নয়নতারা বললে–লোকে যা ইচ্ছে বলুক গে, তাতে আমার কী এল গেল?
নিখিলেশ বললে–তবু, তুমি তো এককালে সেবাড়ীর বউ ছিলে, আবার দ্বিতীয়বার বিয়ে করছে, এসব দেখতে পেলে তারাই বা কী বলবে বলো দিকিনি! সে তো আর কলকাতাও নয়, নৈহাটিও নয়, সে একেবারে অজ পাড়া-গাঁ, তারা যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করবে এতদিন কোথায় ছিলে, তখন কী বলবে? একদিন তুমিই তো সকলের সামনে বড় গলা করে শ্বশুর-শাশুড়ীকে কত কথা শুনিয়ে এসেছিলে, নিজের সিঁথির সিঁদুর ঘষে মুছে ফেলেছিলে, হাতের শাঁখা-নোয়াও ভেঙে ফেলেছিলে, এখন আবার তাদেরই কাছে মাথা নিচু করে হাত পাততে তোমার লজ্জা করবে না?
নয়নতারা বললে–হাত পাতার কথা বলছো কেন? আমি কি সেখানে দয়া ভিক্ষে করতে যাচ্ছি, আমার নিজের জিনিস চাইব তাতে লজ্জা কী? আমি তো পরের জিনিস চাইছি না–
–না, তবু তারা ভাববে টাকার অভাবে তুমি তাদের কাছে মাথা নীচু করছো! ভাবলেই হলো। তাদের ভাবনা তো তুমি আটকাতে পারছো না–
নয়নতারা বললে–তারা যা খুশী ভাবুক। আর সত্যি কথা বলতে কী, টাকারও তো আমাদের দরকার। এই যে আজ নৈহাটি থেকে ডেলি-প্যাসেঞ্জারি করছি, এখন কলকাতায় একটা বাড়ি থাকলে আমাদের কত সুবিধে হতো বলে দিকিনি। সে-গয়না-গুলো বেচলে তার দাম অন্তত কম করেও পঞ্চাশ হাজার টাকা তো বেকসুর হবে! আর সেই টাকা দিয়ে ছোটখাটো একটা বাড়ি কেনার পরও বাকি যা টাকা থাকবে তাই দিয়ে কোনও ব্যবসা ট্যবসাও তো করতে পারি আমরা। তারা বড়লোক, তাদের পঞ্চাশ হাজার টাকা থাকলেই বা কী আর গেলেই বা কী!
নিখিলেশ বললে–তা সদানন্দবাবু যখন আমাদের বাড়িতে ছিলেন তখন গয়নার কথাটা একবার তুললেই পারতে। তা হলে আর এখন তোমাকে সেগুলো চাইতে সেখানে যেতে হতো না–
–আমার মনে ছিল না তখন। তুমি আমায় মনে করিয়ে দিলেই পারতে!
নিখিলেশ বললে–আমি তোমায় গয়নার কথা মনে করিয়ে দেব! তাহলেই হয়েছে। তখন তোমার যা মেজাজ, তোমার মুখ দেখতেই তো আমার ভয় হতো।
–কী যে তুমি বলো তার ঠিক নেই, একটা রোগী মানুষকে একটু সেবা করবো না বলতে চাও? মরো-মরো লোকটাকে বাঁচিয়ে তুলেছি, সেইটেই আমার মস্ত অপরাধ হলো?
