বলে সদানন্দর হাত ধরে ঘরের ভেতরে নিয়ে যাবার চেষ্টা করলে।
নয়নতারা রাস্তা আটকে দাঁড়ালো। বললে–কেন তোমার ঘরে যাবে ও? যা বলবার এখানে আমার ঘরের ভেতরে দাঁড়িয়ে বলবে, এখানে দাঁড়িয়েই ওর কথা তোমায় শুনতে হবে–
সদানন্দ নয়নতারার দিকে চাইলে। বললে–নিখিলেশবাবুর ঘরেই যাই না, তাতে তোমার কী আপত্তি? এতক্ষণ তো তোমার ঘরেই বসেছিলুম, এতক্ষণ তো তোমার সঙ্গেই কথা বললুম! তোমাকে যে কথাগুলো বলেছি সেই কথাগুলোই ওঁকে ওঁর ঘরে বসেই বলি না–
নিখিলেশ বললে–আসুন আসুন–সব ব্যাপারে ওর কথা শুনতে হবে তার কী মানে আছে–
নয়নতারা বললে–তাহলে আমিও সেখানে থাকবো, আমার আড়ালে আমার বিরুদ্ধে কোনও কথা আমি বলতে দেব না–
বলে সেও দু’জনের সঙ্গে পাশের ঘরে গিয়ে ঢুকলো।
নিখিলেশ সদানন্দকে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়েই বললে–দেখুন সদানন্দবাবু, আপনি হয়ত জানেন না, আমি আপনার মত বড়লোকের ঘরের ছেলে নই। প্রথম জীবনে স্বদেশী করেছি, ভেবেছিলুম দেশের কাজ করেই সারা জীবন কাটাবো, কিন্তু দিনকাল বদলে গেল। আমরা যারা একসঙ্গে জেল খেটেছি তাদের মধ্যে কত লোক কত বড় হয়ে গেল। কেউ পেলে নুনের কনট্র্যাক্ট, কেউ পেলে ভালো চাকরি। আবার কেউ বা জেল-খাটার জন্যে পেলে ফরেন সারভিস। সবাই বড় বড় বাড়ি করে ফেললে কলকাতায়, তারা রাস্তা দিয়ে বড় বড় গাড়ি চড়ে বেড়ায়, আমাকে দেখলে এখন চিনতেই পারে না। তাদের মধ্যে আমিই কেবল এখনও সেই গরীবই রয়ে গেলাম। আমার কিছুই হলো না। এমন সময়ে নয়নতারাকে বিয়ে করতে হলো। ভাবলুম দু’জনে চাকরি করবো। একজনের মাইনের টাকা জমিয়ে কলকাতায় একটা ছোটখাটো বাড়ি করবো। তারপরে সুখে-স্বচ্ছন্দে দিন কাটাবো, যেমন আমার আগেকার বন্ধুরা কাটায়।
নয়নতারা মাঝখানে বলে উঠলো–এই সব কথা বলার জন্যেই তুমি ওঁকে তোমার ঘরে ডেকে নিয়ে এলে নাকি?
নিখিলেশ বললে–আমাকে বলতে দাও না সবটা–
সদানন্দ বললে–এ-সব কথা আমি জানি নিখিলেশবাবু, আমাকে কেন এ-সব কথা বলছেন?
নিখিলেশ বললে–আপনাকে এই জন্যে বলছি যে, আপনি আমার সমস্ত অশান্তির মূল–
সদানন্দ অবাক হয়ে গেল। বললে–আমি?
–হ্যাঁ, আপনিই আমাদের সমস্ত অশান্তির জন্য দায়ী।
–কিন্তু আমি তো বুঝতে পারছি না আমি আপনাদের অশান্তির জন্য কেন দায়ী হলুম!
নিখিলেশ বললে–আপনি যেদিন থেকে আমাদের বাড়িতে এসে ঢুকলেন সেই দিন থেকেই আমাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে ভাঙন ধরলো। যে কটা টাকা আমরা জমিয়ে ছিলুম সব নষ্ট হয়ে গেল। একটা সোনার হার গড়িয়ে দিয়েছিলুম নয়নতারাকে, তাও আপনার অসুখের সময় হাতছাড়া হয়ে গেল। এখন আর আমাদের জমানো টাকা বলে কিছু নেই–
সদানন্দ শুনে খানিক চুপ করে রইল। তারপর বললে–আমি স্বীকার করছি আমি দোষ করেছি। জ্ঞাতসারে নয়, অজ্ঞাতসারে আমি সব কিছুর জন্যে অপরাধী–
কিন্তু তার কথা শেষ হবার আগেই নিখিলেশ আবার বললে–আপনি যদি সত্যিই নিজেকে অপরাধী মনে করেন তো এখন তার প্রতিকারও আপনার হাতে–
সদানন্দ বললে–বলুন কী করলে তার প্রতিকার হবে?
