গিরিবালা ভেতরে ঢুকে বললে–-মেয়ে ভালো আছে দেখলুম তাই তাড়াতাড়ি চলে এলুম দিদিমণি, ভাবলুম তুমি একলা আছো বাড়িতে–
নয়নতারা বললে–তা মেয়ের কাছে আরো একটু থাকলে না কেন? আমি তো তোমাকে বলেই ছিলুম, আজকে আমার তেমন কোনও তাড়া নেই, তুমি দেরি করে এলেই পারতে
সদানন্দ ঘরটার ভেতরে বসে বসে সব কথা শুনতে পাচ্ছিল। হঠাৎ আবার নয়নতারার কথা কানে এল–তাহলে যখন এসে গেছ তখন আমার একটা কাজ করো দিকিন উনুনে তাড়াতাড়ি আগুন দিয়ে দুজনের একটু চা করে দাও–
সদানন্দর তখন আর একলা বসে থাকতে ভালো লাগছিল না। তার কেবল মনে হচ্ছিল নিখিলেশবাবু এসে পড়লেই যেন ভালো হয়। এদের স্বামী-স্ত্রীর মনকষাকষির মধ্যে সে কেন মাথা গলাবে! নিজের সংসার নেই বলে পরের সংসারকে কেন সে ভাঙতে যাবে! কেন পরের ক্ষতিসাধনের কারণ হবে!
কিন্তু তখন কি সদানন্দ জানত যে যাদের ভালো করার জন্যে তার এত প্রচেষ্টা, যাদের মঙ্গল করার ব্রত নিয়ে সে এতদিন জীবন প্রদক্ষিণ করে এসেছে, তারাই একদিন তার সমস্ত স্বার্থত্যাগকে পরিহাস করবে? তার এতদিনকার সমস্ত কৃচ্ছ্রসাধন সকলের সমবেত চেষ্টায় ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে? কত বুদ্ধ, কত চৈতন্য, কত মহম্মদ, কত নানক আরো কত মহাপুরুষ এসে কত জীবন দিয়ে কত সত্যই তো প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, কিন্তু ক্ষণকালের জৌলুসের চোখ ধাঁধানো আলোয় কখন যে এই চিরকালের সত্যটা আচ্ছন্ন হয়ে গেছে তা কি কেউ টের পেয়েছে!
তা হয়ত সদানন্দর সেই শিক্ষারও দরকার ছিল! দরকার ছিল তার এই মোহ-ভঙ্গের! নইলে যে-মানুষ সব কিছু ত্যাগ করবার শক্তি অর্জন করেছে সে কেন নৈহাটির একটা অখ্যাত বাড়িতে আবার ফিরে আসতে গেল? কীসের লোভে? কার আকর্ষণে?
আর সদানন্দ যদি এমন অপ্রত্যাশিত ভাবে নৈহাটিতে না-ই আসতো সে আসামী হতো কী করে? আর সদানন্দ একজন আসামী হয়েছিল বলেই তো এ-উপন্যাসের অবতারণা।
কিন্তু সে কথা এখন থাক।
.
