কালীকান্ত ভট্টাচার্য জিজ্ঞেস করলেন–তা আমার মেয়েকে কেমন দেখলেন?
প্রকাশ মামা বললে–ওই যে এককথায় বললাম ডানা-কাটা-পরী–
–আপনার পছন্দ হয়েছে?
প্রকাশ বললে–আপনার মেয়েকে যার অপছন্দ হবে সে হয় কানা আর নয় তো মিথ্যেবাদী।
কালীকান্ত ভট্টাচার্যের চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসতে চাইল। তিনি কী করবেন বুঝতে না পেরে বলে উঠলেন–আপনি আর দু’টো সরভাজা নিন্ বেয়াই মশাই–
–তা দিন। খেতে আমার কোনও কালেই আপত্তি নেই। একবার সম্বন্ধটা হয়ে যাক তখন দেখবো আপনি আমাকে কত সরপুরিয়া সরভাজা খাওয়াতে পারেন–
কথাটা বলে প্রকাশও যত হাসতে লাগলো ভট্টাচার্য মশাইও তত। সঙ্গে সঙ্গে আরো সরপুরিয়া এলো, আরো সরভাজা। আরো কথা হলো, আরো হাসি। প্রথম দিনেই প্রকাশ মামা হাসিতে গল্পে পাত্রীর বাবার মন ভিজিয়ে দিলে। সেখান থেকে বেরিয়েই সোজা ট্রেনে উঠে একেবারে রেল বাজারে নামলো। বারোয়ারিতলায় আসতেই লোকজন ধরলে। কী শালাবাবু, কোত্থেকে আসা হচ্ছে?
শালাবাবু বললে–ওহে, তোমাদের সব বলে রাখি, আসছে অঘ্রাণে সদার বিয়ে, এই পাত্রী পছন্দ করে এলুম। তোমরা সব যাবে, তোমাদের সব নেমন্তন্ন রইলো–
কথা শুনে সবাই অবাক। সদানন্দর বিয়ে। চৌধুরী মশাই-এর একমাত্র ছেলের বিয়ে।
–নেমন্তন্ন হবে সকলের, যাওয়া চাই কিন্তু—
কোথায় বিয়ে, কবে কোন্ তারিখে বিয়ে, তার ঠিক নেই, শুধু পাত্রী দেখলুম আর বিয়ে হয়ে গেল! বিয়ে কি অত সহজে হয়? আর তা ছাড়া যার বিয়ে সেই চৌধুরী-মশাই-এর ছেলেই তো বলে বিয়ে করবে না সে। রাস্তায় ঘাটে কত লোক সদানন্দকে দেখেছে। সকলের সঙ্গে নদীতে চান করবার সময়ও অনেকে জিজ্ঞেস করেছে–কীরে সদা, কাল কোথায় ছিলি তুই? সবাই যে তোর খোঁজাখুঁজি করছিল? কোথায় গিয়েছিলি?
সদানন্দ বলেছে—কালীগঞ্জে–
–কালীগঞ্জে? কালীগঞ্জে কী করতে?
–বেড়াতে।
কালীগঞ্জে বেড়াতে যাওয়ার কথা শুনে সবাই অবাক হয়ে যায়। আর বেড়াবার জায়গা পেলে না সদানন্দ, বেড়াতে গেল কি না কালীগঞ্জে! তার চেয়ে বারোয়ারি-তলায় নিতাই হালদারের দোকানের সামনে মাচায় তাস খেলতে এলেই হয়। কিম্বা নল-দময়ন্তী থিয়েটার করছে ক্লাবের ছেলেরা সেখানে গিয়ে মহড়া শুনলেই হয়। তা নয়, একলা-একলা ক্ষেতে খামারে ঘুরে বেড়ানো!
একজন বললে–এবার চৌধুরী মশাইকে বলবো তোর একটা বিয়ে দিয়ে দিতে, তখন বাড়িতে মন বসবে তোর
সদানন্দ বলেছে–আমি বিয়ে করবো না
–বিয়ে করবি না তো এই এত জমি-জমা, এত টাকা কড়ি কে খাবে?
–আমার দাদু খাবে, আমার বাবা খাবে।
–কিন্তু যখন তোর ঠাকুর্দা থাকবে না, তোর বাবা-মা কেউ থাকবে না, যখন তুইও থাকবি না, তখন কে খাবে?
