নিখিলেশ উত্তরে কিছু বললে না। লোকটা যেমন চলছিল তেমনি চলতে চলতে আবার ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল। কিন্তু নিখিলেশের মন থেকে ঘটনাটা অত সহজে মুছলো না।
নিখিলেশের মনে হলো, সত্যিই তো! এরাই তো পুঁজিবাদী। এই গাড়ির মালিকরা। নিখিলেশ নিজে কত পুলিসের লাঠি খেয়েছে, কতবার জেল খেটেছে, কতবার মদের দোকানে পিকেটিং করেছে, খদ্দর পরেছে, ইংরেজ বেটাদের দেশ থেকে তাড়াবার জন্যে কত কী করেছে, আর সেই সাহেবরা যখন সত্যিসত্যিই চলে গেল তখন মাঝখান থেকে লুঠতে লাগলো কিনা অন্য লোকরা। যারা দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে মজা লুঠতো, দেশ স্বাধীন হবার পরেও সেই তারাই আবার মজা লুঠতে লাগলো। এ কেমন বিচার! এর নাম কি স্বাধীন হওয়া?
নৈহাটি স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে যখন বাড়ির দরজার সামনে গিয়ে কড়া নাড়তে যাবে তখন মনে হলো বাড়ির ভেতের যেন কাদের গলা শোনা যাচ্ছে। এ সময়ে বাড়িতে আবার কে এল! যেন পুরুষমানুষের গলার আওয়াজ মনে হচ্ছে!
তাড়াতাড়ি দরজার কড়াটা নাড়লে। দরজার কড়া নাড়ার আওয়াজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেতরের কথা বলা বন্ধ হয়ে গেছে।
নিখিলেশ বাইরে থেকে চেঁচিয়ে ডাকলে–গিরিবালা, ও গিরিবালা—
.
নিখিলেশ বুঝতে পারলে তার কড়া নাড়ার পরই ঘরের ভেতরের কথাবার্তার শব্দ হঠাৎ থেমে গেল। তাহলে কি নয়নতারা রোজই এই রকম করে! এই কারণেই অফিস কামাই করে নাকি নয়নতারা!
ভেতর থেকে গিরিলালার গলা শোনা গেল–কে?
–আমি, দরজা খোল।
গিরিবালা দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে নিখিলেশ ভেতরে ঢুকে রোজকার মত নিঃশব্দে সোজা নিজের ঘরের দিকে চলে যাচ্ছিল। এই কদিন এমনি করেই সে রোজ অফিস থেকে এসেছে আর নিঃশব্দে নিজের ঘরের ভেতরে গিয়ে ঢুকেছে। তারপর নয়নতারা খেলে কি খেলে না, নিখিলেশই বা খেলে কি খেলে না তা নিয়ে দুজনের কেউ মাথা ঘামায় নি। যেন নেহাৎ এক বাড়িতে থাকতে হয় তাই থাকা, এক সংসারে খেতে হয় তাই খাওয়া। তার বেশি আর কিছু নয়।
কিন্তু সেদিন প্রথম ব্যতিক্রম ঘটলো। নিখিলেশ উঠোন পেরিয়ে বারান্দায় উঠতেই সেই মানুষটার সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়াতে হলো।
–নমস্কার!
আশ্চর্য, তার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে তার স্ত্রীর সঙ্গে এতক্ষণ গল্প করে আবার তাকেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসে নমস্কার করছে! এত বড় নির্লজ্জ মানুষ তো নিখিলেশ জীবনে আর কখনও দেখে নি!
বললে–আপনি? আপনি কতক্ষণ এসেছেন?
