সদানন্দ বললে,–না তুমি ভুল বলছো। তুমি সব জেনেও আমাকেই দোষী করছে। আমি কী স্বাভাবিক হতে চাইনি? আমি কী আর পাঁচজনের মত বিয়ে করে সুখে সংসার করতে চাইনি? আমি কী চাইনি যে আর সবাই যেমন সুখ-দুঃখে পৃথিবীতে বেঁচে থাকে, পাপ-পূণ্য ভালো-মন্দ নিয়ে সংসার করে, তেমনি আমিও করি? আমি তো তাই-ই চেয়েছিলুম।
নয়নতারা বললে–তাই করলেই তো ভালো হতো, তাহলে আমার জীবনটা আর এমন করে নষ্ট হয়ে যেত না–
সদানন্দ অবাক হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলে–নষ্ট? তোমার জীবন নষ্ট হয়ে গেছে?
–নষ্ট হয়নি?
–কেন, তুমি তো আমার হাত থেকে মুক্তি পেয়ে গিয়ে বেঁচেছ। তুমি আমার চেয়ে ভালো স্বামী পেয়েছ, তিনি তোমায় লেখাপড়া শিখিয়ে ভালো চাকরি করিয়ে দিয়েছেন। তুমি তো বেশ সুখেই কাটাচ্ছ। তোমার জীবন নষ্টটা হলো কোথায়? বরং আমার স্ত্রী হয়ে থাকলে তো সেই শ্বশুর-শাশুড়ীর তাঁবে থেকে সারাদিন ঘোমটায় মুখ ঢেকে কাটাতে হতো, সূর্যের মুখ পর্যন্ত দেখতে পেতে না। এমন করে স্বাধীন ভাবে রাস্তায়-ঘাটে-ট্রেনে যখন যেখানে খুশী ঘুরতেও পারতে না। বিয়ে করে তুমি বেশ ভালোই আছে–
নয়নতারা চোখ দুটো ছল-ছল করে উঠলো।
বললে–বাইরে থেকে সবাই তাই-ই ভাবে–
সদানন্দ বললে–তুমি ঠিকই বলেছ নয়নতারা, বাইরে থেকে যা দেখি সেটা মোটেই আসল দেখা নয়। কিন্তু সংসারে সবাই সবাইকে আমরা বাইরে থেকে দেখেই তো বিচার করি। তাই তো আমি সকলের চোখে পাগল। তোমার মত স্ত্রী পেয়েও আমি তোমার সঙ্গে সংসার-ধর্ম করলুম না, এও বাইরের লোকের কাছে একরকম পাগলামিই বই কী।
নয়নতারা এ-কথার জবাবে কিছুই বললে না, শুধু চুপ করে রইল।
সদানন্দ বললে–কিন্তু বাইরের লোকে যা-ই বলুক, আজ তোমাকেই আমি জিজ্ঞেস করি, তুমিও কি আমাকে তা-ই বলবে? আমার এ-সব কাজকে কি তুমিও পাগলামি বলবে?
তবু নয়নতারা কোনও উত্তর দিলে না।
সদানন্দ বলতে লাগলো, জবাব দাও? অমন করে চুপ করে থেকো না, একটা কিছু বলো তুমি!
নয়নতারা বললে–আমি কী বলবো?
সদানন্দ বললে–কেন, বলতে পারো না কেন কপিল পায়রাপোড়া গলায় দড়ি দিয়ে মরে? কেন মানিক ঘোষ, ফটিক প্রামাণিক চৌধুরীদের অত্যাচারে পাগল হয়ে যায়? কেন আমাদের ফুলশয্যার রাত্রে কালীগঞ্জের বউ খুন হয়ে যায়? কী দোষ করেছিল তারা? কার সুখ-শান্তির পথে তারা কাঁটা হয়েছিল? তাদের সর্বনাশের জন্যে কারা দায়ী? কে তার দায়ভাগ নেবে? কে তার প্রায়শ্চিত্ত করবে?
নয়নতারা এতক্ষণে কথা বললে। জিজ্ঞেস করলে–তা এত লোক থাকতে অন্যের পাপের দায় তুমি নিতে যাবে কেন?
