একটা জায়গায় নেমে শীতেশ ভিড়ের মধ্যে হন হন করে চলতে লাগলো। নিখিলেশও চলতে লাগলো পেছন-পেছন। মানুষের ভিড়ে জায়গাটা তখন বেশ সরগরম হয়ে আছে। এদিকে আগে কখনও আসেনি নিখিলেশ।
একটা বস্তির মধ্যে ঢুকে শীতেশ একটা বাড়ির সামনে দাঁড়ালো। কয়েকজন মেয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেজেগুজে সেদিকে না চেয়ে শীতেশ ডাকতে লাগলো–মানদা মাসি আছো নাকি গো–ও মানদা মাসি–
নিখিলেশ পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। চারদিকের আবহাওয়া দেখে তার অবাক লাগছিল তখন। এও তো একরকমের ব্যবসা। শীতেশকে বললে–চলো শীতেশ, চলে যাই–
শীতেশ বললে—না না, যেও না হে, ব্যাপারটা দেখেই যাও না। ব্যবসা হচ্ছে ব্যবসা। সংসারে টাকা উপায় করবার কত রকমের পথ আছে সেটা দেখা ভালো।
আসলে মানদা মাসির কপাল ভালো না নিখিলেশের কপাল ভালো তা কে বলতে পারে। কে বলতে পারে কোন যোগসূত্রে জড়িয়ে গিয়ে কার ভাল হয় আর কারই বা মন্দ হয়। নিখিলেশ সামান্য একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষ। বিংশ শতাব্দীর যুদ্ধোত্তর যুগের অসহিষ্ণু সমাজের একজন প্রতিনিধি সে। শুধু মোটা ভাত আর মোটা কাপড় পেলে তার চলবে না। সুস্থ স্বাভাবিক সহজ জীবনের শান্তিতে তার তৃপ্তি নেই। সে অল্প-পাওয়ার দুঃখকে অতিক্রম করবার জন্যে বেশি-পাওয়ার অশান্তি মাথায় তুলে নিতেও প্রস্তুত। ত্যাগের উপদেশ তার পক্ষে মৃত্যু, ভোগটাই তার কাছে চরম সত্য। ভোগের উপকরণ যোগাড় করতে সে জীবন বলি দিতেই পেছপাও নয়। তার ধারণা হলো ভোগই যদি না করতে পারলুম তো বেঁচে আছি কেন? আর ভোগ করতে গেলেই চাই টাকা? সেই টাকা যদি রাস্তার ধারের নর্দমাতেও পড়ে থাকে তো তা কুড়িয়ে নিতে আপত্তি করবো কেন? আসলে পুণ্যের টাকা আর পাপের টাকার মধ্যে তো কোনও তফাৎ নেই। টাকার গায়ে লেখাও থাকে না ওটা কীসের টাকা! সুতরাং টাকা চাই।
শীতেশ বোধ হয় ও-পাড়ার নিয়মিত যাত্রী। অন্তত তার হাবভাব দেখে নিখিলেশের তাই-ই মনে হলো। বস্তিবাড়ির সবাই-ই তাকে চেনে। মানদা মাসির সঙ্গেও তার খুব ঘনিষ্ঠতা আছে তার নমুনাও পাওয়া গেল।
মানদা মাসি নিখিলেশকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলে–ইনি কে?
শীতেশ বললে–আমার বন্ধু আমরা এক অফিসে কাজ করি–
মানদা মাসি বললে–তা তো বুঝলুম, তা তোমার সঙ্গে কেন? একা আসতে ভয় পায় বুঝি?
শীতেশ বললে–না, আরে তা না, সবারই কি আর আমার মত ক্যারেক্টার? তুমি ভাবো কী? কলকাতায় কি ভালো লোক নেই?
মানদা মাসি বললে–আমাকে আর ভালো লোক দেখিয়ো না বাবা। আমি সব দেখে নিয়েছি। ফরসা জামা কাপড় পরা লোকও দেখলুম, আবার কুলি কাবারি-মজুরদেরও দেখলুম। আমার কাছে সবাই লক্ষ্মী। খদ্দের মাত্তোরই হলো লক্ষ্মী। কারবার করতে যখন নেমেছি তখন অমন বাছ-বিচার করলে তো চলবে না আমার, আগে দেখবো তোমার ট্যাঁকে টাকা আছে কিনা! টাকা থাকলে তুমি ভালো আর টাকা না থাকলে তুমি খারাপ। সোজা কথা আমার কাছে–হ্যাঁ!
