একটা চিঠি অবশ্য লিখে রেখে গেলে হতো। কিন্তু না, কেন লিখতে যাবে, কাকে লিখতে যাবে? নিখিলেশকে? নিখিলেশ তার কে? কেউ না–
হঠাৎ বাইরে দরজার কড়া নড়ে উঠলো। এই অসময়ে আবার কে এল! গিরিবালা নাকি? গিরিবালা হয়ত কোনও জিনিস সঙ্গে নিয়ে যেতে ভুলে গেছে। সেটা নিতে এসেছে।
–কে? গিরিবালা?
সঙ্গে সঙ্গে দরজাটা খুলে দিতেই অবাক হয়ে গেছে নয়নতারা। সামনেই দাঁড়িয়ে আছে সদানন্দ!
সদানন্দকে হঠাৎ দেখে নয়নতারা স্তম্ভিত হয়ে গেছে। সেই মুহূর্তে কোনও কথাই তার মুখ দিয়ে বেরোতে পারলো না।
কিন্তু সদানন্দ নিজেই আগে কথা বললে–বড় অসময়ে এসে পড়েছি আমি—
তারপর নয়নতারার শাড়ি সাজগোজ দেখে কী একটা অনুমান করলে। বললে– তুমিও কোথাও বেরোচ্ছিলে নাকি?
তবু নয়নতারার মুখে কোনও কথা নেই। হাতের কাপড়ের ব্যাগটা সে তখন লুকোতে ব্যস্ত।
সদানন্দ আবার জিজ্ঞেস করলে–আমি সকালবেলার ট্রেনেই আসতে চেয়েছিলুম, কিন্তু রেলবাজার থেকে সে ট্রেনটা ধরতে পারিনি। তা তুমি বুঝি আজকে অফিসে যাওনি?
নয়নতারা পেছন ফিরে নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে বললে–এসো, ভেতরে এসো–
সদানন্দ জিজ্ঞেস করলে–নিখিলেশবাবু? নিখিলেশবাবু কোথায়?
–তাঁর আসতে একটু দেরি আছে–তুমি এসো—
বলে নয়নতারা সোজা নিজের ঘরের মধ্যে গিয়ে ঢুকেছে। সদানন্দকেও যেতে হলো তার পেছন পেছন। সদানন্দকে একটা চেয়ারে বসতে বলে নয়নতারা একটু দূরে আলমারিটার কোল ঘেঁষে দাঁড়ালো। বললে–তোমাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে–তোমার শরীর কেমন আছে?
সদানন্দ বললে—ভালো—
নয়নতারা বললে–কই, তুমি বসছো না যে, বোস, এই চেয়ারটাতে বোস—
সদানন্দ বললে–আমি বসতে আসিনি, শুধু দুটো কথা বলে চলে যাবো।
নয়নতারা বললে–এতদূর থেকে এসেছে, একটু বসবে না?
সদানন্দ বললে–কিন্তু তুমি যে দাঁড়িয়ে রইলে–
নয়নতারা বললে–আমি না বসলে বুঝি তোমার বসতে নেই! আচ্ছা এই আমি বসছি, হলো তো! এবার তুমি বোস–
সদানন্দ এবার বসলো। বললে–সত্যি বলছি আমি তোমার এখানে বসবো বলে আসিনি। আর তা ছাড়া…
নয়নতারা বললে–তা ছাড়া কী? বলতে বলতে থেমে গেলে যে?
সদানন্দ বললে–তা ছাড়া এখন এখানে বসবার অধিকারও তো আমার নেই—
নয়নতারা স্বীকার করলে–তা অবশ্য নেই। কিন্তু এককালে তো সে অধিকার ছিল।
সদানন্দ বললে–তা হয়ত ছিল–
–আবার ‘হয়ত’ বলছো কেন? এককালে আমাকে সাত পাকে বেঁধে তুমি তো আমার ওপর তোমার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলে!
সদানন্দ বললে–সে-সব পুরোন কথা এখন কেন আবার তুলছো?
