–সে ভাই একজনের অসুখে সব জমানো টাকা খরচ হয়ে গেল।
–অসুখ? কার? তোমাদের আবার কে আছে?
নিখিলেশ বললে–আমাদের নিজের কেউ না।
–নিজের কেউ না তো তার অসুখে তোমরা টাকা খরচ করতে গেলে কেন?
–সেও কপাল। আমার স্ত্রীকে বিয়ের সময় একটা সোনার হার গড়িয়ে দিয়েছিলুম, সেটা পর্যন্ত বাঁধা পড়ে গেল, আর ছাড়াতে পারলাম না। খরচ যে কোথা দিয়ে কী ভাবে কী উপলক্ষে হয়ে যায় কিছুই বুঝতে পারি না। অথচ রোজ কালিয়া-পোলাও খাই তাও নয়। এখন আমি দোষ দিই গিন্নীকে, আর গিন্নী দোষ দেয় আমাকে। তাই তো ঠিক করেছি চাকরি করে কিছু হবে না।
ততক্ষণে শেয়ালদ’ স্টেশনে এসে গিয়েছিল দুজন। শীতেশ বললে–আজকে একটু হবে নাকি?
নিখিলেশ বললে–না হে, ও-সব আর ছোঁব না–
–কেন? কী হলো আবার?
নিখিলেশ বললে–আমার স্ত্রী ঠাকুরের নাম করে আমাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছে জীবনে আর কখনও মদ-টদ যেন না ছুঁই
শীতেশ বললে–এই জন্যেই তো আমি বিয়ে করি নি ভাই, বিয়ে করলে আমিও তোমার মত বউ-এর ভেড়ুয়া হয়ে যেতুম–
তারপর আর দাঁড়ালো না শীতেশ। সে তার নিজের গন্তব্যস্থানে চলে গেল।
বাড়িতে নয়নতারা নিখিলেশের জন্যেই অপেক্ষা করছিল। নিখিলেশকে দেখেই জিজ্ঞেস করলে কী হলো? কিছু ঠিক করলে?
নিখিলেশ বললে—না–
–কেন? এতক্ষণ তা হলে কী করলে? কোথায় গেলে?
–গেলাম তো অনেক জায়গায়, কিন্তু আসলে তো টাকা! পাঁচ হাজার টাকা না হলে কোনও ব্যবসাতেই নামা যায় না। টাকাটা কোথায় পাবো?
কথাটা দুজনেরই জানা ছিল। টাকা না হলে যে কিছু হয় না এটা এমন কিছু নতুন কথা নয়। তবু নিখিলেশের একটা ক্ষীণ আশা ছিল হয়ত শীতেশ এমন একটা পথ বলে দিতে পারবে যাতে কম টাকা লাগে। শীতেশ কলকাতায় থাকে, কলকাতাতেই জন্মেছে, সে অনেক লোককে চেনে। এককালে শীতেশদের অবস্থা ভালো ছিল। ভাইরাও বড়লোক। কেবল সে-ই একলা আলাদা হয়ে আছে, আর চাকরি করে যা উপায় করে তা দু হাতে উড়িয়ে দেয়। নিজে বড় হয়নি, বড় হতে তার ইচ্ছেও নেই।
নয়নতারা বললে–কিন্তু টাকা তো ধারও পাওয়া যায়—
নিখিলেশ বললে–তাও তো ভেবেছি, কিন্তু শেষকালে যদি ব্যবসাতে লোকসান যায়? তখন যে একুল-ওকুল দুকুল যাবে! তার চেয়ে আগে বরং ভেবে-চিন্তে নামাই ভালো–
–তা হলে কীসের ব্যবসা করবে?
নিখিলেশ বললে–সে না-হয় ভেবে-চিন্তে একটা বার করা যাবে, কিন্তু টাকাটা কোথায় পাবো তাই আগে ভাবছি–
–ধরো আমার গয়নাগুলো যদি বেচে দিই তো কত টাকা আসবে?
