অফিস থেকে বেরিয়েও বাড়ি ফেরার আর কোনও তাড়া থাকে না তার। আগে ছুটতে ছুটতে যেতে হতো নয়নতারার অফিসে। যতক্ষণ না নিখিলেশ গিয়ে পৌঁছত ততক্ষণ নয়নতারা অফিসের সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতো। এখন আবার নয়নতারা অফিসে আসা বন্ধ করেছে। এখন থেকে আর সে চাকরি করবে না বলেছে।
বলেছে–আমার চাকরি করবারও দরকার নেই, আর আমার টাকারও দরকার নেই। তুমি যখন আমাকে বিয়ে করেছ তখন আমাকে খাওয়ানো-পরানোর সমস্ত দায়িত্ব তোমার।
নিখিলেশ বলেছে–আমি তো বলছি আমাকে তুমি ক্ষমা করো–
নয়নতারা বলেছে তুমি আমার যা ক্ষতি করেছ এর পরে তোমার ক্ষমা চাইতে লজ্জা করে না? তুমি মনে করেছ তুমি একটার পর একটা দোষ করে যাবে আর আমি তোমাকে ক্ষমা করবো? দোষ করারও একটা সীমা থাকে মানুষের। তুমি কি সে সীমা রেখেছো যে তোমাকে আমি ক্ষমা করবো? আর ক্ষমা করবার কথা উঠছেই বা কেন? আমার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক রাখারই বা কী দরকার? আমাকে তুমি ছেড়ে দাও না
–ছেড়ে দেব মানে?
–হ্যাঁ ছেড়ে দাও। আজকাল তো সে-আইনও হয়েছে। আর তুমি যদি ছাড়তে না পারো তো আমিই না হয় তোমাকে ছেড়ে চলে যাই।
–কোথায়? কোথায় যাবে তুমি?
–আমার যেখানে খুশি আমি চলে যাবো, তোমাকে তা বলবো কেন? আমার অনেক সাধ ছিল আমি সংসার করব। কিন্তু ভগবানের যখন তা ইচ্ছে নয়, তখন আর মিছিমিছি সে চেষ্টা কেন? আজকাল তো কত মেয়ে বিয়ে না করে একলা রয়েছে, আমিও না হয় সেই রকম একলা-একলাই জীবন কাটিয়ে দেব। মনে করে নেব আমার কেউ নেই–
নিখিলেশ বলেছে–না না, ও-সব কাণ্ড করতে যেও না, লোকে হাসাহাসি করবে
–তুমি থামো, লোকের হাসিটা বড় না মানুষের জীবনটা বড়? বাইরের লোক কী বললে না-বললে–তা নিয়ে ভাবতে আমার বয়ে গেছে–। মানুষের সহ্যেরও একটা সীমা আছে।
নিখিলেশ কাছে গিয়ে তাকে আদর করতে গেছে। বলেছে–শোন, শোন, ও-সব নিয়ে আর ভেবো না, যত ভাববে তত মাথা গরম হয়ে যাবে–
নয়নতারা তার হাতখানা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে। বলেছে সরো তুমি, তোমার মুখ দেখলেও আমার ঘেন্না হয়—
বলে আর সারাদিন কথা বলে নি নিখিলেশের সঙ্গে। অফিসে যাবার আগে নিখিলেশ রোজ গিরিবালাকে বলে আসতো–তুমি একটু নজরে রেখো গিরিবালা, দিদিমণি যেন কোথাও বেরিয়ে না যায়–
বলে আসতো বটে, কিন্তু অফিসে বেরিয়েও নিখিলেশের মনে স্বস্তি ছিল না। অফিসে কাজ করতে করতেও কেবল বাড়ির কথা মনে পড়তো। যদি সত্যি-সত্যিই নয়নতারা কোথাও চলে যায়!
এক বাড়িতে এক ছাদের তলায় বাস করা অথচ কারোর সঙ্গে কারো বাক্যালাপ নেই। এরকম অবস্থা কতদিন সহ্য করা যায়! নিখিলেশের যেন দম আটকে আসতো।
এক-এক সময় নয়নতারার সামনে গিয়ে দাঁড়াতো। বলতো–কী হলো? এখনও কথা বলবে না?