নয়নতারা বললে–ঠিক বলেছ, তবে তুমি অধিকারের কথা তুললে বলেই আমায় এত কথা বলতে হলো।
সদানন্দ বললে–এতদিন পরেও দেখছি তুমি কিছু ভুলে যাওনি–
নয়নতারা বললে–পুরুষমানুষ হলে অবশ্য ভুলেই যেতুম। কিন্তু মেয়েমানুষ হয়ে জন্মেছি, ভুলবো কী করে বলো!
সদানন্দ বললে–আমি কিন্তু ভুলে যাইনি, পুরুষমানুষ হলেও আমি কিছুই ভুলতে পারিনি–
নয়নতারা বললে–তুমি মহানুভব, মহাপুরুষ, তোমার সঙ্গে কার তুলনা!
সদানন্দ বললে–শেষকালে তুমিও আমাকে ঠাট্টা করতে আরম্ভ করলে, আমাকে ভুল বুঝলে?
নয়নতারা বললে–ছিঃ, এত কাণ্ডের পরেও আমার সম্বন্ধে তোমার এই ধারণা?
সদানন্দ সেকথার উত্তর না দিয়ে অন্য কথা জিজ্ঞেস করলে–নিখিলেশবাবু কোথায়?
নয়নতারা বললে–দেখছি তুমি আমার কথা এড়িয়ে যেতে চাইছো!
–এড়াচ্ছি না, শুধু জিজ্ঞেস করছি নিখিলেশবাবু কোথায়?
–একবার তো বলেছি সে অফিসে গেছে, তার অফিস থেকে আসতে দেরি হবে, তবু আবার সেই একই কথা জিজ্ঞেস করছো কেন? অফিসে যারা যায় তারা কী দুপুরবেলা বাড়ি থাকে। তুমি কী তার সঙ্গেই দেখা করতে এসেছ?
সদানন্দ বললে–হ্যাঁ, তাঁর সঙ্গেও আমার দরকার ছিল। তোমার সঙ্গেও আমার দরকার।
নয়নতারা বললে–তা তার সঙ্গে দরকার থাকলে ভোরবেলা এলেই পারতে–
–তা তো আসতে পারতুম। কিন্তু ওই যে বললুম, যেখানে গিয়েছিলুম সেখানে একটু দেরি হয়ে গেল বলে আগের ট্রেনটা ধরতে পারলুম না। ভেবেছিলুম তোমাদের কারো সঙ্গে দেখা হবে না। কারণ আমি জানতুম তুমিও অফিসে যাও–
–তাহলে এ সময়ে আসতে গেলে কেন?
–ভেবেছিলুম, স্টেশনের প্ল্যাটফরমে আর কতক্ষণ অপেক্ষা করবো, তার চেয়ে তোমার বাড়িতে এসে তোমার ঝি-এর হাতে একটা চিঠি লিখে রেখে দিয়ে চলে যাবো।
–চিঠি?
–হ্যাঁ, একটা চিঠিতে সব কিছু কথা লিখে রেখে চলে যাবার ইচ্ছেই ছিল। কিন্তু ঘটনাচক্রে তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।
নয়নতারা বললে–দেখা হয়ে খুবই খারাপ হলো না?
সদানন্দ বললে–কেন, খারাপ কেন হতে যাবে?
নয়নতারা বললে–দেখা না হলে আমার মুখ দেখবার দায় এড়াতে পারতে–
সদানন্দ বললে–অমন করে কথা বলছো কেন? তোমার মুখ দেখতে কী আমার ভালো লাগে না?
–ভালো লাগে? সত্যিই বলছো ভালো লাগে?
সদানন্দ বললে–-থাক, ও-সব কথা থাক।
নয়নতারা বললে–না, ও-সব কথা থাকবে কেন? বলো আমার মুখ দেখতে তোমার ভালো লাগে কিনা। বলো–
সদানন্দ বললে–ওকথা বার বার জিজ্ঞেস করো না–
–কেন, জিজ্ঞেস করলে দোষ কী?
সদানন্দ বললে–না, জিজ্ঞেস করতে নেই—
নয়নতারা বললে–কেন জিজ্ঞেস করতে নেই? আমার বিয়ে হয়ে গেছে বলে?
সদানন্দ বললে–আমার এসব কথা বলতে ভালো লাগছে না। তুমি তো জানো আমার জীবনটাই অভিশপ্ত।
নয়নতারা বললে–তার জন্যে তো তুমি নিজেই দায়ী।