সদানন্দ বললে–তা আমি যদি না নিই তো কে সে দায় নেবে?
–কেন, আর কেউ নেই? মাথার ওপর তো ভগবান আছে। তিনি তো সব দেখছেন, তিনিই তার বিচার করবেন।
–কিন্তু তুমি কি বলতে চাও ভগবানের ওপর সব ভার ছেড়ে দিয়ে আমরা নিশ্চিন্ত থাকবো? তাহলে তোমার সেই ভগবান আমাদের বুদ্ধিই বা দিয়েছেন কেন? বিচার শক্তি দিয়েছেন কেন?
নয়নতারা বললে–ওই যাঃ দেখেছ, কথা বলতে বলতে একেবারে ভুলে গিয়েছি, তুমি বোস, তোমার জন্যে কিছু খাবার নিয়ে আসি–
সদানন্দ বললে–না, তার দরকার নেই, একদিন এখানে এসে তোমাদের ওপর অনেক অত্যাচার করে গিয়েছি, তার প্রায়শ্চিত্ত করতেই আমি নিখিলেশবাবুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলুম। তিনি যখন নেই, তখন আর কী করবো, আর একদিন বরং আসবো, এখন আমি যাই–
বলে সদানন্দ উঠে দাঁড়াচ্ছিল, কিন্তু নয়নতারা উঠতে দিলে না। জোর করে বসিয়ে দিলে। বললে–না, তুমি বোস, তোমার সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে–
–কথা? আমার সঙ্গে?
নয়নতারা বললে–হ্যাঁ, তোমার সঙ্গে কথা বলার এমন সুযোগ হয়ত আর কোনও দিন কখনও আসবে না। আর ঠিক এমন দিনে তুমি এসেছ যখন আমিও অফিসে যাইনি, বাড়িতে একলা রয়েছি–
সদানন্দ বললে–সত্যিই তো, অফিসে যাওনিই বা কেন?
নয়নতারা বললে–সেই কথা বলবার জন্যেই তো আমি তোমাকে বসতে বলছি, জানো, আমি আর কোনও দিন অফিসে যাবোও না–
–সে কী? অফিসে যাবে না কেন?
নয়নতারা বললে–আর তা ছাড়া তুমি একটু পরে এলে হয়ত আমার সঙ্গে তোমার দেখাও হতো না–আমি এবাড়ি ছেড়ে এখুনি চলেই যাচ্ছিলুম। এই দেখো, আমার কটা কাপড় ব্লাউজ এই ব্যাগটায় পুরে নিয়ে বাড়ি থেকে এখুনি বেরিয়েই যাচ্ছিলুম। উঠোনে নেমে সবে সদর-দরজাটা খুলতে যাচ্ছিলুম, এমন সময় তোমার কড়া নড়ে উঠলো–এমন কি আমি চলে যাবো বলে আমার ঝিকে পর্যন্ত বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছি, তা জানো–
সদানন্দ বললে–কেন? কোথায় যাচ্ছিলে?
নয়নতারা বললে–জানি না কোথায় যাচ্ছিলুম, এখন আমার এমন অবস্থা হয়েছে যে নরকে যেতেও আমার আপত্তি নেই, এর চেয়ে নরকও বুঝি আমার কাছে ঢের ভালো–
সদানন্দ যেন স্তম্ভিত হয়ে গেল। বললে–হঠাৎ তোমার মনের অবস্থা এরকম হলোই বা কেন?
নয়নতারা বললে–তোমার জন্যে।
–আমার জন্যে?
–হ্যাঁ, সব তোমার জন্যে।
সদানন্দ বললে–কিন্তু আমি কী দোষ করলুম? তোমাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনও বিরোধ বাধে এমন কিছু করবার কল্পনাও তো আমি কখনও করিনি। আমি যখন ট্রেনের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলুম তখন তুমি নিজেই তো আমাকে এখানে তোমার বাড়িতে এনে তুলেছিলে। তখন আমার জ্ঞান থাকলে আমি কিছুতেই আসতুম না। রাস্তায় বরং মরে পড়ে থাকতুম তবু তোমার এখানে আসতুম না–
