নয়নতারা বললে–না আসুক গে না এলেই তো ভালো। তার আসতে যত দেরি হয় ততই তো ভালো। একবারে না এলে আরোই ভালো–ওর মুখ দেখতেও আজকাল আমার ঘেন্না হয় তা জানো! অথচ আগে আমি অতটা বুঝতে পারি নি! বুঝতে পারলুম নবাবগঞ্জে গিয়ে।
–তুমিও নবাবগঞ্জে গিয়েছিলে? কেন? কী করতে?
–তবে সত্যি কথা শুনবে? তোমাকে দেখতে। ভাবলুম দেখেই আসি না গিয়ে তুমি কেমন বিয়ে করলে! তোমার বউ কেমন দেখতে হলো! যখন দেখলুম সব ওর মিথ্যে কথা সেই থেকে আর ওর সঙ্গে কথা বলি নি। কথাও বলি নি, অফিসেও যাই নি। কীসের জন্যে চাকরি করবো? কার জন্যে চাকরি করবো? আর চাকরিই যদি করতে হয় তো আমি মেসে থেকে চাকরি করবো, মেয়েদির বোর্ডিং-এ থেকে চাকরি করবো। আমার চাকরির টাকাতে ও মদ খাবে তা আমি আর কিছুতেই সহ্য করব না। তা এই জন্যেই তো আমি এখুনি বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছিলুম, তুমি এসে না পড়লে এতেক্ষণে আমি হয়ত কলকাতায় পৌঁছে যেতুম–
তারপর হঠাৎ সদানন্দর দিকে ঝুঁকে পড়ে বললে–তা তুমি যখন এসেই পড়েছ তো তোমাকেই জিজ্ঞেস করি, তুমি আমার একটা কথা রাখবে?
–কী, বলো?
–কিন্তু তোমাকে বলতে আমার বড় ভয় করছে।
–কী কথা, বলোই না?
–তুমি আমার সঙ্গে যাবে?
সদানন্দ বুঝতে পারলে না। বললে–কোথায়?
–যেখানে তুমি যাবে, সেখানেই আমি যাবো। তোমার সঙ্গে কোথাও চলে যেতে পারলে আমি বেঁচে যাই, আমার আর কিছুই ভালো লাগছে না। এ বাড়ি আমার কাছে এখন বিষ হয়ে গেছে। এ বাড়ির প্রত্যেকটা ইট আমার কাছে এখন অসহ্য হয়ে উঠেছে, এখানে আর একদিন থাকলে আমি পাগল হয়ে যাবো, সত্যি। এর থেকে একমাত্র তুমিই আমাকে বাঁচাতে পারো। আমাকে তুমি নিয়ে যাবে তোমার সঙ্গে?
সদানন্দ এ কথার কিছু জবাব দিল না। চুপ করে রইল।
নয়নতারা এবার আরো কাছে ঝুঁকে এল। বললে–কই, তুমি কিছু কথা বলছে না যে? আমি সঙ্গে থাকলে কি তোমার খুব খারাপ লাগবে? সত্যি বলছি, আমি তোমার বোঝা হয়ে থাকবো না, তুমি যা বলবে আমি তাই শুনবো, দরকার হলে তুমি না হয় অন্য ঘরে শোবে, আর আমি শোব অন্য ঘরে। রাত্তিরে না-হয় কেউ কারো মুখই দেখবো না, তাতে তুমি রাজি তো? বলো তুমি রাজি?
সদানন্দ এবারও কোনও কথা বললে না।
নয়নতারা বললে–দেখ, আমি চলে যাবো বলে আমার ঝিকে পর্যন্ত অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দিয়েছি, আর আমার সঙ্গে কিছু নেবারও নেই। এ বাড়ির একটা জিনিসও আমি সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চাই না। অথচ এর অনেক জিনিস আমার নিজের টাকায় কেনা। একদিন এসব জিনিসের ওপর অনেক মায়া ছিল আমার। একদিন সাধ ছিল কলকাতায় একটা বাড়ি করবো, বেশ মনের মতন বাড়ি। কিন্তু সে-সব শখ এখন ঘুচে গেছে আমার–এখন মনে হয় আমি এতদিন যা-কিছু করেছি সব ভুল করে করেছি। তা সে যাক গে, পুরোন কথা এখন আর না ভাবাই ভালো। এখন না হয় আবার নতুন করে জীবন আরম্ভ করবো। তুমি যদি বলো তো আমার চাকরিটাও আমি ছেড়ে দিতে পারি–
তারপর হঠাৎ যেন আবার নয়নতারার খেয়াল হলো। বললে–কই, তুমি কিছু বলছো যে? আমিই কেবল বকবক করে মরছি। তুমি কি আমাকে সঙ্গে নেবে?
