নয়নতারা বললে–তা আমি জানি। তুমি বরাবর আমাকে ঘেন্না করো তাও আমার অজানা নয়–
সদানন্দ বললে–না, সেজন্যে নয়, আমি চেয়েছিলুম তুমি সুখী হও। আমার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার ফলে তোমার কপালে যে কষ্টভোগ হয়েছিল, সে-সব আমি নবাবগঞ্জের দিদিমার কাছে আগেই শুনেছিলুম–
–তা তুমি কি আগে জানতে যে আমার আবার বিয়ে হয়ে গিয়েছে।
সদানন্দ বললে–না, সেটা জানলুম তোমার এখানে রোগশয্যায় শুয়ে শুয়ে। তোমরা পাশের ঘরে যা-সব কথা বলতে সব আমার কানে আসতো। তোমাদের কথাবার্তা শুনেই আমি জানতে পেরেছিলুম নিখিলেশবাবুর সঙ্গে তোমার বিয়ে হয়ে গিয়েছে, তিনি তোমাকে চাকরি করে দিয়েছেন, তুমি আমার জন্যে তোমার গলার হার বাঁধা দিয়ে আমার চিকিৎসার খরচ চালাচ্ছো–
–আমার বিয়ের কথা শুনে কি তোমার খুব কষ্ট হয়েছিল?
সদানন্দ বললে–না, বরং শুনে আনন্দই হয়েছিল।
–আনন্দ হয়েছিল?
–হ্যাঁ, তা আনন্দ হবে না? আমি তোমাকে স্ত্রীর প্রাপ্য মর্যাদা দিতে না পারলেও অন্য একজন কেউ তোমাকে সেই মর্যাদা দিয়েছে এ জানতে পারলে আনন্দ হবে না?
কথাগুলো শুনে নয়নতারা কেমন গম্ভীর হয়ে গেল। সে মুখটা নিচু করে নিলে। বললে–না, তোমার ধারণা ভুল!
–ভুল?
–হ্যাঁ, তুমি জানো না তাই ও-কথা বলছ। জানলে আর বলতে না। স্ত্রীর মর্যাদা পাওয়া আমার কপালে নেই।
সদানন্দ অবাক হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলে-–কেন নিখিলেশবাবু তো বেশ ভালো লোক। তিনি নিজে তোমাকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন, পরীক্ষায় পাস করিয়েছেন, পাস করে তোমাকে চাকরি করে দিয়েছেন। তিনি তোমার জন্যে যা করেছেন তা ক’জন স্বামী করে? সেদিক থেকে তিনি তো আমার চেয়ে তোমার অনেক ভালো স্বামী–
নয়নতারা বললে–না, তুমি জানো না ও যা-কিছু করেছে সব ওর নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্যে। আমাকে লেখাপড়া শিখিয়েছে, আমাকে একজামিনে পাস করিয়ে চাকরি করে দিয়েছে, আমাকে বিয়ে করেছে, সবই করেছে বটে, কিন্তু এখন বুঝতে পারছি সব ওর নিজের স্বার্থে–
সদানন্দ বললে–কেন, এতে নিখিলেশবাবুর স্বার্থটা কী?
–স্বার্থ টাকা?
–টাকা!
নয়নতারা বললে–হ্যাঁ, আমি আগে জানতুম না। আগে বুঝতে পারিনি। বুঝলুম তোমাকে এ বাড়িতে নিয়ে আসবার পর। তোমাকে দেখে ওর মনে প্রথমেই টাকা খরচের কথাটা উঠলো। প্রথমেই বললে–তোমাকে হাসপাতাকে পাঠিয়ে দিলুম না কেন। আচ্ছা, তুমিই বলো তো, মানুষের প্রাণটা বড়, না টাকা বড়? ও কী করে বলতে পারলে তোমাকে হাসপাতালে পাঠাবার কথা? হাসপাতালে পাঠালে কি তুমি বাঁচতে? সেখানে মাইনে করা নার্স দিয়ে কি তোমার সত্যিকারের সেবা হতো?