সেদিন মাঝরাত্রে হঠাৎ কোথায় একটা শব্দ হতেই নিখিলেশের কেমন সন্দেহ হলো। মনে হলো পাশের ঘরের খিল খুলে যেন নয়নতারা বেরিয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে বিছানা থেকে উঠে পাসের ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দেখলে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। কিন্তু না, নিখিলেশ বাইরে থেকে কান পেতে শুনলে নয়নতারা ভেতরেই আছে, ঘুমোচ্ছে। মিছিমিছি ভয় পেয়ে গিয়েছিল সে। আবার গিয়ে নিজের ঘরে ঢুকলো। আবার বিছানায় গা এলিয়ে দিলে। কিন্তু সারা রাত আর ঘুম এলো না তার। কতদিন এ রকম করে চালানো যায়! কতদিন বাড়িতে কথা না বলে মানুষ বাঁচতে পারে? একদিন কত স্বপ্ন ছিল দুজনের। স্বপ্ন ছিল চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা করবে দুজনে। ব্যবসা করে টাকা জমিয়ে বড়লোক হবে। তারপরে সেই টাকায় কলকাতায় একটা নিজস্ব বাড়ি করবে, গাড়ি করবে, মানুষের সমাজের দশজনের মাথায় উঠবে। দশজনের মাথায় উঠে নিজেরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। সেই সমস্ত স্বপ্ন সেই দিন থেকে গুঁড়িয়ে চুরমার হয়ে গেল। অথচ কেন যে চুরমার হয়ে গেল তা কেউ বুঝতে পারলে না, বুঝতে চাইলেও না। কেবল পরস্পরকে দোষারোপ করে পরস্পরে নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করতে লাগলো।
.
মধ্যবিত্ত সমাজের মানুষের স্বপ্ন হয়ত এমনি করেই সামান্য কারণে ভেঙে যায়। সামান্য কারণেই যেমন আশায় আনন্দে একদিন উত্তাল হয়ে ওঠে, তেমনি আবার সামান্য কারণেই একদিন হতাশার অন্ধকার অতলে তলিয়েও যায়।
তুমি কখনও সুখ পাও নি, স্বাচ্ছন্দ্য পাও নি, সচ্ছলতাও পাও নি। কিন্তু সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য, সচ্ছলতার স্বপ্ন দেখতে তো তোমায় কেউ বারণ করতে পারে না। তাই সাধ তোমার অগাধ। কিন্তু স্বপ্ন যদি তোমার সার্থক না হয় তো হতাশ হওয়াই তো তোমার পক্ষে স্বাভাবিক। সংসারে সবাই তো যিশুখৃষ্ট হয়ে জন্মায় নি, তথাগত বুদ্ধদেব হবার জন্যেও জন্মায় নি। তেমনি সংসারে সদানন্দ হয়েও কেউ জন্মায় না। জীবনে সুখ-দুঃখ-আনন্দ-হতাশা সমস্ত কিছুকেই যে সমান ভাবে গ্রহণ করতে পারে তারই নাম তো সদানন্দ। সুখে থাকলেও সে সদানন্দ, দুঃখে থাকলেও সে সদানন্দ। টাকা থাকলেও সে সদানন্দ, টাকার অভাব থাকলেও সে সদানন্দ। কর্তাবাবু কি আগে থেকেই জানতে পেরেছিলেন তার নাতি সারা-জীবন সদানন্দ থাকবে তাই তার নাম রেখেছিলেন সদানন্দ।
তারিণী চক্রবর্তী তখন বাতে পঙ্গু। চলতে ফিরতে পারেন না। তবু এসেছেন বারোয়ারিতলায়। বেহারি পাল মশাইও এসেছে। কে আসে নি? বহু বছর পরে যেন নবাবগঞ্জে আবার উৎসব লেগে গেছে।
