বারোয়ারিতলার নিতাই হালদারের দোকানের মাচায় বসে তখনও সেই আগেকার মত তাস খেলা চলে। বেহারি পালের মুদিখানার সামনে তখনও খদ্দেররা তেল-হলুদ-মশলা কোরোসিন তেলের সওদা করে।
হঠাৎ পরমেশ মৌলিকের নজর পড়ল। রিকশায় কারা যায়।
রিকশাওয়ালাকে উদ্দেশ্য করেই পরমেশ মৌলিক জিজ্ঞেস করলে–কোথাকার যাত্রী গো?
রিকশাওয়ালা জবাব দিলে—নবাবগঞ্জের–
নবাবগঞ্জে কাদের বাড়ি?
–চৌধুরীবাড়ি।
চৌধুরীবাড়ির নাম শুনেই সবাই অবাক। চৌধুরীবাড়ি তো ভূতের বাড়ি। ছোটমশাই বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে কবে সুলতানপুর চলে গিয়েছিল সে-খবর কি এরা জানে না? আর সেই চৌধুরী মশাইও তো কবে মারা গেছে। শালাবাবু এসে সে খবরও একদিন দিয়ে গিয়েছিল। তাহলে এরা এতদিন পরে কার খোঁজ নিতে এসেছে।
নিতাই হালদার, গোপাল ষাট, কেদার, তারাও এবারে কৌতূহলী হয়ে উঠলো। রিকশার সামনে পর্দা দিয়ে ঢাকা রয়েছে। ভেতরে মেয়েছেলের আধখানা মুখ দেখা যাচ্ছে।
গোপাল ষাট বললে–ভেতরে কারা?
রিশার ভেতরে বসে নিখিলেশ বললে–দেখেছ, কী কাণ্ড! এদের সব কিছু জানা চাই, না জানলে এরা ছাড়বে না–
বলে পর্দাটা সরিয়ে দিয়ে নিজের মুখ বাড়ালো নিখিলেশ। জিজ্ঞেস করলে চৌধুরীবাড়িতে কেউ নেই?
পরমেশ মৌলিক সে কথার উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করলে–আপনারা কোত্থেকে আসছেন?
–আমরা আসছি নৈহাটি থেকে। এখানে সদানন্দবাবু আছে?
নিতাই হালদার, গোপাল ষাট আরো অবাক। এই তো কদিন আগে শালাবাবু এসে সদার খোঁজ করেছিল। আবার এরা তার খোঁজে এসেছে কেন? এদেরও কি টাকার লোভ?
নয়নতারা বললে–কই, তুমি যে বলেছিলে সে নবাবগঞ্জে থাকে, তুমি এসে তার সঙ্গে দেখা করেছ?
সমস্ত ব্যাপারটা যেন নয়নতারার কাছে কেমন গোলমেলে মনে হলো।
নিখিলেশ কী জবাব দেবে বুঝতে পারলে না। তারপরে বললে–বোধ হয় সদানন্দবাবু কোথাও চলে গিয়েছেন। আমি যখন এসেছিলুম সেদিন তো ছিলেন–
পরমেশ মৌলিক বললে–সে তো আজ ক’বছর হলো নিরুদ্দেশ মশাই, অনেক বছর গাঁয়ে আসে নি, আপনারা কি নতুন এলেন নাকি?
সে কথার জবাব না দিয়ে নিখিলেশ রিকশাওয়ালাকে বললে–চলো চলো রিকশাওয়ালা, তুমি চলো–
কিন্তু নয়নতারা বললে–না, যাবে না, থামাও–
বলে নয়নতারা নিজেই রিকশা থেকে নেমে পড়লো হঠাৎ। নেমে একেবারে নিতাই হালদারের দোকানের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ালো।
বললে–সদানন্দবাবু কি এখানে থাকেন না?