শীতেশ বললে–তা তুমি বলছিলে না তোমার টাকায় টান পড়েছে?
–টান তো পড়েছেই বাবা! টাকার আমার বড় টানাটানি পড়েছে–একদিন খদ্দেরের ভিড়ে আমার বাড়িতে কাগ-চিল বসতে পেত না, সেই আমার বাড়ির দিকে এখন শ্যাল কুকুরেও ফিরে তাকায় না, এমনই হাল হয়েছে। মেয়েগুলো খেতে পাচ্ছে না পেট পুরে, দুঃখের কথা তোমাকে আর কী বলবো–
শীতেশ জিজ্ঞেস করলে–তা এরকম কেন হলো মাসি? কলকাতায় মানুষগুলোর ক্যারেকটার কি রাতারাতি সব ভালো হয়ে গেল? নাকি পুলিসের হয়রানি?
মানদা মাসি বললে–পুলিস তো আমার হাতে! পুলিসের বড়বাবু তো আমার হাত ধরা, তা তো তুমি জানো বাবা। সে হলে এক কথায় আমি সকলকে ঠাণ্ডা করে দিতুম। আসলে আমার টাকার অভাব হয়ে পড়েছে। আমি যদি এ-কারবারে কিছু টাকা ঢেলে সাহেব পাড়ায় একটা বড় বাড়ি নিতে পারতুম তো আমার টাকা খায় কে? কিন্তু তা তো হচ্ছে না–
শীতেশ নিখিলেশকে দেখিয়ে বললে–সেই জন্যেই তো আমার বন্ধুকে তোমার কাছে নিয়ে এসেছি মাসি,–যে কোনও কারবারে এ টাকা খাটাতে চায়–
এতক্ষণে যেন মানদা মাসির হুঁশ হলো। নিখিলেশের দিকে ভালো করে চেয়ে দেখলে। বললে–কী কারবারে টাকা খাটাবেন?
বলে যেন হঠাৎ খেয়াল হলো। বললে–তোমরা চা-টা কিছু খাবে বাবা?
নিখিলেশ বললে–না না, ব্যস্ত হতে হবে না। আপনার ব্যবসা কেন ভালো চলছে না তাই বলুন। এত লাভের ব্যবসাতে কিনা লোকসান হচ্ছে!
মানদা মাসি বললে–দুঃখের কথা বলবো কি বাবা, এব্যবসায় আসলে লোকসান নেই, কিন্তু তবু লোকসান হচ্ছে আমার, হচ্ছে টাকার অভাবের জন্যে। টাকা যদি পেতুম কিছু তো দেখিয়ে দিতুম কাকে বলে ব্যবসা। এ ব্যবসায় যদি হাজার দশেক টাকা ঢালতে পারতুম আমি তো আজ পায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে বসে থাকতে পারতুম–
এতক্ষণে নিখিলেশ কথা বললে। বললে–দশ হাজার টাকা পেলে আপনি কী করবেন?
–কী করবো? তা হলে বলি শোন, আমি তাহলে সাহেব পাড়ায় পাঁচশো টাকায় একটা বাড়ি ভাড়া করবো প্রথমে। দু’খানা ঘর হলেই আমার আপাতত চলবে, আর দুটো মেয়ে। তা সে মেয়ে আমি নিজে যোগাড় করবো, তার জন্যে ভাবনা নেই। আজকাল ভালো-ভালো ভদ্র ঘরের মেয়ে এ-লাইনে নামতে চায়, কিন্তু আমার এই বস্তি বাড়ি দেখে তারা আসতে চায় না, পিছিয়ে যায়। সাহেবপাড়ায় ব্যবসা করলে আমি ঘন্টা পিছু রেট বেঁধে দেব। তখন এত পয়সা আসবে সে পয়সা রাখবার জায়গা থাকবে না আমার–
