নিখিলেশ বললে–আর এ কারবারে তো আপনার ট্যাক্স দিতে হয় না–
–ট্যাক্সো? কীসের ট্যাক্সো?
নিখিলেশ বললে–ইনকাম ট্যাক্সের কথা বলছি–
মানদা মাসি বললে–না বাবা, এতদিন কারবার করছি ট্যাক্সো-ফ্যাক্সো কখনও দিই নি, ট্যাক্সো আবার কাকে দেব? যাদের ট্যাক্সো দেব তারাই তো আমার খদ্দের বাবা, তা সেদিন একটা লোক এসেছিল, আমার বহুদিনের খদ্দের, সে এসে বলে গেল সে নাকি তার ভগ্নীপতির আট লাখ টাকা পাচ্ছে, ভাবলাম তাকে বসিয়ে খাতির-টাতির করে তাকে বলবো এ কারবারে কিছু ঢালতে, তা সে কিছু বলবার আগেই পালিয়ে গেল–
–পালিয়ে গেল মানে?
মানদা মাসি বললে–পালিয়ে গেল মানে ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল! ভাবলে আমি তার টাকাগুলো বুঝি কেড়ে নেব। অবাক কাণ্ড বাবা, আমি তো বাবা, দেখে অবাক! ব্যবসা করতে গেলে টাকা নিতে হয় না? আমি তোমার টাকা খাটিয়ে যদি কারবার বাড়াতে পারি তো ক্ষেতিটা কী? সুদও দিতে পারি, আর নয়তো আধাআধি বখরা। আদ্দেক বা যদি দিই তাহলে তো ফেলে-ছড়িয়ে মাসে মোটা লাভ থাকবে। তেমন করে মন দিয়ে দেখলে হিসেব- ঠিকমত রাখলে এ-কারবারে তো লোকসান নেই বাবা। এতে সবটাই লাভ।
তারপর নিখিলেশের দিকে চেয়ে বললে–তুমি কত টাকা ঢালতে পারবে বলো তো বাবা ঠিক করে?
শীতেশ সেকথাটা ঘুরিয়ে দিলে। বললে–তোমার সেই বড়বাবু কোথায় গেল? সেই পুলিসের বড়বাবু?
মাসি মুখ বাঁকালো। বললে–তাঁর কথা আর বোল না বাবা, আমি টাকার আশায় তার বাড়িতে গিয়েও ধর্না দিয়ে পড়েছিলুম। টাকার জন্যে আমি তার কী না করেছি। তার মেয়েমানুষের পা পর্যন্ত টিপে দিয়েছি–
–তবু তোমায় টাকা দিলে না?
–না বাবা, তাই তো আমি মনের দুঃখে সেখান থেকে চলে এসেছি। আমার কপাল বাবা, সবই আমার কপাল! অথচ আমি কি টাকা নিয়ে পালিয়ে যেতুম? আমি অমন বাপের জন্মিত নই বাবা! আমি বামুনের বংশের মেয়ে, গেরোয় পড়ে আমাকে আজ এই কারবার করতে হচ্ছে। কিন্তু তুমি তো জানো বাবা, আমি তোমাদের কখনও ঠকিয়েছি? কেউ বলতে পারে আমি কখনও মালের সঙ্গে এক ফোঁটা জল মিশিয়েছি!
তারপর আবার নিখিলেশের দিকে চেয়ে বললে–তা তোমার মূলধন কত খাটাবে তা তো কই বললে না বাবা?
কিন্তু এ-কথার জবাব নিখিলেশকে দিতে হলো না। জবাব দিলে শীতেশ। বললে–টাকা তো এর অনেক আছে, এর বাবা অনেক টাকা রেখে গেছে। কিন্তু ব্যবসায় নামবার আগে আট-ঘাট বেঁধে নামতে হবে তো। লোকসান যাতে না হয় সেটা তো আগে দেখতে হবে–
মাসি বললে–তোমায় তো আগেই বলেছি বাবা যে এ-কারবারে লোকসান বলে কিছু নেই। কলকাতা থেকে বিলিতি সাবেরা এখন চলে গেছে, এখন দিশী সাহেবদের হাতে অনেক টাকা এসেছে। তাদের ছেলেরা এখন উড়তে শিখেছে, তেমন ভালো পাড়ায় একটা বাড়ি নিতে পারলে তাদের কল্যাণে ফুলে ফেঁপে একেবারে ঢোল হয়ে উঠবে। সে-সব আমার ওপরে ছেড়ে দাও–আমি এতদিন এই কারবার করছি, আমি জানি না কত চালে কত খুদ!
