কষে চড় মারি–
–আপনি অত ভাবছেন কেন? এসে যাবেন ঠিক, দু’দিন একটু সবুর করুন না।
প্রকাশ মামা অস্থির হয়ে উঠলো। বললে–তুমি বুঝছো না পাঁড়েজী, তুমি বুঝতে পারবেও না। আমার মতন অবস্থা তোমার হলে তুমি বুঝতে পারতে। একটা দুটো টাকা তো নয়, চার-চার লাখ টাকা আমার ভাগ্নে খোলামকুচির মত উড়িয়ে দিলে।
–চার লাখ টাকা? বাবুজী উড়িয়ে দিলে?
–হ্যাঁ পাঁড়েজী, তবে আর বলছি কি তোমাকে, একেবারে খোলামকুচির মত উড়িয়ে দিলে গো, তবু আমাকে একটা পয়সা পর্যন্ত দিলে না।
পাঁড়েজী এসব কথা কিছুই বুঝতে পারলে না। বললে–অত টাকা কোত্থেকে পেলে বাবুজী?
প্রকাশ মামা বললে–তুমি কিছু বুঝবে না, তোমাকে বলে কিছু লাভ নেই। আট লাখ রুপিয়া তোমার বাবুজী হাতে পেয়েছিল, সেই টাকাটা কেউ গাঁয়ের ছোটলোক-গুলোকে দেয়?
–কেন দিলে?