সদানন্দ বলতো–তাহলে তোমরা আছো কী করতে? তোমরা খাবে!
–আমরা? আমরা খাবো? আমাদের কি অমন কপাল? অমন কপাল হলে তো আমরা বড়লোকের বাড়িতেই জন্মাতুম রে!
লোক হাসতো। চৌধুরী মশাই-এর ছেলের কাণ্ড দেখে সবাই হাসত। বলতো–ছোটবেলায় অমন সবাই বলে হে! তারপর দেখবে যখন বড় হবে, বিয়ে হবে, সংসার হবে তখন ওর বাপ-ঠাকুর্দার মত বাকি খাজনার দায়ে আমাদের নামে আবার কাছারিতে গিয়ে নালিশ ঠুকে দেবে। ওরকম অনেক দেখা আছে হে। অনেক দেখা আছে–
কিন্তু ক্রমে সেই সদানন্দর বয়েস হয়েছে, যাকে বলে সাবালক তাই-ই হয়েছে, স্কুল থেকে পাস করে কলেজে পড়তে গেছে, কিন্তু তখনও সেই একই রকম। আগেও যা ছিল পরেও তাই। তা সেই সদার এখন বিয়ে। বারোয়ারীতলার আড্ডায় রীতিমত সোরগোল পড়ে গেল। হরনারায়ণ চৌধুরীর বাড়ির বিয়ে নয় তো যেন নবাবগঞ্জের সমস্ত লোকেরই বাড়ির বিয়ে। গ্রামসুদ্ধ লোকই কোমর বেঁধে লেগে গেল আলোচনা করতে। কোথা থেকে মিষ্টি আসছে, কোন্ গয়লাবাড়িতে দই-এর বরাত গেছে, কোন্ কুমোরবাড়িতে হাঁড়িকলসী-জালার বায়না গেছে, কোন্ সদর থেকে গোরাবাজনার দল আসছে সব খবর মুখে মুখে ফিরতে লাগলো। তাক্ লেগে গেল শালাবাবুর গরম মেজাজ দেখে। পাত্রী পছন্দ করানো থেকে শুরু করে নুনকলাপাতাটুকু পর্যন্ত সবই যেন তার দায়। নরনারায়ণ চৌধুরী ভেতরে দোতলায় বসে বসে হুকুমজারি করেই খালাস। নাতির বিয়ে হবে, সে-বিয়ে তিনি দেখে যেতে পারবেন, তার কাছে তার চেয়ে বেশি আনন্দ আর কিছু নেই। ছেলে হরনারায়ণ নিজে গিয়ে কন্যাকে হীরের মুকুট দিয়ে আশীর্বাদ করে এসেছে। ওদিক থেকে কালীকান্ত ভট্টাচার্য মশাইও নিজের সাধ্যমত একটা সোনার বোতামের সেট দিয়ে পাত্রকে আশীর্বাদ করে গেছেন। তার নিজের অবস্থার চেয়ে হাজার গুণ বড় অবস্থার বংশের সঙ্গে কুটুম্বিতে করছেন সেটা তার পক্ষেও মহা আনন্দের ঘটনা। দুপক্ষই খুশী। আর দুপক্ষের মাঝখানে যোগসূত্রের মত প্রকাশ মামা একবার কেষ্টনগর আর একবার নবাবগঞ্জ করছে। ছেলে-মেয়ে-বউ সবাইকে নিয়ে এসে তুলেছে এখানে। নরনারায়ণ চৌধুরীর বেয়াই কীর্তিপদ মুখোপাধ্যায়ও সুলতানপুর থেকে অসুস্থ শরীর নিয়ে এসে হাজির হয়েছেন। কিন্তু সব কিছুর দায়িত্ব বলতে গেলে যেন শালাবাবুরই একলার। একবার ভাড়ার ঘরে গিয়ে হাজির হয় আর একবার দিদির কাছে। বলে–শ’পাঁচেক টাকা দাও তো দিদি
দিদি টাকা দিতে দিতে শুধু মাত্র জিজ্ঞেস করে–আবার পাঁচশো টাকা কী হবে? তোর জামাইবাবুর কাছেই চাইলে পারতিস–
