আগের দিন থেকেই আয়োজন শুরু হয়ে গিয়েছিল। ছোটমশাই-এর ছেলে এতদিন পরে গ্রামে এসেছে। গ্রামে আগেও একবার এসেছিল সে। কিন্তু এবার এ অন্যরকম আসা। এবার যে-যত পারো খাও নিতাই হালদার, কেদার সরকার, গোপাল ষাট, পরমেশ মৌলিক কেউ বাদ নেই। ছোটমশাই-এর শ্রাদ্ধের খাওয়াটা বাদ পড়ে গিয়েছিল। সেজন্যে অনেকেরই আফসোস ছিল এতদিন। এবার তাও মিটলো। কর্তাবাবুর নাতি বাপের সম্পত্তি পেয়েছে, লাখ-লাখ টাকার উত্তরাধিকারী হয়েছে! কিন্তু তবু গ্রামের কথা ভোলে নি।
প্রকাশ মামা সেই যে সুলতানপুর থেকে তার পেছু নিয়েছিল তার পর থেকে আর তার সঙ্গ ছাড়ে নি। তার মুখে কেবল একটাই কথা। সে কেবল একটা কথাই বলে চলেছে–সব টাকাটা তুই নিয়ে নিলি সদা?
সদানন্দ বলেছে–না, সবটা নেব না, তোমাকে দশটা টাকা দেব–
–দশ টাকা মাত্তোর? কেন?
সদানন্দ বললে–দশটা টাকা সেই ধর্মশালাতে তোমার কাছ থেকে নিয়ে ছিলুম, সেই টাকাটা।
প্রকাশ মামার মুখটা কালো হলে গেল। বললে–দশটা টাকা নিয়ে আমি কী করবো? তুই পেলি আট লাখ টাকা আর আমি মাত্তোর দশ টাকা? অন্ততঃ চার লাখ আমাকে দে! আমি যে চার লাখ টাকার হিসেব করে রেখে দিয়েছি। চার লাখ টাকার কমে যে আমার কিছুতেই হবে না রে–
সেই সুলতানপুরে ট্রেনে ওঠবার সময় থেকে কেবল এই টাকার কথা নিয়েই সদানন্দর কান ঝালাপালা করে দিয়েছে। কিন্তু সদানন্দ নির্বিকার। টাকার জন্যে এরকম ভিখিরিপনা সদানন্দর কাছে নতুন নয়। ছোটবেলা থেকে এ-সব দেখতে দেখতে তার কাছে এ-জিনিস পুরোন হয়ে গেছে। সেই ছোটবেলাকার কর্তাবাবু, সেই চৌধুরী মশাই, সেই কপিল পায়রাপোড়া, মানিক ঘোষ, ফটিক প্রামাণিক থেকে আরম্ভ করে এই প্রকাশ মামা পর্যন্ত সবাই এই টাকারই যন্ত্র। টাকার জন্যেই এদের সৃষ্টি, আর টাকার সৃষ্টিও বোধ হয় এদের জন্যেই। এই টাকার জন্যেই একদিন কপিল পায়রা-পোড়া, মানিক ঘোষ, ফটিক প্রামাণিক আর কালীগঞ্জের বউকে প্রাণ দিতে হয়ছে, এই টাকার জন্যেই প্রকাশ মামা আজ তার পেছু নিয়েছে।
বৈষয়িক কাজ তো সোজা কাজ নয়। টাকার নিয়মটাই বোধ হয় সেই জন্যে জটিল। কোর্ট থেকে সাকসেশান সার্টিফিকেট নেওয়া, তারপর ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তোলা, তারও অনেক ঝঞ্ঝাট আছে। প্রকাশ মামা এসব ব্যাপারে ওস্তাদ লোক। সদানন্দর কোনও অসুবিধে হতে দিলে না। কিন্তু টাকাটা হাতে পাবার পর থেকেই যেন সব ওলট-পালট হয়ে গেল। সদানন্দ যেন কেমন হয়ে গেল। একেবারে অন্য মানুষ।
প্রকাশ মামা বলতে লাগলো–কই রে, আমার ভাগের টাকাটা আমাকে দে–
সদানন্দ বললে–তোমার কীসের ভাগের টাকা?
