–বলেছি, বলেছি, সব বলেছি। সবাই টাকা পাবে। তোমার মেয়ের বিয়ের টাকা, ভীম বিশ্বাসের টাকা, আশু চক্কোত্তির টাকা। সবাইকে টাকা দেওয়া হবে–
খুব পাহারা দিয়ে রাখতে হলো সদাকে। কেউ না ভালোমানুষ পেয়ে শেষকালে আবার কিছু লিখিয়ে নেয়। লিখিয়ে নিলেই হোলো। সদা যেমন ছেলে হয়ত সকলেরই অভাব অভিযোগের কথা শুনে জল হয়ে গেল আর সামনে যাকে পেলে তাকেই সব টাকা দিয়ে দিলে।
প্রকাশ মামা সমস্ত দিনই সদানন্দকে ঘরের মধ্যে বসিয়ে রাখে। কোথাও বোরোতে দেয় না।
বলে–না রে, তোর টাকার কথা শুনে সুলতানপুরের লোক সবাই হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কখন হয়ত তোকে কিছু খাইয়ে-টাইয়ে দেবে।
সদানন্দ বুঝতে পারে না। বলে–কী খাইয়ে দেবে?
প্রকাশ মামা বলে–আরে কত কী খাইয়ে দিতে পারে তার কী ঠিক আছে? সুলতানপুরের মানুষ সব পারে। এদের তুই চিনিস না, এরা বিষও খাওয়াতে পারে–
বিষ?
–হ্যাঁ রে, বিষ! টাকার জন্যে মানুষ সব করতে পারে। তোর টাকা হয়েছে এ তো এখানকার সবাই জেনে গেছে কি না!
তা সাবধানের মার নেই। যখন যেখানে সদানন্দকে নিয়ে যায় চারিদিকে পাহারা দিয়ে রাখে। একবার উকিলের কাছে, একবার কাছারিতে, একবার রেজিষ্ট্রি অফিসে। গভর্মেন্টের টাকা পেতেও কী কম ঝঞ্ঝাট! সাকসেশান সার্টিফিকেট নিতেও ক’দিন সময় নষ্ট হয়ে গেল।
প্রকাশ মামার সঙ্গে সদানন্দ বেরোয় আর প্রকাশ মামার সঙ্গেই বাড়ি ফিরে আসে। প্রকাশ মামার তখন নাইবার খাবার সময় নেই। তার মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত লোক যেন ওঁৎ পেতে আছে। একবার গভর্মেন্টের ঘর থেকে টাকাটা পেলে তবেই নিশ্চিন্দি।
কাগজপত্র সব আস্তে আস্তে যোগাড় হয়ে গেল। প্রকাশ মামা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। মনে মনে ভগবানকে ডাকতে লাগলো–হে মা কালী, আর একটা দিন, আর একটা দিন বাঁচিয়ে রেখো মা, সব যেন ভালোয় ভালোয় শেষ হয়ে যায়। টাকাটা পেলে আমি ঘটা করে তোমার পূজো দিয়ে দেব মা
সব যখন চুকলো তখন প্রকাশ মামা সদানন্দর সামনে একটা কাগজ ফেলে দিয়ে বললে–এইবার এখেনে একটা সই করে দে তুই–
সদানন্দ কাগজটা দেখলে। ওপরে কত টাকার যেন স্ট্যাম্প লাগানো।
জিজ্ঞেস করলে–এটা কিসের কাগজ?
প্রকাশ মামা বললে–আরে এটা কিছু না, তুই যে আমাকে টাকাগুলো দিলি, তারই দানপত্র আর কী! এ-এমন কিছু হাতী-ঘোড়ার ব্যাপার নয়, এক মিনিটেই আমি ঠিক করে নেব। আমার উকিল ড্রাফট্ করে দিয়েছে–তোর কিচ্ছু ভাবনা নেই, শুধু তুই সইটা করে দে–
সদানন্দ বললে–কিন্তু আমি সই করবো কেন?
প্রকাশ মামা বললে–কেন, সই করতে তোর আপত্তিটা কী? তুই তো টাকাগুলো সব আমাকেই দিয়ে দিবি? তোর তো আর টাকার দরকার নেই রে–
সদানন্দ বললে–না, টাকার দরকার আছে আমার–
–সে কী রে? তোর আবার টাকার কিসের দরকার?