–তাহলে নয়নতারার যে-সব গয়না আপনাদের কাছে ছিল সেগুলো অন্তত ফেরত দিন–অন্তত…
নয়নতারা হঠাৎ বলে উঠলো–না, চাই না আমার গয়না, তুমি কিছুতেই গয়নাগুলো দিও না ওকে, ও ওই গয়নাগুলোর লোভেই আমাকে বিয়ে করেছে তা জানো? গয়না গুলোর ওপরেই ওর যত লোভ–
–কী? তোমার গয়নার ওপরে আমার লোভ?
নয়নতারা বলে উঠলো–হ্যাঁ, লোভই তো। তুমি মনে করেছ আমি সত্যি কথা বলতে ভয় পাবো? তুমি গয়নাগুলো আনতে নবাবগঞ্জে যাও নি?
–গিয়েছিলুম সে কি আমার জন্যে? সেই গয়না বিক্রি করে যখন টাকা হতো সে টাকা কি আমি নিজের নামে ব্যাঙ্কে রাখতুম?
সদানন্দ দু’জনের মধ্যস্থতা করবার জন্যে বললে–দেখুন নিখিলেশবাবু, সে-সব তো অনেক দিন আগেকার ঘটনা, আমি সে-সব দেখিও নি, আর দেখলেও তা আমার মনে নেই। আপনি যদি বলেন সেই গয়নার কত দাম হতে পারে তো এখন আমি তা দিতে পারি
নয়নতারা বাধা দিয়ে বললে–না, তা দিতে হবে না। সে-গয়না সে-টাকা আমি কিছুই নেব না—
নিখিলেশ বললে–কেন নেবে না? তোমার গয়না, তার ওপরে তো তোমার অধিকার আছে, নেবে না কেন?
–আমি যদি না নিই তো তোমার কী? আমার গয়নার ওপর তোমার অত লোভ কেন?
নিখিলেশ বললে–লোভের কথা বার বার বলছো কেন?
–তা বলবো না?
নিখিলেশ বললে–না, কেন বলবে? কেন? তোমার গয়না কি আমার গয়না নয়? তুমি আমি কি আলাদা?
নয়নতারা বলে উঠলো–নিশ্চয়ই আলাদা, আলাদা না হলে আমার গলার হার বাঁধা দিয়েছিলুম বলে কেন তুমি আমার সঙ্গে ঝগড়া করেছিলে?
নিখিলেশ রেগে উঠলো। বললে–কেন তুমি আবার সেই সব কথা তুলছো?
নয়নতারা বললে–তুলবোই তো। তুমি ভেবেছ আমাকে বিয়ে করেছ বলে তুমি আমার মাথা কিনে নিয়েছ? আমি কি তোমার মাইনে করা ঝি যে আমাকে তুমি যা বলবে তাই সহ্য করবো?
–থামো, চুপ করো!
নয়নতারাও গলা চড়িয়ে দিলে। বললে–কেন চুপ করবো? তোমার ভয়ে? তুমি আমাকে ভয় দেখাতে চাও? তুমি ভেবেছ আমি তোমার চোখরাঙানিতে ভয় পাবো?
নিখিলেশ সদানন্দর দিকে চাইলে। বললে–সদানন্দবাবু, কেন আপনি এলেন বলুন তো? কেন আপনি আমাদের মধ্যে এসে এমন করে আমাদের সংসার বিষিয়ে দিলেন? আপনি নিজের চোখেই সব কিছু দেখলেন তো! আপনি যেদিন থেকে আমাদের এখানে এসে উঠেছিলেন সেই থেকেই এই রকম শুরু হয়েছে, তার আগে আমরা কত সুখে ছিলুম। আপনাকে অনুরোধ করছি আপনি দয়া করে আর আসবেন না। দয়া করে আপনি এখন চলে যান, আমাদের বাঁচতে দিন–
