বাড়িতে ভেতরে গিয়ে দিদিমা অনেক কথা উজাড় করে দিতে লাগলো। কথা বলতে বলতে দু’চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো তার। বেহারি পালের ছেলেমেয়ে কিছু নেই। নয়নতারা যখন নবাবগঞ্জে বউ হয়ে এসেছিল তখন তাকে নিজের মেয়ের মত করেই ভালাবেসেছিল বেহারি পালের বউ। সে আজ এতদিন পরে ফিরে এসেছে এ আনন্দ যেন রাখবার জায়গা নেই তার। নয়নতারা বললে–এদের বাড়িতে কেউ নেই কেন দিদিমা?
দিদিমা বললে–আর কে থাকবে বউমা? থাকবার আছেটা কে! তুমিও চলে গেলে আর সেই থেকেই ভাঙন শুরু হলো। সেই থেকে ওটা ভূতের বাড়ি হয়ে পড়ে আছে–
নয়নতারা আর কী বলবে এ-কথার জবাবে। সে যে সদানন্দর কাছ থেকে তার গয়নাগুলো চাইতে এসেছিল তা আর মুখ ফুটে বলা হলো না।
নয়নতারা বললে–আমি তাহলে আসি দিদিমা
দিদিমা বললে–সে কি বউমা, এতদিন পরে এলে আর এমনি হুট করে এসেই চলে যাবে?
–না, আমার সঙ্গে লোক আছে, রিকশায় বসে আছে, আমার আবার ফিরতে দেরি হয়ে যাবে। যেতে হবে সেই নৈহাটিতে, ঝিকে রান্না করে রাখতে বলে এসেছি–
নৈহাটি? কেন বউমা, নৈহাটিতে আবার কে আছে তোমার?
নয়নতারা বললে–-নৈহাটিতেই তো এখন থাকি আমি দিদিমা। বিয়ে করার পর তো আমি নৈহাটিতেই আছি। আমরা দুজনে কলকাতায় চাকরি করি আর ডেলি-প্যাসেঞ্জারি করি নৈহাটি থেকে–
কথাটা শুনে দিদিমা যেন কেমন আকাশ থেকে পড়লো। নয়নতারার মুখের দিকে আরো তীক্ষ্ম দৃষ্টি দিয়ে দেখলে। সত্যিই তো, নয়নতারার সিঁথিতে সিঁদুর উঠেছে। হাতে আবার নোয়া। অথচ…
নয়নতারা তখন আর বসলো না। তাড়াতাড়ি বিদায় নিয়ে সোজা একেবারে বাইরে এসে দাঁড়ালো। নিখিলেশ তখন চুপ করে রিকশাটার ওপর বসেছিল। নয়নতারা রিকশায় উঠেই সোজাসুজি বলে উঠলো তুমি আমাকে সব মিথ্যে কথা বলেছিলে? বলল, কেন মিথ্যে কথা বলেছিলে? এখানে তো কেউ থাকে না! সে-ও তো এখানে নেই। তাহলে কেন তুমি বলেছিলে যে বাড়ি নতুন করে সারিয়েছে, বাড়িতে খুব ধুম-ধাম চলেছে, ভেতর থেকে লুচি ভাজার গন্ধ আসছে। আমাকে ভোলাবার জন্যে বলেছিলে? বলো? কথা বলছো না কেন, জবাব দাও–
রিকশাটা আবার তখন সেই বরোয়ারিতলার পথ দিয়ে রেলবাজারের দিকে চলতে আরম্ভ করেছে।
নয়নতারা বারবার জিজ্ঞাসা করতে লাগলে–বলো, কেন তুমি আমাকে অমন করে ঠকিয়েছিলে? সে ভালো থাকলে আমি খুশী হবো বলে, না আমাকে তুমি ওই বলে ভোলাতে চেয়েছিলে, বলো? আমার কথার জবাব দিচ্ছ না কেন? জবাব দাও?
রিকশাওয়ালা তখন ধুলোকাদার মধ্যে প্রাণপণে রিকশাটা টানতে টানতে নিয়ে চলেছে।
নয়নতারা আবার বলতে লাগলোবলো, জবাব দাও, এতদিন তুমি তাহলে আমাকে যা-কিছু বলে এসেছ সবই মিথ্যে? সমস্ত মিথ্যে কথা? কিন্তু আমি এতদিন সরল মনে তোমার সব মিথ্যে কথাগুলো বিশ্বাস করেছিলুম যে। তুমি এত মিথ্যেবাদী?
নয়নতারা আবার জিজ্ঞেস করলে কই, তুমি জবাব দিচ্ছ না যে?