নিখিলেশ বললে–থাক থাক, সে-সব পুরোন কথা আর না তোলাই ভালো, যা হয়ে গেছে তা হয়ে গেছে, ল্যাঠা চুকে গেছে। এখন ও নিয়ে আর তেতো করার দরকার নেই–
নয়নতারা বললে–না, তেতো করছি না। কিন্তু আমি নবাবগঞ্জে যাবোই। কাল ছুটি আছে, কালই ভোরবেলার ট্রেনে এখান থেকে বেরিয়ে যাবো। তারপরে আবার দুপুরবেলার ট্রেনে ফিরে আসবো। বাড়িতে এসে খাওয়া-দাওয়া করবো। ওরা যদি খেয়ে যেতেও বলে তো তুমি যেন আবার রাজি হয়ে যেও না। যাদের বাড়ি একদিন ঘেন্নায় ছেড়ে এসেছি তাদের বাড়িতে জলগ্রহণ করাও পাপ–
তারপর গিরিবালাকে ডেকে নয়নতারা বলে দিলে–গিরিবালা, আমরা কালই ভোরের ট্রেনে বেরিয়ে যাচ্ছি। তোমাকে আর সকাল-সকাল উনুনে আঁচ দিতে হবে না, আমরা বাইরেই চা খাবো। তুমি বেলা হলে ধীরে-সুস্থে নিজের চা করে নিও। আমরা বিকেলে বাড়ি এসে ভাত খাবো–
নিখিলেশ আপত্তি করতে গেল। বললে–কালকে না-ই বা গেলে–পরে না-হয় কোনও দিন যাওয়া যাবে’খন, এত তাড়াতাড়ি কীসের–
নয়নতারা বললে–না, আমি কালকেই যাবো, তোমাকে ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠিয়ে দেব–
বড় মুশকিলে পড়লো নিখিলেশ। নয়নতারা যেরকম জেদী মেয়ে, সে যখন একবার নবাবগঞ্জে যাবো বলে মন করেছে তখন সে যাবেই। তাকে আর ঠেকানো যাবে না। কেন যে সেদিন নিখিলেশ মিথ্যে করে বলতে গিয়েছিল যে সে নবাবগঞ্জে গিয়েছিল। তখন যদি জানতো যে নয়নতারা একদিন তার সেই কথা বিশ্বাস করে নিজেই নবাবগঞ্জে যেতে চাইবে, তাহলে কি অমন করে মিথ্যে কথা বলে নয়নতারার মন ফেরাতে চাইতো!
ভোর তখনও হয়নি ভালো করে। চারিদিকে বেশ অন্ধকার। নয়নতারা নিখিলেশকে ঠেলতে লাগলো–ওগো, ওঠো–ওঠো–দেরি হয়ে যাবে—ওঠো–
নিখিলেশ আর শুয়ে থাকতে পারলে না, বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লো। কিন্তু তার বড় ভয় করতে লাগলো। নবাবগঞ্জে গিয়ে সে কী দেখবে কে জানে! সদানন্দবাবু যদি শেষ পর্যন্ত সেখানে না থাকে! যদি সেখানে কেউই না থাকে, তখন?
ততক্ষণে ট্রেন আসবার সময় হয়ে যাচ্ছিল। নয়নতারার সঙ্গে নিখিলেশও সেই অস্পষ্ট অন্ধকার রাস্তায় পা বাড়িয়ে দিলে।
.
সেই ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। স্বাধীন হবার সঙ্গে সঙ্গে দেশের ইতিহাস ভূগোল সব কিছুই আস্তে আস্তে বদলে গিয়েছিল। সব চেয়ে বদলে গিয়েছিল কলকাতা শহরটা। দু’শো বছরের জঞ্জাল কি সহজে পরিষ্কার হয়। কিন্তু তবু যতটুকু পরিষ্কার হবার হয়ত তা হয়েছিল। কিন্তু নবাবগঞ্জে তার কিছুই হয় নি। তখনও রেলবাজারে ট্রেন এসে থামলেই সামনে কয়েকটা রিকশা দাঁড়িয়ে থাকে খদ্দেরের আশায়। রিকশার খদ্দের তেমন হয় না। হলেও কাছাকাছি তার পরিধি।
কিন্তু নবাবগঞ্জের খদ্দের বড় একটা থাকে না। থাকে কালে-ভদ্রে। নবাবগঞ্জে রিকশা চড়ার লোক তেমন নেই। নবাবগঞ্জ তখনও সেই আগেকার মোগল আমলেই আটকে ছিল, আগে বাস যেমন চলতো তেমনি তখনও চলতো। কিন্তু সে বাস নবাবগঞ্জ ছুঁয়ে যেত না। নবাবগঞ্জের পাশ দিয়ে সোজা চলে যেত একেবারে বাজিতপুরের দিকে। কারো অসুখ হলে যেতে হবে সেই রেলবাজারে। ছেলেরা লেখাপড়া করবে তাও যেতে হবে রেলবাজারের ইস্কুলে কলেজে। স্বাধীনতার এত বছর পরেও নবাবগঞ্জ তাই তখনও একটা পাণ্ডববর্জিত দেশ হয়েই বিরাজ করছিল।
