বলে সদানন্দ শেয়ালদা থেকে ট্রেন ধরে এই নবাবগঞ্জে এসেছিল, প্রকাশ মামাও সঙ্গে সঙ্গে এসেছিল।
নবাবগঞ্জের খাওয়া-দাওয়ার বহর দেখে প্রকাশ মামা সদানন্দর কাছে এসে বললে– এ সব কী করছিস রে তুই? নাঃ, দেখছি শেষ পর্যন্ত টাকাগুলো তুই নয়-ছয় করে ফেলবি। শেষকালে তুই এই ভূত-ভোজন করাচ্ছিস–
তা প্রকাশ মামা যা ভয় করেছিল সদানন্দ তা-ই করলে। তারিণী চক্রবর্তী, বেহারি পাল তো ছিলই, গ্রামের আরো যত গণ্যমান্য লোক ছিল সদানন্দ তাদের সকলকে বারোয়ারিতলায় ডাকিয়ে আনলে। তারপর তাদের সামনে সদানন্দ যা প্রস্তাব করলে তাতে প্রকাশ মামা আরো অবাক।
সে এক রীতিমত নাটক বটে। নবাবগঞ্জে হাসপাতাল করে দেবে সদানন্দ, ইস্কুল করে দেবে। খরচের সমস্ত টাকা দেবে সদানন্দ।
সদানন্দ বললে–এ আমার টাকা নয় জ্যাঠামশাই, এ আপনাদেরই। আপনাদের মনে আছে বোধ হয় আমার ঠাকুরদাদার অত্যাচারে এই বটগাছের ডালে গলায় দড়ি দিয়ে মরেছিল কপিল পায়রাপোড়া। আপনারা জানেন কালীগঞ্জের হর্ষনাথ চক্রবর্তীর বিধবা স্ত্রীকে ঠকিয়ে আমার ঠাকুর্দাদা এই জমিদারি করেছিলেন তা আপনারা জানুন আর না-জানুন আমি সব জানি। আমি আজ আপনাদের যে-টাকা দিলুম এ সেই টাকা। এ আপনাদেরই টাকা আপনাদেরই দিলুম। এ-টাকা আমার নেবার কোনও অধিকার। নেই–
পাশে প্রকাশ মামা ছিল। তার তখন পাগল হতে শুধু বাকি।
বললে–সব টাকা তুই এদের দিয়ে দিলি?
তারিণী চক্রবর্তী বললে–আমি তখনই জানতুম বাবা, যে তোমার মত ছেলে হয় না, তুমি দীর্ঘজীবী হয়ে বেঁচে থাকো বাবা–আমি তোমাকে এই আর্শীবাদ করি–
সদানন্দ বললে–অমন আশীর্বাদ আমাকে করবেন না জ্যাঠামশাই, বেশিদিন বাঁচার চেয়ে যেন বেশি ভালো কাজ করতে পারি এই আশীর্বাদ করলে আমি মাথায় তুলে নেব। ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি নবাবগঞ্জের ছেলেরা ছ’ক্রোশ দূরে রেলবাজারের স্কুলে কলেজে পড়তে যায়, একটা হাসপাতাল নেই যে নবাবগঞ্জের লোকদের চিকিৎসা হয়। আমার বাবা বা ঠাকুরদাদা তা করে দিতে পারতেন, কিন্তু করেননি। অথচ এ টাকা তো আপনাদেরই টাকা জ্যাঠামশাই। আপনাদের ঠকিয়েই তো এত টাকা তাঁদের সিন্দুকে জমেছিল। তাঁরা এই টাকার জন্যে কাউকে ঠকিয়েছেন, কাউকে জমি থেকে উৎখাত করেছেন। আবার কাউকে বা বংশী ঢালীদের দিয়ে খুনও করিয়েছেন। টাকার জোরে তাঁরা আপনাদের কিছু কথা বলতে দেননি, তেমনি পুলিসের মুখও টাকা দিয়ে চাপা দিয়ে দিয়েছেন…
বলতে বলতে সদানন্দ আবেগে উদ্বেল হয়ে উঠলো। সে বলতে লাগলো–আমি যখন বিয়ের দিন বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলুম তখন আপনারা সবাই আমাকে পাগল বলেছিলেন। সবাই যা করেছে তার বিরুদ্ধে গেলেই বুঝি পাগলামি করা হয়? তেমনি ফুলশয্যার দিন আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে একঘরে রাত কাটাইনি, সেও কি তাহলে পাগলামি? অথচ সেদিন