কিন্তু সদানন্দর না-গেলে চলবে না, প্রকাশ মামা রাস্তার মোড় পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। বললে–ওরে সদা, তুইও ওখানে যাসনে, মাগী তোর টাকাগুলো সব নিয়ে নেবে
বাড়ির সামনে গিয়ে কড়া নাড়তেই মহেশ বেরিয়ে এল। সদানন্দকে দেখে সে অবাক হয়ে গেছে। এই ক’মাসের মধ্যেই দাদাবাবুর এ কী চেহারা! কত সুন্দর দেখাচ্ছে।
–কাকীমা কোথায় মহেশ?
মহেশের চোখ ছলছল করে উঠলো।
সদানন্দ বললে–কী হলো, কাকীমা ভালো আছে তো?
মহেশ বললে–-বেঁচে আছেন, এই পর্যন্ত দাদাবাবু–
সদানন্দ বললে–আমার একটা কাজ আছে তাঁর কাছে। দেখ, একদিন এই বাড়িতে কাকাবাবু-কাকীমার কাছে অনেক আদর পেয়েছিলুম তা তো তুমি জানো। সেদিন যে আমি এ বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলুম তার জন্যে দায়ী আমি নই মহেশ–
মহেশ বুঝতে পারলে না কথাগুলো। বললে–হ্যাঁ, তা আপনাকে তো বাবু অত করে থাকতে বলেছিলেন–
সদানন্দ বললে–হ্যাঁ, তবু থাকতে পারি নি। কাকাবাবুর দেওয়া সমস্ত সম্পত্তি আমি নিতে রাজি হই নি। কেন নিতে রাজি হই নি জানো?
–না।
–তোমাদের বাড়ির বউদিদিমণির কথা ভেবে। তার ভবিষ্যৎ আমি নষ্ট করতে চাই নি। তা আজকে আমি অনেক টাকার মালিক হয়েছি মহেশ, অনেক অনেক টাকা। এত টাকা আমার কোনও কাজে লাগবে না। তার থেকে কিছু টাকা আমি তার নাম করে কাকীমার হাতে দিয়ে যেতে চাই–
বউদিদিমণির নামে?
সদানন্দ বললে–হ্যাঁ, তিনি তো কারো সামনে বেরোন না, কাকীমার হাতে দিলে নিশ্চয়ই তার কাছে পৌঁছোবে!
মহেশ বললে–কিন্তু বউদিদিমণি তো আর নেই–
–নেই মানে? বলতে গিয়ে যেন মহেশের গলা আটকে গেল। একটু ধরা গলায় বললে–তিনি মারা গেছেন দাদাবাবু!
–মারা গেছেন? কবে?
–এই তো দু’মাস হলো। বিয়ে হওয়া এস্তোক তো জীবনে কখনও শান্তি পান নি তিনি–একদিন নিজের হাতেই নিজের প্রাণটা নিয়ে এলেন। আমরা কেউই জানতে পারি নি দাদাবাবু, যখন জানতে পারলুম দেখলুম তিনি আর কষ্ট সহ্য করতে না পেরে গলায় দড়ি দিয়েছেন–
সদানন্দ শুনে খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। অথচ বাঁচার কত শখ ছিল তার। নিজের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে কত সচেতন ছিলেন। সেই চিঠিটার কথাও মনে পড়লো সদানন্দর! অনেক রাত্রে দরজার তলার ফাঁক দিয়ে সেদিন চিঠিটা তার ঘরের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন সদানন্দ চৌধুরী বাড়ি থেকে বিদায় হয়ে গেলেই তার ভবিষ্যৎ নিরঙ্কুশ হয়ে যাবে।