নিতাই হালদার তখন যেন সামনে ভূত দেখেছে! এ সেই সদানন্দর বউ না? পরমেশ মৌলিকও চিনতে পেরেছে। বিস্ময়ে কৌতূহলে সকলের মুখ-চোখ তখন হাঁ হয়ে গেছে। সেদিনকার বউরানীকে যে হঠাৎ এই পরিবেশে দেখতে পাবে তা তারা স্বপ্নেও ভাবতে পারে নি। কারোর মুখ দিয়ে তখন আর কোনও কথা বেরোচ্ছে না।
ওদিকে বেহারি পাল মশাইও তার দোকান থেকে মুখখানা দেখে চিনতে পেরেছিল। সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির ভেতরে ছুটে গিয়েছে গিন্নীর কাছে।
–ওগো, কোথায় গেলে তুমি? কারা এসেছে দেখে যাও—
সমস্ত বারোয়ারিতলায় তখন যেন একেবারে বিদ্যুৎ খেলে গেছে। এমনিতে নবাবগঞ্জ শান্ত-শিষ্ট জায়গা। তাদের জীবনে কোথাও কোনও বৈচিত্র্য থাকে না। চমকে ওঠবার মত ঘটনা ক্বচিৎকদাচিৎ ঘটে। সকালে সূর্য আকাশে উঠতে হয় বলেই ওঠে, আর সন্ধ্যে হয় বলেই যেন তা ডোবে। সদার বউকে সশরীরে এমনভাবে বারোয়ারিতলার মধ্যে দেখা যাবে তা ভাবাই যায় নি। সঙ্গে সঙ্গে তাসের সাহেব-টেক্কা-বিবি তাদের মাথায় উঠেছে। তার বদলে একেবারে জলজ্যান্ত-সাহেব বিবি তাদের সামনে এসে উদয় হয়েছে যেন।
–কেন, চৌধুরীদের কেউ নেই বাড়িতে?
চৌধুরীদের বাড়িটা বারায়ারিতলা থেকেই দেখা যাচ্ছিল। সামনে বন-জঙ্গল, বাড়ির গায়ে অশ্বত্থ গাছ জন্মে ছায়া করে রেখেছে। যেন ভুতের বাড়ির চেহারা নিয়েছে সেটা।
নিতাই হালদার বললে–আজ্ঞে, তাঁরা মারা গেছেন, ছোটমশাই-এর গিন্নীও মারা গেছেন, ছোট মশাইও ভাগলপুরে মারা গেছেন, আর তাঁর ছেলে সদা, সদানন্দ, সেও তো নিরুদ্দেশ–
নয়নতারা অবাক হয়ে গেল। বললে–নিরুদ্দেশ! এখানে নেই? তবে যে শুনেছিলুম তিনি এখন এখানে থাকেন–
-আপনি ভুল শুনেছেন, কেউ নিশ্চয়ই আপনাকে ভুল শুনিয়েছে। সে তো বহুকাল নিরুদ্দেশ! একবার শুধু গাঁয়ে এসেছিল, তাও সে আজ অনেক দিন হয়ে গেল। তারপরে রেল বাজারের প্রাণকেষ্ট সা’মশাই এ বাড়ি কিনে নিয়েছিলেন, কিন্তু তারও তা সহ্য হলো না। কেনার দুদিন পরেই অপঘাতে মারা গেছেন। এখন তো এবাড়ি একরকম বেওয়ারিশই পড়ে আছে–
কথাগুলো শুনে নয়নতারা হঠাৎ নিখিলেশের দিকে ফিরলো। বললে–কই, তুমি যে বলেছিলে বাড়ির চেহারা নতুন হয়ে গেছে–
নিখিলেশ আমতা আমতা করতে লাগলো। হয়ত ভেবেচিন্তে একটা কিছু জবাব দিত, কিন্তু তার আগেই তাকে বাঁচিয়ে দিলে বেহারি পালমশাইএর বউ।
খবরটা পেয়ে বেহারি পালের বউ ঘোমটা দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে। ‘বউমা’ বলে ডাকতে ডাকতে একেবারে সামনের দিকে এগিয়ে আসছিল। নয়নতারাও সামনে যেতেই বেহারি পালের বউ তাকে দু’হাতে বুকে জড়িয়ে ধরেছে।
–ওমা, কতদিন পরে তুমি এলে বউমা!
নয়নতারা বললে–আপনি কেমন আছেন দিদিমা–
দিদিমা তখন নয়নতারাকে টানতে টানতে একেবারে বাড়ির অন্দর মহলে নিয়ে গিয়ে তুলেছে। নিখিলেশ বাইরে রিকশাতে বসে রইল।
