বেহারি পাল তাড়াতাড়ি বাড়ির ভেতরে চলে এল। বললে–কই, ওগো শুনছো–
গিন্নী সংসারের কাজে ব্যস্ত ছিল। তাড়াতাড়ি ছুটে এল। বললে–কী হলো, এসেছে?
বেহারি পাল বললে–না, সে এল না–
–তা বললে না কেন দিদিমা একবার ডাকছে?
–বলেছিলুম। তা বললে–সময় নেই। বললে–এখান থেকে আরো অন্য অনেক জায়গায় যেতে হবে আবার।
–তা কী বললে সদা?
বেহারি পাল বললে–জানো, একেবারে দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ হয়ে উঠেছে সদা—
–কী রকম?
–আহা, শুনলেও গর্ব হয়। বাপের আর দাদামশাই-এর অনেক টাকা পেয়েছে তো। সেই টাকাগুলো সব গাঁয়ের কাজে দিয়ে গেল। বললে–এসব আপনাদেরই টাকা, আপনাদেরই ভালোর জন্যে খরচ করবো এখানে। একটা ইস্কুল একটা কলেজ আর একটা হাসপাতাল করে দেবে বললে। গাঁয়ের ছেলেদের লেখাপড়া করার অসুবিধে, অসুখ-বিসুখ হলে দেখবার কেউ নেই–
বেহারি পালের বউএর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। বললে–তা তুমি একবার তাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতে পারলে না? আমি একবার তাকে চোখের দেখা দেখতুম। তা নয়নতারার কথা সে জানে? কিছু বললে সে?
বেহারি পাল বললে–সে জানে। নয়নতারা আবার বিয়ে করেছে তাও জানে! তার বউ এর কথাও তো সকলের সামনে দাঁড়িয়েই বললে।
–তা বললে না কেন যে, নয়নতারা তাকে খুঁজতে এসেছিল?
বেহারি পাল বললে–তাকে কি একলা পেলুম যে, তার সঙ্গে কথা বলবো? সেই চৌধুরী মশাই-এর শালাবাবু সে তো সব সময়ে তাকে আগলে-আগলে রয়েছে। একলা যে বাড়িতে তাকে নিয়ে আসবো, নিরিবিলিতে দুটো কথা বলবো তারও তো উপায় নেই। সে তো খুব রাগারাগি করছে
–কেন গো? রাগারাগি করছে কেন?
বেহারি পাল বললে–রাগারাগি করবে না? সে তো টাকাগুলো মারবার মতলব করেছিল, মারতে পারলে না বলে এখন গজরাচ্ছে। এই যে চার লাখ টাকা গাঁয়ের লোকের ভালোর জন্যে সদা দিলে এটা তো তার ভালো লাগলো না—
৩.৮ টাকার সদ্ব্যবহার
হায় রে, টাকা দান করা আর সেই টাকার সদ্ব্যবহার হওয়া সে এক জিনিস নয় তা যদি সদানন্দ জানতো! সংসারে যারা সদানন্দ হয়ে জন্মায় তারা বোধ হয় তা জানতে পারেও না। সদানন্দরা যখন দান করে তখন তার ভালো-মন্দ খতিয়ে না-দেখেই দান করে। খতিয়ে দেখে কারা? যারা রাজনীতি করে। কিন্তু সদানন্দরা যে শুধু বিদ্রোহ করতেই জানে, রাজনীতি করবার জন্যে তো সংসারে প্রকাশ মামারাই আছে!
তাই প্রকাশ মামা তখনও সদানন্দর পেছন পেছন চলেছে। তখনও তার পেছু ছাড়েনি সে। নবাবগঞ্জ থেকে হেঁটে গিয়ে দুজনে বাসে উঠেছে। তখনও তার মুখে ওই একই কথা হ্যাঁ রে, টাকাগুলো তুই এইভাবে নয়-ছয় করে ফেলবি? জামাইবাবু কত করে টাকা উপায় করে গিয়েছিল, আর সে টাকা দিয়ে তুই এই ভূত-ভোজন করাবি।
সদানন্দ বললে–তুমি আমার সঙ্গে কেন ঘুরছে মামা? তোমাকে তো আমি বলেছি টাকা তুমি পাবে না
প্রকাশ মামা বললে–কেন পাবো না? নবাবগঞ্জের ওই ছোটলোকগুলোকে অতগুলো টাকা দিতে পারলি আর আমি তোর মামা হই, আমাকে দিতে পারবি না? আমি তোর কেউই নয় রে? ছোটবেলা থেকে তোকে আমি কত আদর করেছি, কত জায়গায় বেড়াতে নিয়ে গিয়েছি, সব তুই একদম ভুলে মেরে দিলি?
