একজনকে জিজ্ঞেস করলে–হ্যাঁ মশাই, আমার পাশে ফর্সা লম্বা মতন এক ভদ্রলোক বসে ছিলেন, তিনি কোথায় গেলেন বলতে পারেন?
কেউ বলতে পারলে না। যে যার নিজের ধান্দা নিয়ে ব্যস্ত, কে আর খবর রাখতে যাবে পরের ব্যাপার। বললে–না মশাই, আমি দেখিনি–
কিন্তু একজন ভদ্রলোক দেখেছিলে। বললে–আপনার পাশে বসে ছিলেন তো? লম্বা ফর্সা গায়ের রং? হ্যাঁ হ্যাঁ, তিনি তো একটা স্টেশন আসতেই নেমে গেলেন–
–কোন্ ইস্টিশানে নেবে গেলেন? কোন্ ইস্টিশানে বলুন তো?
ভদ্রলোক বললে–তা তো মনে নেই—
প্রকাশ মামার মনে হলো পরের স্টেশনেই সে নেমে যাবে। কিন্তু সেখানে নেমেই বা কী হবে? কোথায় খুঁজবে তাকে? তার চেয়ে কলকাতায় চলে যাওয়াই ভালো। কলকাতায় গিয়ে বরং সেই ধর্মশালায় গিয়ে খোঁজ নেবে। যেখানেই সদা যাক, শেষ পর্যন্ত সেই ধর্মশালাতে তো তাকে যেতেই হবে।
শেয়ালদা স্টেশনে নেমে আর কোথাও দাঁড়ালো না প্রকাশ মামা। একটা ট্রাম ধরে সোজা একেবারে বড়বাজারে গিয়ে নামলো। বড়বাজারের ট্রামরাস্তায় নেমে সেখান থেকে। সোজা পাথুরেপটির ধর্মশালাতে–
–পাঁড়েজী, পাঁড়েজী—
বলে ডাকতে ডাকতে প্রকাশ মামা একেবারে ধর্মশালার ভেতরে গিয়ে ঢুকে পড়লো।
পাঁড়েজী বেরিয়ে এসে বললে–বাবুজী এসেছে?
প্রকাশ মামা বললে–আমি আগে এসে পড়লুম, পরে বাবুজী আসবে–
–কেন, বাবুজী কোথায় গেল?
প্রকাশ মামা বললে–আমাকে পাঠিয়ে দিয়ে বাবুজী পরে আসবে বললে–তা আমি তোমার এখানে ক’দিন থাকবো পাঁড়েজী। আমাকে তুমি চিনতে পেরেছ তো? আমি সেই তোমার বাবুজীর মামা, আমার নাম প্রকাশ মামা। কী করবো বলো, ভাগ্নেকে ফেলে তো আমি চলে যেতে পারি নে!
পাঁড়েজী বললে–তা থাকুন না, আমার তো ঘর খালি রয়েছে, আমি দরজা খুলে দিচ্ছি–
প্রকাশ মামা বললে–শুধু থাকতে দিলে তো চলবে না পাঁড়েজী, আমাকে একটু খেতেও দিও, আমি খাবো আর কোথায় বলো। তোমার কাছেই যা হোক দুটি খাবো–
–ঠিক আছে—
বলে পাঁড়েজী চলে গেল। কিন্তু প্রকাশ মামার মনে মনে কেমন যেন সন্দেহ হতে লাগলো। শেষ পর্যন্ত সদা এখানে আসবে তো! কিন্তু যদি না আসে? যদি অতগুলো টাকা কাউকে দিয়ে দেয়? মরতে কেন সে অমন করে ঘুমিয়ে পড়েছিল ট্রেনের মধ্যে! ঠিক ওই সময়েই কি ঘুমিয়ে পড়তে হয় রে! আর এক ঘণ্টা জেগে থাকলে তো এই সর্বনাশটা তার হতো না!