সমাজের মধ্যবিত্ত আর অল্পবিত্ত মানুষের মন তখন এমন এক অবস্থায় এসে পৌঁছেছে যেখান থেকে বেশি দূরে আর কারোর নজর যায় না। তাদের কাছের জিনিস নিয়েই তারা তখন উদভ্রান্ত। তখন তাদের সামনে ছোটই বড় হয়ে উঠেছে, আর বড়ই হয়ে উঠেছে ছোট। সমসাময়িককেই তারা চিরকালের বলে তারস্বরে ঘোষণা করতে শুরু করেছে আর চিরকালের কথাটা তখন আর কারো মাথায় ঢুকছে না। দেশের নতুন সংবিধান তখন চালু হয়েছে বটে, কিন্তু তাতে শুধু পাওনাগণ্ডার কথাটাই সবিস্তারে লেখা হয়েছে, মানুষের কর্তব্য বলেও যে একটা জিনিস আছে কোথাও সেটার কোনও উল্লেখ নেই তাতে। সেখানে লেখা আছে আজ থেকে সব মানুষের খাওয়া-পরার দায়টা আমরা নিলাম। কাউকে বেকার থাকতে দেব না, সকলকে আমরা লেখাপড়া শেখাবো, সকলের জন্যে একটা মাথা গোঁজবার আশ্রয় দেবার দায়িত্বটা আমাদের। সুখী সমৃদ্ধ ভারতবর্ষ গড়ে তোলবার সংকল্পের কথাটাও আমরা পাকা খাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখে রেখে গেলাম। কেউ কাউকে শোষণ করতে পারবে না। গণতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতা স্বাধীনতা আর সার্বভৌমত্বের জয় আমরা ঘোষণা করছি, আজ এই ঘোষণাই আমাদের ভবিষ্যতের বংশধরদের রক্ষাকবচ হোক।
কিন্তু একটা কথা শুধু তাঁরা সেখানে লিখতে ভুলে গেলেন যে মানুষকে তার বদলে কিছু কর্তব্য পালন করতে হবে। লিখতে ভুলে গেলেন যে দেশের মানুষেরও কিছু দায়িত্ব আছে। আর তা লেখা নেই বলেই সরকারের কী করা উচিত সেটা সবাই জানতে পারলে, কিন্তু দেশের লোকেদের কী করা উচিত তা আর কেউ জানতে পারলে না। জানতে পারলে না যে মানুষকেও সৎ হতে হবে, মানুষকেও মানুষ হতে হবে। জানতে পারলে না বলেই চৌধুরী মশাই-এর ফেলে যাওয়া সম্পত্তির ভাগের ওপর প্রকাশ মামার অত লোভ। তাই সাহেব পাড়ায় ‘ম্যাসাজ ক্লিনিক’ খোলবার জন্যে বাতাসীকে মানদা মাসির অত খোশামোদ! তাই চাকরি ছেড়ে দিয়ে একটা কিছু ব্যবসা করে বড়লোক হবার জন্যে নিখিলেশের অত অস্থিরতা।
প্রতিদিনের মত সেদিনও নিখিলেশ অফিস থেকে বেরিয়েছিল। কিন্তু চারদিকে বড় বড় বাড়ি দেখেই তার মনটা কেমন বিষিয়ে গেল। এরকম প্রতিদিন তার মন বিষিয়ে যায়। মনে হয় সকলেরই সব কিছু হলো, শুধু আমার কিছু হলো না। আমিই চিরকাল কেরানী রয়ে গেলাম। রাস্তা দিয়ে একটা চকচকে ঝকঝকে নতুন গাড়ি দেখলে কেবল একদৃষ্টে সেই দিকে চেয়ে থাকে সে। নিখিলেশের কেবল মনে হতো আমরা হেঁটে হেঁটে পা ব্যথা করে মরছি আর ওরা কেমন বেশ আরাম করে গাড়ি চড়ে চলেছে!
সেদিন আর এক কাণ্ড হলো। পাশ দিয়ে একটা গাড়ি যেতেই দেখলে পাশের কে একটা লোক গাড়ির গায়ে পচ্ করে একদলা পানের পিক ফেলে দিলে। গাড়ির মালিক লোকটা কিছুই জানতে পারলে না। গাড়িটা যেমন চলছিল তেমনি সামনের দিকে চলতে লাগলো। গাড়িটা অদৃশ্য হয়ে যাবার আগে পর্যন্ত নিখিলেশ সেই দাগটার দিকে চেয়ে দেখতে লাগলো। ক্রিম রং-এর গাড়ির গায়ে পানের লাল পিকের দাগ। বাড়িতে গিয়ে ধুতে হবে। বেশ হয়েছে।
যে লোকটা পানের পিক ফেলেছিল তার দিকেও এবারে চেয়ে দেখলে নিখিলেশ। বেশ নির্বিকার কিন্তু লোকটা। গাড়ির গায়ে পানের পিক ফেলে যেন সে মহা কীর্তি করেছে এমনি একটা উল্লাস তার মুখেচোখে।
লোকটা নিখিলেশের দিকে চেয়ে নিজে থেকেই বলে উঠলো–এরাই মশাই ক্যাপিটালিস্ট, এরাই দেশের আসল শত্রু–