তারপর একটু থেমে বললে–তারপর যখন তোমাকে দেখাশোনা করবার জন্যে আমার অফিস কামাই করতে হলো তখন ওর সে কী রাগ! রাগ কেন বুঝতে পারলে তো?
–না।
–রাগ এইজন্যে যে আমার মাইনে কাটা যাচ্ছে। আসলে আমার টাকাটার ওপরেই ওর যত লোভ, আমার ওপরে ওর লোভ নেই। জিনিসটা যত দেখতে লাগলুম ততই আমার খারাপ লাগতে লাগলো। মনে হলো তাহলে এতদিন আমি যা-কিছু ভেবেছি সব ভুল। মনে হলো আমি এমন একটা লোকের হাতে পড়লুম যে আমাকে টাকা উপায়ের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। তোমার অসুখের সময় কিছু টাকা খরচ হয়েছিল বলে আমার সঙ্গে কিছুদিন কথাই বলেনি, এত রাগ হয়েছিল ওর! শেষে একদিন ও বলে গেল ও নবাবগঞ্জে যাবে–
–নবাবগঞ্জে? কেন?
–আমার গয়নাগুলো তোমার কাছ থেকে চেয়ে আনবে বলে।
–তোমার গয়না?
নয়নতারা বললে–হ্যাঁ, কিন্তু আসলে সব মিথ্যে কথা। ওই করে মিথ্যে কথা বলে আমাকে ভোলাতে চেয়েছিল। আসলে টাকার ওপরেই ওর যত লোভ তা জানো! ও তো জানত আমার বিয়ের সময় আমি কত গয়না পেয়েছিলুম! তাই আমাকে পেয়ে ওর লোভ মেটেনি, ওই গয়নাগুলো পেলে তবে ওর মনে শান্তি হতো। এতদিনে বুঝতে পারলুম যে আমার গয়নাগুলোর ওপরই ওর যত লোভ ছিল–
সদানন্দ চুপ করে রইল। নয়নতারা বললে–কই, তুমি কিছু কথা বলছে না যে?
সদানন্দ বললে–আমি এ ব্যাপারে কী বলবো!
–কিন্তু তুমিই তো এখুনি বলছিলে আমি খুব সুখে আছি। এখন আমার সুখের নমুনা শুনলে তো! আমি যে এখানে কত সুখে আছি তা তো জানতে পারলে? এর পরেও তুমি বলবে আমি সুখে আছি? আর তারপর নবাবগঞ্জ থেকে এসে ও কি বললে জানো?
নিখিলেশবাবু কি সত্যি-সত্যিই নবাবগঞ্জ গিয়েছিলেন নাকি?
নয়নতারা বললে–না, আসলে যায় নি তো! কিন্তু মিছিমিছি কোথা থেকে ঘুরে এসে আমাকে বললে–নবাবগঞ্জে গিয়েছিল। এসে বললে যে তুমি নাকি আবার বিয়ে করেছ! আর এমনই আমার পোড়া কপাল যে আমিও ওর সেকথা বিশ্বাস করলুম।
–বিশ্বাস করলে?
–না বিশ্বাস করে করবো কী বলো? আমিও যে তখন সন্দেহের দোলায় দুলছি। তুমি হঠাৎ আমাদের বাড়ি থেকে না বলে চলে যাওয়ার পর থেকে আমার যে সে মনের কী অবস্থা তা যদি তুমি জানতে! তোমার খবর জানবার জন্যে আমি যে তখন কী ছটফটই না করছি! অসুখ শরীর নিয়ে তুমি চলে গেলে, আর আমার ভাবনা হবে না? কেন তুমি অমন করে আমাকে না-জানিয়ে চলে গেলে বলো তো? আমাকে বলে গেলে তোমার কী এমন ক্ষতিটা হতো? আমি কি তোমাকে জোর করে ধরে রাখতুম? না তোমায় জোর করে ধরে রাখবার অধিকার আমার আছে। আমি তোমার কে বলো না যে আমার কথা তুমি রাখতে যাবে?
সদানন্দ কথার মধ্যেখানে হঠাৎ বললে–কটা বাজলো? কই, নিখিলেশবাবু তো এখনও আসছেন না!