প্রকাশ মামা আকাশ থেকে পড়লো যেন। বললো–বা রে, আমার ভাগের টাকা নেই? আমি তোকে কলকাতা থেকে ডেকে নিয়ে এলুম, তোর টাকার খবরটা দিলুম। আমি খবরটা দিলে তুই টাকার কথা কী জানতে পারতিস?
কিন্তু সদানন্দ তখন প্রকাশ মামার সেকথায় কান দিলে না। টাকাটা নিয়ে সোজা চলে গেছে কলকাতায়। প্রকাশ মামাও পেছন-পেছন গেছে।
সদানন্দ বলে–তুমি কেন আর আসছো প্রকাশ মামা?
প্রকাশ মামা বললে–সে কী রে, আমার ভাগের টাকা যতক্ষণ না পাই, ততক্ষণ তো আসতেই হবে। ভাগের টাকা না-পেলে আমি বাড়িতে গিয়ে বউ-এর কাছে মুখ দেখাবো কী করে?
সদানন্দ বললে–কিন্তু টাকাটা তো তোমার নয় প্রকাশ মামা, টাকাটা তো আমার–
–তা যেমন তোর টাকা, তেমনি তো আমিও ওর কিছু ভাগ পাবো–আমার ভাগের টাকাটা দে আমি চলে যাচ্ছি। তোর সঙ্গে আমি কেন মিছি মিছি ঘুরবো–
কিন্তু সদানন্দর কোনও দিকে কান নেই। একদিন নবাবগঞ্জ থেকে যখন প্রথম জীবন পরিক্রমা করতে বেরিয়েছিল তখনই মানুষ চিনে ফেলেছিল সে। কর্তাবাবুকে চিনেছিল, চৌধুরী মশাইকে চিনেছিল, কালীগঞ্জের বউকে চিনেছিল, রাধাকে চিনেছিল। চিনেছিল প্রকাশ মামাকে। আর শুধু তাদেরই বা কেন, নবাবগঞ্জের সব মানুষকেই চিনে ফেলেছিল সে। তারপর কলকাতার মানদা মাসি থেকে সুরু করে সমরজিৎবাবু কাউকেই চিনতে বাকি ছিল না তার। তারপর সমরজিৎবাবুর বাড়ির সেই পুত্রবধূটি। তারপর ছিল মহেশ, ছিল কত লোক। যে-লোকটা রাস্তায় তার পকেট থেকে টাকা চুরি করে নিয়েছিল তার কথাও তার মনে ছিল। এই সব মানুষ নিয়েই তো এই পৃথিবী। যে-পৃথিবীর মানুষকে নতুন করে গড়ে তোলবার জন্যে একজনের পর একজন অবতারের আবির্ভাব হয়েছে, একজনের পর একজন মহাপুরুষ হাসি মুখে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে, সেই পৃথিবীর মানুষের এই অধঃপতন কেন? কেন এত অবক্ষয়? আজ আর সদানন্দর কোনও সংশয় নেই। কী উদ্দেশ্য সাধন করতে সদানন্দ এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছিল সেটা এই পরিস্থিতিতে গৌণ হয়ে গেছে। আজকে এমন আবদার সে করবে না যে সে নিজে ভালো আর সবাই মন্দ। ভালো-মন্দর বিচার করার ভার অনির্দেশ্য এক মহাকালের কাছে ছেড়ে দিয়ে সে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কিন্তু যারা তার শুভাকাঙ্খী, যারা তার চলন্ত পথকে কুসুমাস্তীর্ণ করতে চেয়েছিল তাদের সে মনে রাখবে। মনে রাখার নিদর্শন সে তাদের সকলকে দিয়ে যাবে তার এই অযাচিত অর্থের ভাগ দিয়ে।
বউবাজারের সেই বাড়িটার কাছে আসতেই প্রকাশ মামা বললে––ওরে বাবা, ও বাড়িতে আমি যাবো না–
–কেন?
–না, ও বাড়িতে মানদা মাসি আছে, মাসি টাকার গন্ধ পেয়েছে, আমাকে পেলে আর ছাড়বে না, গিলে খাবে–