শীতেশ উঠলো, বললে–ঠিক আছে মাসি, আমি আর একদিন আসবো, এখন আসি—
মাসি বললে–সে কী বাবা, তোমরা বসবে না?
শীতেশ বললে–না মাসি, দুপুরবেলা আর বসবো না। আর একদিন সন্ধ্যের ঝোঁকে বরং আসবে কারবারের হালোকাল তো সব জানা হলো, এখন এ ভাবুক–
মাসি দোরগোড়া পর্যন্ত এগিয়ে এল। বললে–ভাববার কিছু নেই বাবা, আজকাল এ ব্যবসায় বড় বড় লোক সব নামছে, দেখছো না বাবা, চারদিকে পাড়ায়-পাড়ায় কত ‘ম্যাসাজ ক্লিনিক’ গজিয়ে উঠছে–
–ম্যাসাজ ক্লিনিক?
মাসি হেসে বললে–হ্যাঁ বাবা, ওই সব ইনরিজি নাম দিয়েছে। তা ইনরিজি নাম দিলে কী হবে, আসলে আমার ব্যবসাও যা ও-ও তো তাই বাবা, ইনরিজি নাম দিলে কি আর গায়ের গন্ধ যাবে?
ততক্ষণে রাস্তায় এসে পড়েছিল দু’জন। বাইরে এসেই শীতেশ বললে–কী রকম মনে হলো ব্রাদার?
নিখিলেশ হাসলো। বললে–ভাবছি শেষকালে কিনা এই কারবারে নামবো!
শীতেশ বললে–কেন? নামতে দোষ কী? আমার যদি ছেলে-মেয়ে বউ থাকতো তো আমি নিজেই এই ব্যবসাতে নামতুম। সত্যিই তো, চারদিকে এত ‘ম্যাসাজ ক্লিনিক’ হয়েছে তাকে তো কেউ খারাপ বলে না! টাকা হলে তখন কি আর তোমার গায়ে লেখা থাকবে যে এটা ম্যাসাজ ক্লিনিকের টাকা না লোহা-লক্কড়ের টাকা?
নিখিলেশ বললে–না, তা নয়। ভাবছি আমার গিন্নী শুনলে কী বলবে!
শীতেশ বললে–খবরদার, খবরদার এসব কথা তাকে বলো না হে। এসব ব্যাপার মেয়েদের বলতে নেই। আমি বিয়ে করিনি, কিন্তু বলতে পারি কোনটা পরিবারকে বলতে আছে আর কোনটা বলতে নেই–
–কিন্তু একদিন না একদিন তো জানতে পারবেই।
–তুমি নিজে না বললে কী করে জানতে পারবে? মেয়েমানুষরা টাকা পেলেই খুশী। কোত্থেকে টাকা আসছে সেকথা জানতে চাইবে না তারা।
নিখিলেশ বললে–আমার গিন্নী আবার সেরকম নয় ভাই। ভয়ানক সেন্টিমেন্টাল। এক একদিন আমার সঙ্গে এমন রাগারাগি করে যে কী বলবো! অথচ কলকাতায় তার বাড়ি করার খুব শখ। আমারও শখ, তারও শখ–
শীতেশ বললে–সকলেরই তাই।
নিখিলেশ বললে–কিন্তু কলকাতায় বাড়ি করতে গেলে টাকা খরচ তো কমাতে হবে। সেটা পারে না। নইলে এতদিনে আমার অনেক টাকা জমে যেত ভাই! ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স বলে তো এখন আমাদের কিছুই নেই।
শীতেশ বললে–এখন থেকে জমাতে চেষ্টা করো তাহলে। তোমরা নেশা-ভাঙও করো না, কিছুই না, তাহলে দু’জনের মাইনের টাকাটা যায় কোথায়?
