–এ গলায় দড়ি দিয়ে মরেছিল।
কথাটা শুনেই সদানন্দ আঁতকে উঠলো। গলায় দড়ি দিয়েছিল?
–হ্যাঁ, বারোয়ারিতলার বটগাছের ডালে গলায় দড়ি বেঁধে ঝুলে পড়েছিল।
–এর নাম কী?
–কপিল পায়রাপোড়া।
নামটা কানে যেতেই সদানন্দ একটা আর্তনাদ করে সেই ইট বাঁধানো পৈঁঠের ওপরেই অজ্ঞান হয়ে পড়লো। কিন্তু কেউ তা টের পেলে না। সন্ধ্যেবেলা যখন হরিহরবাবু ছাত্রকে পড়াতে এসেছেন তখন খোঁজ পড়লো–খোকাবাবু নেই। খুঁজে বার করো সদানন্দকে। হরিহরবাবু সেই তিন ক্রোশ দূর থেকে সাইকেল ঠেঙিয়ে রোজ নবাবগঞ্জে পড়াতে আসেন। সকলেরই সে কথা জানা। বাড়িময় খোঁজ পড়লো। বড় অন্যমনস্ক ছেলে। খেয়ালী রকমের মানুষ। অনেক সময় ইস্কুল থেকে আসতে আসতেই কারো বাড়িতে ঢুকে পড়ে তাদের ঘানি গাছে চড়ে বসতো। তখন আর বাড়ির কথা ক্ষিধের কথা মনে পড়তো না। সেদিন সব জায়গায় খোঁজা হলো। চণ্ডীমণ্ডপে চৌধুরীমশাই প্রজা পাঠকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। তিনি বললেন–কই, আমি তো দেখি নি তাকে। আমার কাছে তো কই আসে নি সে। তবে সে ইস্কুল থেকে এসেছিল তো? গৌরী পিসী নিজের হাতে তাকে মুড়িবাতাসা আর সন্দেশ খেতে দিয়েছে। তাহলে সে যাবে কোথায়? দীনুও ছুটলো বারোয়ারিতলায়, সেখানেও নেই। প্রকাশ মামা দিদির কাছে এসেছিল। বাইরে কোথায় ঘুরছিল। বাড়িতে এসেই শুনলো ভাগ্নেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আবার দৌড়ো বাইরে। যাবে কোথায় সে? উড়ে তো যেতে পারে না। দিদিকে বললে–কিছু টাকা দাও–
দিদি বললে–টাকা কী হবে রে?
প্রকাশ বললে–নানান জায়গায় যেতে হবে, টাকা হাতে থাকা ভালো, বুঝলে? সব সময় কিছু টাকা হাতে রেখে দিও, দেখবে সঙ্গে সঙ্গে সব সুরাহা হয়ে গেছে।
টাকা নিয়ে প্রকাশ রায় বেরোল। কিন্তু আসলে খুঁজে বার করলে গৌরী পিসী। গৌরী পিসী গোয়ালঘরের দিকে যাচ্ছিল ছুঁটে আনতে। হঠাৎ চাঁদের আলোয় দেখতে পেলে কে যেন ঘাটের পৈঁঠের ওপর চিৎপাত হয়ে শুয়ে গোঙাচ্ছে। একবার যেন কীরকম সন্দেহ হলো। তারপর বললে–কে রে? কে রে ওখানে শুয়ে আছিস? কে তুই?
উত্তর না পেয়ে পায়ে-পায়ে কাছে গিয়ে দেখে খোকা। খোকাকে ওই অবস্থায় দেখে আর সেখানে দাঁড়ালো না। দৌড়তে দৌড়তে বাড়ির মধ্যে এসে খবর দিতেই সবাই দৌড়ে গেছে। চৌধুরী মশাইও চণ্ডীমণ্ডপ ছেড়ে এলেন। প্রজা পাঠক যারা ছিল তারাও এলো। সবাই ধরাধরি করে নিয়ে এসে তুললো ভেতর বাড়িতে। তারপর ডাক্তারবদ্যি আসার পর যখন তার জ্ঞান হলো সবাই জিজ্ঞেস করলে কী হয়েছিল তোর? সন্ধ্যেবেলা ওখানে গিয়েছিলি কী করতে? ভয় পেয়েছিলি?