–তুমি গয়না বেচে দেবে! যে গয়নাটা স্যাকরার দোকানে বাঁধা রয়েছে সেটাই তো এখনও ছাড়িয়ে আনা হলো না
নয়নতারা বললে–টাকা হলে আবার গয়না হবে, কিন্তু এখন তো কাজে লাগুক, আমাদের অফিসের মালা বোসও তো প্রথমে গয়না বিক্রি করে দিয়েছিল। এখন আবার নতুন-গয়না কিনে নিয়েছে–
কিন্তু গয়না বলতে নয়নতারার আছেই বা কী? চার গাছা করে চুড়ি দু’হাতে আর একখানা সরু চেন-হার। সব মিলিয়ে বড় জোর তের-চোদ্দ ভরি। একশো দেড়শো টাকা করে সোনার ভরি। বেচলে দেড় হাজার টাকাও হয়ত পাওয়া যাবে না। অথচ বিয়ের সময় কত সোনা ছিল তার! শ্বশুর একটা হীরের সীতাহার দিয়ে তার মুখ দেখেছিল। শাশুড়ীও দিয়েছিল একজোড়া জড়োয়ার বালা। হীরে-পান্না সেট করা। আরো কত গয়না পেয়েছিল, তার কি আর হিসেব আছে। সেদিন কি নয়নতারা জানতো যে সে আবার বিয়ে করবে! আবার সংসার হবে তার! সে কি জানতো যে তাকে চাকরি করতে হবে কোনও দিন? নাকি জানতো যে পাঁচ হাজার টাকার জন্যে আবার একদিন তার গয়না বাঁধা দেবার দরকার হবে!
সকালবেলা নিখিলেশ ঘুম থেকে উঠতেই নয়নতারা বললে–আচ্ছা সেদিন তুমি নবাবগঞ্জে গেলে তো আমার গয়নাগুলো চাইলে না কেন?
নিখিলেশের মনে ছিল না। বললে–আমি নবাবগঞ্জে গেলুম! কবে?
–বাঃ, তোমার মনে নেই? তুমিই তো বললে–তুমি নবাবগঞ্জে গিয়েছিলে। তোমাকে দেখে সে আমার কথা জিজ্ঞেস করলে–
এতক্ষণে মনে পড়লো নিখিলেশের। সে যে মিথ্যে কথা বলেছিল সেটা তার মনে ছিল না।
বললে–হ্যাঁ, জিজ্ঞেস করলেই তো। জিজ্ঞেস করলে নয়নতারা কেমন আছে!
–তা তুমি কী বললে?
–কী আর বলবো! বললুম তুমি ভালো আছো!
–তারপর?
–তারপর আর কী! মনে হলো বাড়ির ভেতরে বোধ হয় লুচি-ভাজাটাজা হচ্ছে।
নয়নতারা বললে–তা তখন আমার গয়নার কথাটা তুললে না কেন? বললে না কেন যে নয়নতারার গয়নাগুলো দিন–
নিখিলেশ এর জবাবে কী বলবে তা বুঝতে পারলে না। একটু ভেবে নিয়ে তখনই বললে–সেটা আমি বলবো ভেবেছিলুম কিন্তু আবার ভাবলুম শেষে যদি কিছু অপমান করে। গাল বাড়িয়ে চড় খেতে যাবো?
নয়নতারা বললে–বা রে, ও তো আমারই জিনিস, আমার বিয়ের সময় ও-সব তো আমাকেই দেওয়া হয়েছিল, সুতরাং ওটা তো আমারই প্রাপ্য!
নিখিলেশ বললে–দেখ, একবার গয়না চেয়ে আমি যথেষ্ট শিক্ষা পেয়েছি, তার পর আর কোন্ সাহসে চাই? তাই আর আমি কিছু বললাম না, যেমন গিয়েছিলুম তেমনি আবার চলে এলুম–
নয়নতারা বললে–তা আমার গয়না চাইতে যদি তোমার এতই লজ্জা তো আমিই যাবো, আমি নিজে গিয়ে আমার গয়নাগুলো চেয়ে আনবো–
–তুমি যাবে?
নিখিলেশ মনে মনে ভয় পেয়ে গেল। যদি সত্যি সত্যিই নয়নতারা নবাবগঞ্জে যাবার জন্যে জেদ ধরে, তখন?
নিখিলেশ বললে–ছি ছি, তুমি কেন যাবে? তুমি সেখানে গেলে লোকে কী বলবে বলো তো?