–সেই থেকে মা-ও শয্যেশায়ী হয়ে পড়েছে। বাবু থাকলে তবু একটা কথা বলবার লোক থাকতো তাঁর। বড়দাদাবাবু তো আর মা’র নিজের ছেলে নয়, তা তো আপনি জানেন, ছোটবেলায় এই বড়দাদাবাবুকে বাবু পুষ্যি নিয়েছিলেন, ভেবেছিলেন নিজের ছেলে নেই, পুষ্যি ছেলেই নিজের ছেলের মত বাপ-মাকে দেখবে, তাই ছোটবেলাতেই ওঁর মেয়ের সঙ্গে বড়দাদাবাবুর বিয়ে দিয়েছিলেন–
সমস্তই জানতো সদানন্দ। সমস্তই তার মনে পড়তে লাগলো। হাতের মুঠোর মধ্যে টাকাগুলো তখনও কাঁটার মতন বিধছিল। এই কয়েক হাজার টাকা সে যার ভবিষ্যৎকে সুদৃঢ় করতে এসেছিল সে-ই কিনা নিজে থেকেই চলে গেল।
–আর ওই রাক্ষুসীকে ঘরে এনে তুলেছে বড়দাদাবাবু! সে-ই তো যত নষ্টের গোড়া! কিন্তু আমি তো কিছু বলতে পারি না। আমি পর। আমি বললেই লঙ্কাকাণ্ড বেধে যায়। তাই ভাবি ওই যদ্দিন মা আছেন তদ্দিন আমিও আছি দাদাবাবু, তারপর আমিও এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো–এখানে থাকতে আর আমার ভালো লাগে না–
–কী রে, এতক্ষণ কার সঙ্গে কথা বলছিলি?
হঠাৎ যেন সদানন্দর সম্বিৎ ফিরে এল। প্রকাশ মামাকে দেখে মনে পড়লো সে কখন রাস্তার মোড়ের কাছে এসে পড়েছে। মহেশের সঙ্গে কথা বলা কখন যে শেষ হয়েছে তা তার খেয়ালই ছিল না।
–মাসিকে দেখলি? মাসিকে ওখানে দেখলি নাকি?
সদানন্দ অন্যমনস্ক ছিল। তখনও তার মাথার ভেতরে মহেশের কথাগুলো তোলপাড় করছিল।
বললে–মাসি কে?
প্রকাশ মামা বললে–মাসিকে চিনিস না? সেই কালীঘাটের বস্তির বাড়িউলী মানদা মাসি, তোকে ধরে তোর চরণপূজো করেছিল রে। সেই মানদা মাসি তো ও বাড়িতে রয়েছে বড়বাবুর কাছ থেকে টাকা দুয়ে নেবে বলে। সেই ভয়েইে তো আমি তোর সঙ্গে গেলুম না? তা তোর কাছে টাকা চাইলে না মাসি?
–কীসের টাকা?
প্রকাশ মামা রেগে গেল। বললে–তুই এত কী ভাবছিস বল্ দিকিনি? কী এত আকাশ পাতাল ভাবছিস? তুই খুলে বল তো এখন কোথায় যাবি? আমি তো আর হাঁটতে পারছি না। সেই সুলতানপুর থেকে বেরিয়ে এত টো-টো করে ঘুরতে পারা যায়? এখন কোথায় যাবি তাই ঠিক করে বল্ তো আমাকে–
সদানন্দ বললে–তোমাকে আমার সঙ্গে ঘুরতে হবে না আর মামা। তুমি আমার সঙ্গে এলেই বা কেন?
–বা রে, তুই তো তাজ্জব কথা বললি? আমি তোর সঙ্গে ঘুরছি কেন? তা আমার ভাগের টাকাগুলো দিয়ে দে, আমি চলে যাচ্ছি–
সদানন্দ বললে–তোমাকে আমি টাকা দেব না মামা।
–তা টাকা দিবি না তো এতগুলো টাকা নিয়ে তুই করবি কী? তোর চাল-চুলো মাগ ছেলে কিছু তো নেই, এত টাকা তোর কী হবে?
সদানন্দ বললে–কী হবে তার জবাব আমি তোমাকে দেব না। আমি এখন নবাবগঞ্জে যাবো।
–নবাবগঞ্জে? নবাবগঞ্জে আবার কী করতে যাবি? সেখানে আবার কে আছে তোর? সে বাড়ি তো জামাইবাবু প্রাণকেষ্ট সা’কে বিক্রি করে দিয়েছে–
–তা হোক, আমার ইচ্ছে আমি নবাবগঞ্জে যাবো, তোমার তাতে কী?