–হ্যাঁ।
–কে ভয় দেখিয়েছিল?
সদানন্দ বললে–কপিল পায়রাপোড়া।
.
এ-সব সদানন্দর জীবনের ছোটবেলাকার ঘটনা। প্রকাশ মামা যখন কেষ্টনগরে সদানন্দের পাত্রী দেখতে গিয়েছিল তখন এইসব কথাই উঠেছিল। বেয়াই মশাই সরল সাদাসিধে মানুষ। নবাবগঞ্জের চৌধুরী বাড়ির একমাত্র ছেলের সঙ্গে তার মেয়ের বিয়ে হবে শুনে তিনি খুব খুশী হয়েছিলেন। সারা জীবন ইস্কুলে ছাত্রদের সংস্কৃত শিখিয়েছেন। কাকে বলে ধাতুরূপ তা জানেন। কাকে বলে ব্যাকরণ আর কাকে বলে অলঙ্কার তাও জানেন। খাওয়া-পরার কিছু ভাবনা যেমন ছিল না, তেমনি অভাবও ছিল না কিছু। তিনি বলতেন–অভাব বললেই অভাব। নইলে কোনও অভাব নেই আমার। আমি যদি কিছু না চাই তো আমার অভাব থাকবে কী করে? আমার তো ওই একটা মেয়ে নয়নতারা। নয়নতারাকে যে দেখবে তারই পছন্দ হবে। নয়নতারার বিয়ের জন্যে তোমাদের কাউকে ভাবতে হবে না।
গৃহিণী বলতেন–কিন্তু তা বলে বিয়ের চেষ্টা তো করতে হবে–
ব্যকরণতীর্থ পণ্ডিত মানুষ ওই কালীকান্ত ভট্টাচার্য। তিনি বলতেন–চেষ্টা করবার আমি কে বলো তো? যিনি সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মালিক তার যা মনোবাঞ্ছা তাই-ই হবে।
প্রকাশ মামা যখন নিজে সম্বন্ধটা নিয়ে গিয়েছিল তখন কালীকান্ত ভট্টাচার্য তাকেও সেই কথাই বলেছিলেন। বলেছিলেন–আমি কে বলুন? আর আপনিই বা কে? আমরা কেউ-ই কিছু নই। নিমিত্ত মাত্র। নয়নতারার মা আমাকে তাগিদ দেন। বলেন–মেয়ের বিয়ের জন্যে তুমি কিছু ভাবছো না। আমি বলি–মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে আমি ভাববার কে? যিনি ওঁকে আমার সংসারে পাঠিয়েছেন তিনিই ভাবছেন। তা দেখুন, কোথায় ছিলেন আপনি আর আমি কোথায় ছিলাম, হঠাৎ আপনি নয়নতারার সম্বন্ধ নিয়ে এলেন–আর এমন পাত্র পাওয়া তো আমার পক্ষে ভাগ্যের কথা রায় মশাই–
তারপর থেমে আবার জিজ্ঞেস করলেন–তা আপনি হলেন পাত্রের কে?
–মামা!
–হরনারায়ণ চৌধুরী মশাই-এর শ্যালক আপনি?
–আজ্ঞে না। আমি হলাম চৌধুরী মশাই-এর গৃহিণীর মামার ছেলে। অর্থাৎ মামাতো ভাই। তবে আসলে বলতে গেলে নিজের ভাই-এর মতই। ছোটবেলা থেকে চৌধুরী মশাই এর শ্বশুর কীর্তিপদ মুখোপাধ্যায়ের কোনও পুত্রসন্তান না থাকায় আমি তার বাড়িতে ছেলের মতই মানুষ হয়েছি। তাই জন্যেই এত ঘনিষ্ঠতা। দিদি আমাকে বলে দিয়েছিল আমার ভাগ্নের জন্যে একজন ডানা কাটা-পরীর মত পাত্রী চাই। তা অনেক খুঁজেছি। প্রায় শ’খানেক মেয়ে দেখেছি এ পর্যন্ত। আমার ভগ্নীপতির তো টাকার প্রয়োজন নেই, টাকা তার অনেক আছে, কিন্তু তার একমাত্র বাসনা পুত্রবধূটি যেন ডানা কাটা-পরী হয়, আর কিছু নয়–