সদানন্দ বললে–আমি অনেকক্ষণ এসেছি, সেই দুপুরবেলা। আপনার সাথে দেখা করবার জন্যেই এতক্ষণ অপেক্ষা করছি–
নিখিলেশ বললে–কিন্তু আপনি তো জানতেন আমি দুপুরবেলা অফিসে থাকি, দুপুরবেলা আমরা দুজনেই অফিসে থাকি–
সদানন্দ বললে–তা জানতুম। তবু এসেছিলুম, কারণ আগেকার ট্রেনটা ধরতে পারিনি। দেরিতে এলেও আপনাদের সঙ্গে দেখা না করে আমি যেতুম না–
নিখিলেশ বললে–আসলে যার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন, তার সঙ্গে দেখা যখন হয়ে গেল তখন আর আমার জন্যে অপেক্ষা করতে গেলেন কেন? আমি তো আপনার কেউ না–
সদানন্দ বাধা দিয়ে বললে–ওকথা বলবেন না। আপনার স্ত্রী আর আপনি আপনাদের দু’জনের সঙ্গেই যে আমার দরকার–
নিখিলেশ বললে–বলুন, আমার সঙ্গে আপনার কী দরকার?
নয়নতারা বললে–তুমি মুখ-হাত-পা ধুয়ে এসে বোস না। তুমি এখন অফিস থেকে এলে, এত তাড়াহুড়ো করবার কী আছে?
সদানন্দও বললে–হ্যাঁ আপনি এত দূর থেকে এলেন, একটু বিশ্রাম করে নিন, আমি বরং অপেক্ষা করছি–
নিখিলেশ বললে–না, আমার বিশ্রামের দরকার নেই, আপনি কী বলবেন বলুন! আপনার কী এমন জরুরী কাজ যে যে-সময়ে আমি বাড়িতে থাকি না বেছে বেছে ঠিক সেই সময়েই এসেছেন?
সদানন্দ বললে–আপনি অকারণে আমার ওপরে রাগ করছেন!
নিখিলেশ বললে–তা রাগ করা কি আমার অন্যায় হয়েছে? আপনি কেন এই অসময়ে আমাদের বাড়িতে এলেন? আপনি তো রবিবার দেখে আসতে পারতেন, যেদিন ছুটির দিন, তা না এসে আজকে এলেন কেন? আপনার সঙ্গে নয়নতারার এমন কিসের সম্পর্ক যে এখনও তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন?
সদানন্দ বললে–এই আমার শেষ আসা নিখিলেশবাবু, এর পরে আমি আর কখনও আসবো না–
নিখিলেশ বলে–তা আমার অনুপস্থিতিতে আপনার কি পরস্ত্রীর কাছে আসা ঠিক হয়েছে?
এতক্ষণে নয়নতারা কথা বললে। বললে–তুমি চুপ করো, উনি এসেছেন বেশ করেছেন, দরকার হলে আবার আসবেন–
নিখিলেশও গলা চড়িয়ে দিলে। বললে–না, আমি বলছি আসবেন না আমি আসতে দেব না–
নয়নতারা বলে উঠলো–তুমি আসতে না-দেবার কে? এবাড়ি আমারও বাড়ি! তুমি যদি ওঁকে আসতে না দাও আমি আসতে দেব ওঁকে, দেখি তুমি কী করতে পারো!
–তার মানে? তুমি আমার কথার ওপরে কথা বলো? এত দূর তোমার সাহস?
নয়নতারা বলে উঠলো–তোমারই বা এমন কী সাহস যে আমাকে তুমি চোখ রাঙাচ্ছো তুমি কি মনে করো তোমাকে বিয়ে করেছি বলে আমি তোমার ঝি? তুমি যা বলবে তাই ই আমাকে শুনতে হবে?
–খবরদার বলছি আমার সঙ্গে অমন করে গলা ফাটিয়ে ঝগড়া করতে এসো না—
নয়নতারা বললে–তোমার সঙ্গে গলা ফাটিয়ে ঝগড়া করতে আমার বয়ে গেছে! মানুষের সঙ্গেই মানুষ ঝগড়া করে, তুমি কি একটা মানুষ?
নিখিলেশ এ-কথার উত্তর না দিয়ে সদানন্দর দিকে চেয়ে বললে–আসুন সদানন্দবাবু, আমার সঙ্গে যেকথা বলবার আছে তা আমার ঘরে এসে বলুন, এখানে কথা বলা যাবে না–