সদানন্দ বললে–তোমাকে আমি টাকা দেব না, আমি রাধাকে টাকা দেব।
–রাধা!
–হ্যাঁ, যাকে তুমি তার বাড়ি থেকে ফুসলে নিয়ে এসে রাণাঘাটের বাজারের বস্তিতে রেখেছিলে।
–সে-সব কথা তুই জানলি কি করে?
সদানন্দ বললে–আমি একদিন রাধার বাড়িতে গিয়েছিলুম, তখন সে আমাকে সব বলেছে। তাকে আমি কিছু টাকা দিয়ে যাবো।
প্রকাশ মামা হেসে উঠলো হো হো করে। বললে–কিন্তু তাকে আর তুই খুঁজে পাবি কী করে রে?
–কেন? রাণাঘাটে গিয়ে?
প্রকাশ মামা বললে–আরে সে তো মারা গেছে কবে। কবে মরে ভূত হয়ে গেছে। বরঞ্চ তার টাকাগুলো তুই আমাকে দে। আমাকে দিলেই তাকে দেওয়া হয়ে যাবে!
কথাগুলো বলে এত জোরে হেসে উঠলো যে, মনে হলো প্রকাশ মামা যেন মৃত্যুকেও ব্যঙ্গ করছে। প্রকাশ মামার কাছে চিরকাল জন্ম-মৃত্যু সব কিছুই ব্যাঙ্গের জিনিস। জীবনটাই প্রকাশ মামার কাছে একটা প্রহসন। প্রকাশ মামার কাছে একটা জিনিসই কেবল সত্যি, তা হলো টাকা। টাকাই প্রকাশ মামা সারা জীবন চেয়েছে, আর সেই টাকাটাই প্রকাশ মামা পায়নি। পায়নি বলে টাকাটাকেই সারা জীবন ভজনা করে চলেছে।
ক’দিন ধরে পরিশ্রম হচ্ছিল খুব। কোথায় সেই কোর্ট, কোথায় ব্যাঙ্ক, আর কোথায় উকিল মুহুরি, ম্যাজিস্ট্রেট, কলকাতা, নবাবগঞ্জ। কোথায় কখন ঘুমিয়েছে, কোথায় কী খেয়েছে, কিছুরই কিছু ঠিক ছিল না। কখন যে সদানন্দ কোথায় যাবে তারও কোনও ঠিক নেই। অথচ অতগুলো টাকা পেয়েছে, তাকে একলা ছেড়ে দেওয়া যায় না। যাকে হাতের কাছে পাবে তাকেই হয়তো টাকাগুলো বিলিয়ে দেবে। অথচ হায় রে পোড়া কপাল, পাশেই এত বড় একটা অভাবী লোক রয়েছে তার দিকে একবার ফিরেও তাকাচ্ছে না সদানন্দ।
ভাবতে ভাবতে প্রকাশ মামা কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল খেয়াল ছিল না। হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে যেতেই ধড়মড় করে উঠে বসেছে। কোথায় গেল সদানন্দ! সদানন্দ কোথায় গেল!
মনে আছে সদানন্দর সঙ্গে সে রেলবাজার স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠেছিল। তারপর চলন্ত ট্রেনের দোলানিতে কখন সে অকাতরে ঘুমিয়ে পড়েছিল জানতে পারেনি। ট্রেনটা তখনও চলছে। আশেপাশের লোকগুলোর দিকে চেয়ে দেখল সে। সবাই রয়েছে, শুধু সে-ই নেই।