সদানন্দ বললে–হ্যাঁ, টাকার দরকার আছে আমার–
প্রকাশ মামার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়বার উপক্রম করেছে। সদানন্দর মুখের দিকে সে হাঁ করে চেয়ে দেখতে লাগলো।
জিজ্ঞেস করলে–হ্যাঁ রে, সত্যিই তোর টাকার দরকার? তুই তো বিয়েও করবি না, সংসারও করবি না, তোর এত টাকার দরকার কীসের?
ততক্ষণে চেক-পাসবই আরো অনান্য কাগজপত্র তৈরি হয়ে গেছে। সদানন্দ সেগুলো নিয়ে পকেটে পুরে ফেললে।
বললে–না প্রকাশ মামা, সংসার না-ই বা করলুম, আমার সত্যিই অনেক টাকার দরকার আছে–
–তা কত টাকার দরকার?
সদানন্দ বললে–সব টাকাটাই আমার দরকার…
বলে ব্যাঙ্ক থেকে রাস্তায় বেরিয়ে সোজা চলতে লাগলো। প্রকাশ মামার তখন পাগলের মত অবস্থা। সেও পেছন-পেছন চলতে চলতে বলতে লাগলো–ওরে, আমি যে তোর জন্যে এত করলুম, আমার কথা তুই একবার ভাববি না? আমি খবর না দিলে তো তুই টাকার কথা জানতেও পারতিস না–
কিন্তু সদানন্দ সেকথায় কান দিলে না। সে যেমন যাচ্ছিল, তেমনিই চলতে লাগলো।
.
সেদিন শীতেশ বোস অন্য পরামর্শ দিলে।
নিখিলেশ কদিন ধরেই বলছিল ব্যবসা করবার কথা। অল্প মূলধনে একটা কিছু ব্যবসা না করলে চিরকাল এই কেরানীগিরি করেই জীবন কাটিয়ে দিতে হবে।
নিখিলেশ একদিন শীতশকে বললে–ভাবছি মেয়েদের একটা বোর্ডিং হাউস করবো, ওতে খুব লাভ–
শীতেশ সব শুনে বললে–না হে, ওতে বেশি লাভ নেই। একটা ব্যবসায় খুব লাভ আছে যদি করত পারো!
–কীসের ব্যবসা!
শীতেশ বললে–মেয়েমানুষের ব্যবসা!
নিখিলেশ চমকে উঠেছে। বললে–সে কী সে আবার কী রকম ব্যবসা?
শীতেশ বললে–আজকাল শহরকে তো আর চিনলে না হে, কত লোকে কত ধান্ধায় চারদিকে ঘুরছে। পয়সা এখানে উড়ছে, কুড়িয়ে নিতে পারলেই হলো–
নিখিলেশ বললে–মেয়েদের বোর্ডিং-হাউস তো অনেকে করেছে, আর নতুন কী ব্যবসা আছে?
শীতেশ বললে–ঠিক আছে, রবিবার দিন তোমার সময় আছে? আমার বাড়িতে আসতে পারবে?
–খুব পারবো।
–তাহলে তাই এসো। তোমাকে একেবারে, সরেজমিনে কারবারটা দেখিয়ে দেব–
পরের দিনই রবিবার। বিকেলবেলার দিকে নিখিলেশ বেরিয়ে পড়লো।
নয়নতারা জিজ্ঞেস করলে–কখন ফিরবে?
নিখিলেশ বললে–চেষ্টা করবো শিগগির ফিরতে–
বলে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো। শীতেশ তৈরিই ছিল। নিখিলেশকে নিয়ে কালীঘাটের বাসে উঠলো। উঠে দু’খানা কালীঘাটের টিকিট কাটলো।
নিখিলেশ জিজ্ঞেস করলে–কালীঘাটে কোথায় যাচ্ছো? মন্দিরে নাকি?
শীতেশ বললে–আরে চলো না, ব্যবসা করতে নামছ, অত ভয় করলে চলে? ব্যবসার জন্যে মানুষ আজকাল জাহান্নামে যেতেও তৈরি, তা জানো?