প্রকাশ মামা মনে মনে আবার মা কালীকে ডাকলে–মা, একটু দেখো মা, আমি বড় দুঃখী ছাপোষা মানুষ। আমার ছেলেমেয়ে বউ নিয়ে সংসার। আমি তোমাকে যে হিসেবটা দিয়েছি তা তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে মা। এক লাখ দিয়ে আমি একটা বাড়ি করবো, আর বাকি থাকলো তিন লাখ। সেই তিন লাখ টাকা ব্যাঙ্কে ফিক্সড ডিপোজিট রেখে দেব, তার থেকে হাজার তিনেক টাকার মতন সুদ আসবে মাসে। তখন সেই টাকার সুদ খাবো আর, আর একটা কথা–দিশী মাল আর খাবো না মা। আমি শুধু হুইস্কি খাবো। দিশী খেয়ে খেয়ে আমার জিভে মরচে পড়ে গেছে মা, একেবারে মরচে পড়ে গেছে…
.
নৈহাটির বাড়িতে তখন নয়নতারা স্থির সিদ্ধান্ত করে ফেলেছে। সে সিদ্ধান্ত আর বদলাবে না সে। যে-মানুষ তার সঙ্গে মিথ্যাচার করেছে, যে-মানুষ তাকে পদে পদে ঠকিয়েছে, তার সঙ্গে আর কোনও মতে সে সংসার করবে না।
নিখিলেশ সকাল-বেলাই যথারীতি অফিসে চলে গিয়েছিল। বহুদিন ধরেই দু’জনের মধ্যে কোনও কথা হয়নি। না হোক, তাতে নয়নতারার কিছু আসে যায় না। কিন্তু আর সে এখানে থাকবে না। এখানে থাকা মানেই তো নিজেকে বিক্রি করে দেওয়া। তার চেয়ে এখান থেকে চলে গিয়ে সে মালাদের বোর্ডিং হাউসে গিয়ে উঠবে। জায়গা হয়ত নেই সেখানে। কিন্তু মালা তার বন্ধু, একটা জায়গা সে তাকে করে দেবেই।
কয়েকটা কাপড় সে খবরের কাগজ দিয়ে মুড়ে নিলে। আর কিছু তার সঙ্গে নেবার দরকার নেই। অফিস থেকে মাইনে নিয়ে বাকি জিনিসগুলো সে সময়মত কিনে নেবে। কীসের জন্যে এমন মানুষের সঙ্গে এখানে থাকা!
গিরিবালাকে ডেকে নয়নতারা বললে–গিরিবালা শোন, তুমি তোমার মেয়ের কাছে একটু যাবে বলছিলে না, আজকে যেতে পারো, আজকে আমার কোনও কাজ নেই, তুমি সন্ধ্যেবেলা এলেই আমার চলবে–
গিরিবালা খুব খুশী। তার মেয়ে অন্য একজনের বাড়িতে কাজ করে। বেশ কিছু দূরে। অনেক দিন মেয়েকে দেখেনি সে। তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে নিয়ে গিরিবালা চলে গেল। নয়নতারা সদর দরজা বন্ধ করে দিলে। তারপর শাড়িটাও বদলে নিলে। আর একটু পরেই সে বেরিয়ে যাবে। গিয়ে স্টেশন থেকে দুটোর ট্রেন ধরবে। সেখান থেকে একেবারে কলকাতায়।
দরজাটা অবশ্য খোলা পড়ে থাকবে। হয়ত চোর-ডাকাত ঢুকবে। তা ঢুকুক। এ সংসারে যখন সে আর থাকছে না তখন এখানে চুরি হলেই বা কী আর ডাকাতি হলেই বা কী! তার বয়ে গেল। একদিন নিখিলেশের জন্যে সে অনেক করেছে। তার যখন কোনও প্রতিদান সে পায়নি তখন আর তার নিখিলেশের জন্যে মায়া কীসের!
গিরিবালা অনেকক্ষণ হলো বেরিয়ে গেছে। নয়নতারা একটা ব্যাগের ভেতর কাপড়ের বাণ্ডিলটা পুরে নিয়ে উঠলো। তারপর উঠোনে এসে দাঁড়ালো। মাথার ওপরে ঝাঁ-ঝাঁ করছে রোদ। নয়নতারার মনের ভেতরেও সেই ঝাঁঝের ছোঁয়াচ এসে উত্তাল হয়ে উঠলো। যাক্, সমস্ত রসাতলে যাক, যাক্, আর কোনও শৃঙ্খল নেই তার কোথাও। গিরিবালা এসে হয়ত অবাক হয়ে যাবে। তারপর নিখিলেশ এসেও আরো অবাক হয়ে যাবে সব শুনে!