সদানন্দ বললে–তার চেয়ে আমি বরং উঠি, নিখিলেশবাবু তো এখনও এলেন না।
নয়নতারা বললে–তুমি বুঝি চাও সে এখন এসে পড়ুক।
সদানন্দ বললে—হ্যাঁ–
নয়নতারা বললে–কেন? কেন তুমি চাও সে আসুক! তাই যদি চাও তাহলে তুমি বরং এখানে থাকো, আমিই যাই। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে–
সদানন্দ বললে–কিন্তু তুমি না-ই বা গেলে!
নয়নতারা বললে–তুমি বলছো কী? তুমি কি চাও আমি ওই মিথ্যে-বাদীটার সঙ্গে সংসার করি? তোমার যদি আমার মত অবস্থা হতো তো তুমিই কি এখানে থাকতে পারতে? কোনও মানুষ তা পারে? আমি বলে তাই এতদিন পেরেছি। অন্য কোনও মেয়ে হলে পারতো না, এ তোমায় আমি বাজি রেখে বলতে পারি–
বলে নয়নতারা কাপড়ের ব্যাগটা আবার হাতে তুলে নিলে। বললে–তাহলে তুমি যাবে না তো? সত্যিই যাবে না?
সদানন্দ কোনও উত্তর না দিয়ে চুপ করে বসে রইল।
–তাহলে তুমি থাকো, আমি যাই, এখুনি একটা ট্রেন আছে কলকাতার!
বলে নয়নতারা যাবার জন্যে পা বাড়াত গেল।
সদানন্দ দাঁড়িয়ে উঠলো। বললে–তাহলে আমাকেও উঠতে হয়। তুমি চলে গেলে আমি একলা কী করে এ বাড়িতে বসে থাকি!
নয়নতারা বললে–তা একলা বসে থাকতে তোমায় কে বলেছে? আমি তো বলছি তুমি চলো। আমি তো বলছি তুমি যেখানে যাবে আমি সেখানেই যেতে রাজি। নবাবগঞ্জে যেতে বললে–আমি না-হয় নবাবগঞ্জেই যাবো–তুমি বললে–আমি আমার চাকরিটাও ছেড়ে দিতে পারি তা জানো! চলো, চললে চলো, দেরি করলে হয়তো কেউ আবার এসে পড়তে পারে–
হঠাৎ বাইরে কড়া নাড়ার শব্দ হতেই নয়নতারার মুখটা কেমন যেন ভয়ে শুকিয়ে গেল। নিজের মনেই যেন বলে উঠল–এমন সময় আবার কে এল?
সদানন্দ যেন এতেক্ষণে নিষ্কৃতি পেয়েছে বলে মনে হলো। বললে–বোধ হয় নিখিলেশবাবু এলেন–
কথাটা শুনে নয়নতারা আরো মন-মরা হয়ে গেল। যদি সত্যিই নিখিলেশ হয়! অথচ গিরিবালা বাড়িতে নেই। তাকে নিজে গিয়েই দরজা খুলে দিতে হবে! নয়নতারা উঠোন পেরিয়ে সদর দরজাটা খুলতে গিয়েও একটু দ্বিধা করতে লাগলো।
তারপর বললে–কে?
–আমি দিদিমণি! আমি?
গিরিবালার গলা। গলাটা শুনেই নয়নতারা দরজার খিলটা খুলে দিলে।
–কী হলো? তুমি এত তাড়াতাড়ি চলে এল যে?