নিখিলেশ বললে–দেখ, আমি তোমাকে মিথ্যে বলি নি, আমি যা শুনেছিলুম তাই-ই তোমাকে বলেছি, আমি একটু বাড়িয়েও বলি নি, কমিয়েও বলি নি–
নয়নতারা বললে–আবার তুমি মিথ্যে কথা বলছো? নিজের দোষ স্বীকার করতে তোমার এত লজ্জা? তুমি কী মনে করো কী? তুমিই একমাত্র চালাক আর সবাই বোকা? তুমি বোধ হয় ভেবেছিলে ওই কথাগুলো বললে আমি সদানন্দবাবুর ওপরে খুব চটে যাবো, না? ভেবেছিলে আমার মন ওর দিকে আর চলবে না, না? কিন্তু তুমি একবারও তো ভাবলে না যে তা কখনও সম্ভব হতে পারে না! আশ্চর্য, সে আর তুমি? তার সঙ্গে তুমি নিজের তুলনা করো? সে মানুষ নয় তা জানো, সে একজন দেবতা, তোমার মত জানোয়ার পশু নয় সে—
.
এমন কী নৈহাটিতে ফিরে এসেও নয়নতারার রাগ গেল না। যতক্ষণ ট্রেনে ছিল সমস্ত রাস্তায় একটা কথাও বললে না নয়নতারা। আস্তে আস্তে নিখিলেশ নয়নতারার মনটা স্বাভাবিক করতে চেষ্টা করে সবে মাত্র একটু সফল হয়েছিল। অনেক মিথ্যে কথা অনেক স্তোকবাক্য বলে মাত্র একটু শান্ত করেছিল নয়নতারাকে, তাও বিগড়ে গেল একদিনের মধ্যে।
শীতেশ সেদিন বললে–কী হে, আবার মন-মরা কেন? আবার কী হলো?
নিখিলেশ বললে–কিছু ভালো লাগছে না ভাই–
শীতেশ বরাবর বেপরোয়া মানুষ। বললে–মনকে প্রশ্রয় দিও না ভাই, মনকে একটু প্রশ্রয় দিয়েছ কী ওমনি সে-বেটা পেয়ে বসবে। সেই জন্যেই তো আমি মদ খাই হে। মদ খেলেই মন বাছাধন একেবারে জব্দ!
তারপর খানিক পরে আবার বললে–জানো, সেদিন মানদা মাসি তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিল বলছিল আর একদিন তোমাকে নিয়ে যেতে–
নিখিলেশ বললে–আমি গিয়ে আর কী করবো ভাই, টাকা যোগাড় না করতে পারলে আমার সেখানে গিয়ে কী লাভ?
শীতেশ বললে–টাকা লোন নাও, ধার করো।
নিখিলেশ বললে–ধার শুধবো কী করে? ধার নিতে ভয় করে যে আমার। শেষকালে দেনার দায়ে একুল-ওকুল দুকুল যাবে যে।
–সে কী হে? কারবার করতে গেলে ধার না নিলে চলে? কে না ধার নেয়? টাটা ধার নেয় না? বিড়লা ধার নেয় না। এদিকে বড়লোক হবার ইচ্ছে আছে, ওদিকে আবার ধার নিতেও ভয়। ওকেই তো বলে মিডল-ক্লাস মেন্টালিটি! যদি বলো তো কম সুদে টাকা তোমাকে ধার পাইয়ে দিতে পারি আমি।
নিখিলেশ বললে–না ভাই, ওদিকে তুমি আমাকে লোভ দেখিও না—
সত্যিই তো, মধ্যবিত্ত সমাজের ছেলে নিখিলেশ। টাকা ধার করে সে পথে বসবে নাকি! এককালে দেশ-সেবা করবে বলে জীবন আরম্ভ করেছিল, তারপর কোথা দিয়ে কোন্ পাকে চক্রে পড়ে এখন কেরানীতে পরিণত হয়ে গিয়েছে। আগেকার জীবনের সেই বড় বড় স্বপ্ন কোথায় চলে গেল! এখন আর সেই আদর্শবাদ নেই, সেই উদারতাও নেই তার। আগে কত দিকে চাঁদা দিয়ে টাকা বিলিয়ে দিয়েছে। মানুষের উপকার করবার সেই অলীক বিলাসিতাও কখন মন থেকে উবে গিয়েছে। এখন মনে হয় সবাই শুধু স্বার্থপর। আর সকলেই যখন স্বার্থপর তাহলে সে-ই বা স্বার্থপর না হবে কেন?