তো সবাই আপনারা আমাকে পাগলই বলেছিলেন। এই তো আমার পাশে এখন প্রকাশ মামা বসে আছে, একে আপনারা জিজ্ঞেস করুন এরা আমাকে পাগল বলেছে কি না? কিন্তু আমি আমার স্ত্রীকে স্ত্রী হিসেবে কেন গ্রহণ করিনি সে প্রশ্ন কি কখনও আপনাদের মনে জেগেছে? তা জাগেনি, কারণ আপনারা ধরে নিয়েছিলেন আমি পাগল। সবাই যা করে তা না করার নামই আপনাদের কাছে পাগলামি। আসলে আমি চাইনি যে আমাদের বংশ বৃদ্ধি হোক, আমি চাইনি যে অত্যাচারীর সংখ্যা বাড়ুক। আমি চেয়েছিলুম যে কালীগঞ্জের বউএর অভিশাপ সত্যি হোক, কালীগঞ্জের জমিদার হর্ষনাথ চক্রবর্তীর বিধবা স্ত্রী কর্তাবাবুকে নির্বংশ হওয়ার অভিশাপ দিয়ে গিয়েছিল তা ফলুক। আপনারা নিজেদের চোখেই দেখতে পাচ্ছেন যে সে অভিশাপ ফলেছে, কারণ আপনারা হয়ত জানেন না যে আমার স্ত্রী আবার বিয়ে করেছে, আর আমি জীবনে কখনও বিয়ে করতে পারবোও না, কারণ বিয়ে করলে কালীগঞ্জের বউএর অভিশাপ মিথ্যে হয়ে যাবে। সে অভিশাপ যাতে মিথ্যে হয়ে না যায় সেইজন্যেই আমি বিয়ে করবো না। উত্তরাধিকারসূত্রে এত টাকা পাওয়ার পরও না–
বেহারি পাল আর থাকতে পারলে না। বললে–ধন্য ছেলে বাবা তুমি তুমি ধন্য–
সদানন্দ বললে–না দাদামশাই, আমাকে অত প্রশংসা করলে চলবে না। আপনাদের ওপর এই কাজের ভার দিয়ে গেলুম। আপনারাও দেখা-শোনা সব করবেন। আমি কলকাতায় গিয়ে গভর্নমেন্টের দফতরে গিয়েও এর জন্যে যা করা দরকার তা করবো। চার লাখ টাকা আমার বরাদ্দ। দু’লাখ টাকা হাসপাতাল করার জন্যে আর দু’লাখ টাকা দেব স্কুল-কলেজ করবার জন্যে। এর জন্যে যে কমিটি হবে তাতে আপনারাই থাকবেন, আপনারাই হবেন কর্তা, মাথার ওপর থাকবে শুধু সরকার। আমি চাই এতদিন নবাবগঞ্জের লোক যে কষ্ট পেয়ে এসেছে, সে কষ্ট দূর হোক–আমি চাই নবাবগঞ্জের ছেলে-মেয়েরা যেন স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করে মানুষ হয়, নবাবগঞ্জের লোকেরা অসুখ-বিসুখে যেন হাসপাতালে ডাক্তারের সেবা পায়, ওষুধ-বিষুধ পায়–
ততক্ষণে বারোয়ারিতলায় ভিড় আরো বেড়ে গেছে। যারা ক্ষেত-খামারে কাজ করছিল তারাও এতক্ষণে এসে জুটলো।
একজন জিজ্ঞেস করলে–কী হয়েছে গো এখানে?
পাশের একজন বললে–এখানে ইস্কুল কলেজ হবে, হাসপাতাল হবে–চৌধুরী মশাই এর ছেলে চার লাখ টাকা দিয়ে এখানে সব কিছু করে দেবে–
সে এক রাজসূয় যজ্ঞের মত ধুমধাম শুরু হয়ে গেল চারদিকে। নবাবগঞ্জের কপালে এত সুখ হবে তা যেন কেউ কল্পনাই করতে পারছে না। একপাশে কেদার বসে আছে, নিতাই হালদার, গোপাল ষাট সবাই বসে আছে। তারাও শুনছিল। তাদের কাছেও এ যেন এক অভাবনীয় ঘটনা। একদিন এই সদানন্দর বউ-ই চৌধুরীদের বারবাড়িতে যে কেলেঙ্কারি করেছিল, তা দেখতেও সেদিন এমনি ভিড় হয়েছিল। কিন্তু তখন এমন আনন্দ হয়নি আজকের মত। বাহাদুর ছেলে বটে হে। লাখ-লাখ টাকার লোভ এমন করে ছেড়ে দিতে পারলে তো।
